আমাদের ক্রিকেটের ‘গলদ’

মাননীয় বিসিবি সভাপতি, আজকের দিনের খেলা শেষে, দয়া করে টিম ম্যানেজমেন্টকে জিজ্ঞেস করবেন, কেন বাংলাদেশের স্কোয়াডে একজন বাড়তি ব্যাটসম্যানও নেই?

বাংলাদেশ দলের এই সফরে আপনি নিজে সম্ভবত তিন বা চারবার যাওয়া-আসা করেছেন ভারতে। আপনার বোর্ডের আরও অনেকেই যাওয়া-আসা করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের তাতে কি উপকার হয়েছে? দলের কোন কাজে লেগেছে? দেশ থেকে একজন ব্যাটসম্যান কেন যেতে পারেনি?

মোসাদ্দেক ফিরে এসেছে টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেই। সাইফ চোট পেয়েছে ইন্দোর টেস্টে, কলকাতায় তার খেলা নিয়ে সংশয় ছিলই। তবু কেন কোনো বদলি পাঠানো হলো না?

ধরে নিলাম, সাইফের ফিট হয়ে ওঠার কথা ছিল। টেস্টের আগের দিন বা ম্যাচের দিন সকালেও ওয়ার্ম আপের সময় ইনজুরড হয়ে ছিটকে যাওয়ার নজির ক্রিকেটে ভুড়ি ভুড়ি আছে। এটা কি টিম ম্যানেজমেন্টের মাথায় ছিল না? বোর্ডের ভাবনায় ছিল না? কেন একজন বিকল্পও নেই !

কিছুদিন আগে নিজেদের মধ্যে ফালতু টি-টোয়েন্টি প্র্যাকটিস ম্যাচের জন্য আপনারা জাতীয় লিগের মাঝপথে ৮ জন ক্রিকেটারকে জরুরী বার্তা পাঠিয়ে উড়িয়ে আনেন। অথচ টেস্ট ম্যাচের জন্য একজনকে আধ ঘণ্টা দূরত্বের শহরে পাঠাতে পারেন না?

বাড়তি একজন ব্যাটসম্যান থাকলে অবশ্যই আজ হাতী-ঘোড়া করে ফেলত না। তবে প্রসেসটা অন্তত ঠিক থাকত। সেটি এক্ষেত্রে ঠিক ছিল না, কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেটের বেশির ভাগ প্রসেস ঠিক নেই। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার নিয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট, বোর্ডের উপেক্ষা বা উদাসীনতা প্রমাণ করে এটিকে মোেটও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ক্রিকেট জাতি হিসেবে আমাদের মানসিক দীনতার আরেকটি উদাহরণ।

মাননীয় সভাপতি, আপনি কয়েকদিন আগে বিপিএলের লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে বলেছেন, টেস্ট দলের দিকে আপনারা এখন নজর দিচ্ছেন, এক-দেড় বছরের মধ্যে টেস্ট দল দাঁড়িয়ে যাবে। অথচ আপনার দায়িত্বের ৭ বছর পেরিয়ে গেছে। টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্ব বুঝতে আপনাদের ৭ বছর লেগে গেল। আমার মনে হয় না, আর কোনো দেশে একই বোর্ড এত লম্বা সময় ক্ষমতায় ছিল। চাইলে কত কিছু করা সম্ভব ছিল? দেখুন না, মাত্র কয়েক দিনের দায়িত্বে সৌরভ গাঙ্গুলি প্রায় ম্যাজিক দেখানো শুরু করেছেন। সত্যিকারের ভিশনারি হলে ৭ বছরে দেশের ক্রিকেটের খোলনলচে পাল্টে ফেলা যেত।

যাই হোক, এভাবে চললে আশা করি, ২০২৫ সাল নাগাদ চোট পাওয়া ক্রিকেটারের বিকল্প আমাদের স্কোয়াডে থাকবে। ২০৫৪ সাল নাগাদ টেস্ট দল মোটামুটি হয়ে উঠবে। ২০৯৭ সাল নাগাদ এই দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

____________

মাঠের ক্রিকেটের কথা বললে, ১০৬ রানে অলআউট, খুব বিস্ময়কর নয়। সব মিলিয়ে গোলাপি বলে এই নিয়ে ৩১ বার অলআউট হলো দলগুলি, ১২ বারই দেড়শর নিচে। কাজেই কম রান হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

নিজেদের সীমাবদ্ধতা তো আছেই। আগের টেস্টের সময়ই লিখেছিলাম, ভারতের এই স্কিলফুল পেস আক্রমণ সামলানোর স্কিল আমাদের ৯০ ভাগ ব্যাটসম্যানের নেই! এটি বাস্তবতা!

তবে হতাশার ছিল, যথারীতি, আউট হওয়ার ধরন। উইকেট এমন কিছু ছিল না। ডে-নাইট টেস্টে নরম্যালি আরও বেশি ঘাস রাখা হয়। এখানে ঘাস ছিল অল্প, উইকেট ছিল শুষ্ক। ব্যাটিংয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো উইকেট।

গোলাপি বলে মুভমেন্ট যতটা ধারণা করেছিলাম, শুরুর দিকে অতটা ছিল না মোটেও। ভারতীয় পেসারদের স্কিল এত ভালো, তারা কিছু মুভমেন্ট আদায় করে নিয়েছেন। সুইং প্রত্যাশিত মিলছে না বলে পরে তারা কাটারে মন দিয়েছিলেন। আমাদের ব্যাটসম্যানদের মন ছিল না লড়াই করে টিকে থাকার দিকে।

এত ঝুঁকি নিয়ে শাফল করলে, পা না নড়লে, অফ স্টাম্প কোথায় না জানলে, বাজে ফুটওয়ার্ক দিয়ে ১৩৮ কিমি গতির বলকে ১৫৮ কিমি মনে করালে, খোঁচা দিলে।এমন বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে এই অবস্থাই হওয়ার কথা। সঙ্গে যোগ করুন রোহিত-ঋদ্ধিমানের ক্যাচগুলি!

যদিও ব্যাটিং নিয়ে আশা ছিল না, তাতে হতাশ হওয়ারও কথা না, তার পরও আমাদের ব্যাটসম্যানরা হতাশা উপহার দিতে পেরেছেন, তাদের কৃতিত্ব!

প্রসেসের কথা বলছিলাম। গত টেস্টের পর এই টেস্টেও মুশির চারে না খেলানো বা না খেলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। যদি টিম ম্যানেজমেন্ট বা অন্য কেউ চায় তাকে পাঁচে খেলতে, তাহলেও মুশি ও রিয়াদের নিজ থেকে এগিয়ে গিয়ে বলা উচিত, ‘আমরা চার-পাঁচে খেলব। সাকিব-তামিম নেই, আমাদেরই দায়িত্ব দলের ভার বয়ে নেওয়ার।’ তার পর তাদের কথা না শোনার কোনো কারণ নেই! এই টেস্টেও মুশিকে চারে না দেখে যারপর নাই হতাশ হয়েছি।

এবং একইভাবে.. গত টেস্টের পর, এই টেস্টেও টস জিতে ব্যাটিং নেওয়াটা ভীষণরকম প্রশ্নবিদ্ধ। টেস্টে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যাটিং নেওয়া উচিত। হয়তো ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই। কিন্তু আমাদের এই টেস্টের বাস্তবতা ছিল বাকি ১০ ভাগের মধ্যে।

ব্যাটসম্যানদের স্কিলের ঘাটতি তো আছেই, তার চেয়ে বড় ঘাটতি এই মুহূর্তে বিশ্বাসে। আত্মবিশ্বাস একদম তলানিতে। ব্যাটিং না করার পক্ষে যুক্তি ছিল আরও। উইকেট কেমন থাকবে, গোলাপি বল কেমন করবে, কিছুই জানি না। গত টেস্টের দুঃস্বপ্ন, এই টেস্টকে ঘিরে উন্মাদনা, সব মিলিয়ে নার্ভ সেটল হওয়ার ব্যাপারও ছিল। ভারতের ব্যাটসম্যানরাও ব্যাটিংয়ে নামত অনেক দ্বিধা নিয়ে, সেটি কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারতো।

আমাদের সিস্টেমে গলদ, আমাদের ক্রিকেট কর্তাদের মানসিকতায় গলদ! আপাতত, দলের ভাবনায়ও দেখা যাচ্ছে গলদ!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।