বৃহত্তর বাংলাদেশ হতাশ সোসাইটি!

পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এসব অনলাইন কাদা ছোড়াছুড়ি করে লাভটা আসলে কী হয়? যে যেখানেই পড়ুক না কেন, কিছুদিন পরে তো কমবেশি সবার গন্তব্য একই — বৃহত্তর বাংলাদেশ হতাশ সোসাইটি!

পড়াশোনা শেষ করবেন, কিন্তু সোনার হরিণ চাকরির দেখা নাই, আবার যেগুলোর সাক্ষাৎ পাবেন, সেগুলো মনে ধরবে না। হ্যাঁ, এটাই হার্শ রিয়েলিটি, অন্তত যে দেশে ৪৭ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত পুরোপুরি বেকার থাকে সে দেশের প্রেক্ষাপটে। ইন্সটিটিউশনাল প্রাইড ধুয়ে ধুয়ে তখন কি পানি খাবেন?

ইনস্টিটিউশনাল প্রাইড ঠিক ততক্ষণ পর্যন্তই ভাল, যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিজের ভেতর রাখতে পারছেন। বদহজম করে যখনই তা উগড়ে দিচ্ছেন, তখনই সেটা অন্যদের কাছে দুর্গন্ধ ছড়ানো শুরু করবে একেবারে অবধারিতভাবে।

কাদের ভার্সিটিতে বেশি মেধাবীরা চান্স পায়, কাদের ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা বেশি কোয়ালিফাইড, কোথা থেকে বিসিএসের বাম্পার ফলন হয়, কর্পোরেট দুনিয়ায় কারা ডমিনেন্স ধরে রাখে, কারা আবার বিশ্বখ্যাত আইটি সেক্টরগুলোতে বেশি সুযোগ পাচ্ছে, কাদের ক্যান্টিন বেশি মর্ডান, কাদের শৌচাগার বেশি আধুনিক— এসব নিয়ে তর্ক, আর তর্কের খাতিরে বিতর্কের দেখি কোন শেষ নেই!

ভাইরে, ধরে নিলাম আপনার ভার্সিটি থেকে প্রতি বছর কয়েকটা করে আইনস্টাইন আর প্রেসিডেন্ট বের হয়, তার জন্য আপনার ইন্সটিটিউশনাল প্রাইডের কোন শেষ নাই। কিন্তু ওই একই ইন্সটিটিউট থেকে আপনি বের হলেন আস্ত একটা ছাগল হয়ে— তাইলে ওই প্রাইড দিয়ে দিনশেষে আপনার লাভটা কী? বরং সেটা উল্টো একটা অভিশাপ হয়ে যাবে আপনার জন্য।

পাবলিক ভার্সিটি সেরা নাকি প্রাইভেট— এসব অ্যানালজিগুলোতে আমি কখনোই বিশ্বাস করি না। প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে মানেই সে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের চেয়ে মেধা-মননে পিছিয়ে থাকবে এমন কোন কথা নেই। প্রাইভেট কোন ভার্সিটিতে পড়ে অনেক ভাল প্রফেশনাল ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারে কেউ, আবার দেশসেরা তকমা লাগা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়াশোনা করেও কেউ হতাশ কমিটির আজীবন সদস্য হয়ে যেতে পারে।

পাবলিক ভার্সিটি গুলোতে একেবারে হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে জীবনের সাথে চরম স্ট্রাগল করা ছাত্রগুলোও যেমন আছে, আবার একেবারে সোনার চামচ মুখে দিয়ে দুনিয়ায় আসা পশ্ কিড গুলোও কিন্তু আছে। কাজেই জেনারালাইজড করে কোন মন্তব্য করা একেবারেই অনুচিত।

আবার প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোতে যারা পড়াশোনা করে, তারা সবাই বিশাল টাকাপয়সা ওয়ালা ঘর থেকে উঠে আসে,ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক এমনও না। অধিকাংশ প্রাইভেট ভার্সিটির ছেলেমেয়েরাই কিন্তু মিডলক্লাস বা লোয়ার মিডল ক্লাস ফ্যামিলি থেকে আসে। দেখা যায়, বাবা হয়ত কোন রকম একটা চাকরি বাকরি করে কিংবা ছোটখাটো একটা ব্যবসা, মধ্যবিত্ত এই বাবাদের পকেট ভরা টাকা না থাকলেও তাদের থাকে বুক-ভরা স্বপ্ন। তাই জোড়াতালি দিয়ে, ধার দেনা করে করে কোনরকমে সেমিস্টার ফি জোগাতে থাকে আর সন্তানের কাছে হাসি মুখে জানতে চায় সামনে আর কয় সেমিস্টার বাকী!

এদের সংখ্যাটাই কিন্তু বেশি প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোতে।

আর হাতে গোনা তিন চারটে প্রাইভেট ভার্সিটি আছে, যেখানে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের এভারেজ স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে বেশি ফাইনান্সিয়াল ক্যাপাবিলিটি ওয়ালা ঘরের ছেলেমেয়ারা পড়াশোনা করে।

ধরেই নিলাম কারো বাবার টাকা পয়সা অাছে, প্রাইভেট গাড়ীতে করে ক্লাস করতে আসে, এটা কি কোন অপরাধ? মোটেই না। শুধুমাত্র তখনই ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু যখন সে অন্যদের তুচ্ছজ্ঞান করে অহংকারী হয়ে উঠে।

সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সটা যেমন বিষাক্ত, ঠিক একই ভাবে ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সটাও কিন্তু একই দোষে দুষ্ট। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, আমার বাপের টাকা নাই, কিন্তু ওর বাপের টাকা আছে কেন, সুতরাং সে খারাপ! আমার ব্যক্তিগত গাড়ী নাই, কিন্তু ওর আছে— সুতরাং সে খারাপ, এই ধ্যানধারণা থেকেও বের হয়ে আসা উচিত আমাদের সবার।

ভাইরে, পাবলিক -প্রাইভেটের প্রায় সব স্তরের ইকোনমিক ক্লাসের সাথেই যথেষ্ট ওঠাবসা করে দেখেছি। প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়া বিশাল বিত্তশালী ঘরের সন্তানটিকেও দেখেছি অনেক বেশি মানবিক হতে, এদের সবাই যে স্ট্রাগল করে উঠে আসা পাবলিক ভার্সিটির সবাইকে ‘ক্ষ্যাত’ ভাবে, তেমনটা নয়। আবার পাবলিক ভার্সিটির সবাই যে প্রাইভেটে পড়ুয়াদের লাফাঙ্গা ভাবে, তেমনটাও না। প্রত্যেকের লাইফেই কিন্তু স্ট্রাগল করতে হয়, হয়ত একেক জনের স্ট্রাগল একেক রকম।

এবার আসি দুই একটা মহা ছাগলের ফিরিস্তি-তে। এরা মাঝে মাঝেই প্রাইভেট-পাবলিক অনলাইন যুদ্ধ লাগানোর পায়তারা শুরু করে দেয়। ভাইরে, ওই দুই একটা পাগল ছাগল সব জায়গাতেই থাকে। এখন সেই ছাগলটাকেই সেনাপতি মনে করে তার নির্দেশে যদি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেন,তাহলে আপনার নিজের বুদ্ধি-বিবেকের ওপর একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসা উচিৎ কিনা?

কার প্রতিষ্ঠান বেশি ভাল, এটা কি স্ট্যাটাস-পাল্টা স্ট্যাটাস দিয়ে মারামারি করে প্রমাণ করার মত কিছু? এটা পাবলিক পার্সেপশনের বিষয়। পাবলিক পার্সেপশন মারামারি করে আদায় করা যায় না, আপনাদের কর্ম দ্বারা মানুষের মনের ভেতর অটোমেটিক গ্রো করে এটা।

নিজের ভালো যদি নিজেরই বলে বলে প্রমাণ করতে হয়, তাহলে নিজের কাছে হয়ত একটু তৃপ্তি পেতে পারেন মোটামাথার কেউ হলে, তবে তাতে পাবলিক পার্সেপশন কোনদিনই আদায় করা যায় না।

শেষ করছি এই গল্প দিয়ে, দুইয়ের ভেতর কে সেরা, সেই বিতর্ক নিয়ে স্কুল পড়ুয়া নাবালক দুই সহপাঠীর ভেতর শুরু হয়ে গেল তুমুল হাতাহাতি। রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক মুরুব্বি এই দৃশ্য দেখে এগিয়ে আসলেন। উভয়পক্ষের কাছ থেকে তর্ক বির্তক শুনে উনি তাদেরকে নিয়ে পাশের একটি আপেল বাগানে প্রবেশ করে পাশাপাশি দুইটা গাছের দিকে ইঙ্গিত করলেন

একটা গাছ ফলে উপচে পরছে যেন, আর অন্যটাতে তেমন কোন ফল-ই নেই, মুরুব্বি তারপর দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন —দেখো, যে গাছটাতে অনেক বেশি ফল ধরে আছে, তার মাথাটা জমিনের দিকে কেমন ঝুঁকে আছে, আর যে গাছে কোন ফল নাই, সেটা দেখো সটান দাঁড়িয়ে আছে।

গল্পের এই দুই নাবালক সহপাঠী আদৌ কিছু বুঝতে পেরেছিল কিনা,সেটা জানি না। তো, আপনারা যারা অনলাইন কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন, আপনারা তো আর নাবালক না, অন্ততপক্ষে আঠারো মাড়ানো আইনত প্রাপ্তবয়স্ক সবাই, তো আপনারা কী বুঝলেন গল্পটা থেকে?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।