২০ বছরের ক্ষোভ জমে যে বিস্ফোরণ!

সোমবার দুপুর পৌনে একটা। মিরপুরে শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেটাররা সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেন। তারপর তাঁরা দুপুর আড়াইটার দিকে স্টেডিয়ামের ইনডোরে পৌঁছান, পরে একাডেমি মাঠে পৌঁছানোর জন্য ঘুরপথে চলে যান। তাঁরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান, সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানদের দ্রুত সংঘবদ্ধ হতে বলেন। কারণ তাঁদের কাছে বলার মত অনেক কিছুই ছিল।

এটা সত্য যে,  বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ক্রিকেটার গত তিন সপ্তাহ ধরে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে প্রায় দুই দশক পর এই ধরণের একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৮ টেস্ট এবং ৫৯ টি ওয়ানডে খেলা ডমেস্টিকে মহীরুহ বনে যাওয়া নাঈম ইসলাম ‘সম্মান’ ইস্যুটি তুলে দাবী পেশ শুরু করেন।

এটি বেশ গভীর একটি শব্দ,  এটি এমন একটা জিনিস যা প্রতিটি ক্রীড়াবিদ খ্যাতি বা প্রতিপত্তির চেয়েও বেশি চান। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে এর স্বল্পতা বহুকালের।  এই মৌলিক চাহিদাটি তাঁদের দাবীর প্রথমে ছিল।

১৬ অক্টোবর ধর্মঘট ঘোষণার প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও সাকিবের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল, সাকিব তখন সিপিএল ফাইনাল খেলছিল। সেদিন ধর্মঘট শুরু হলে তারা ১৭ ই অক্টোবর থেকে এনসিএলের ম্যাচগুলি বয়কট করতেন এবং কোনও ম্যাচ নাহলে স্বভাবতই সবকিছু ভজকট হয়ে যেত।

২০১৯-২০২০ মৌসুমের বিপিএলে,  ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক মডেলটি সরিয়ে দেওয়ায়, টি-টোয়েন্টি লিগ থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের উপার্জন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।  এই সিদ্ধান্তের পিছনে কারণ ছিল পরিষ্কার।  ঢাকা ডায়নামাইটস থেকে রংপুর রাইডার্সে সাকিব আল হাসানের ট্রান্সফার,
যার মালিকানা বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান, বিপিএল সচিব ইসমাইল হায়দার মল্লিক এবং বোর্ড পরিচালক খালেদ মাহমুদের ছিল।

এই সিদ্ধান্ত তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম এবং শেন ওয়াটসনের স্থানান্তরেও প্রভাব ফেলে। বেতন কমানোর সাথে সাথে ফ্র্যাঞ্চাইজি-মডেল সরানোয় ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ব্যাপক লোকসান হয়। বিসিবি প্রিমিয়ার লিগের জন্যেও বেশ কয়েকটি মৌসুমে ড্রাফট পদ্ধতি ব্যবহার করায় তাদের আয় এমনিতেই মন্দিত হচ্ছিল।

তারপর লিগ শুরু হবার দুই সপ্তাহ আগে বোর্ডের সিদ্ধান্ত আসে যে, এনসিএলে কেবল ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ক্রিকেটাররাই খেলতে পারবেন। এটি খেলোয়াড়দের বিরক্তির কারণ হয়। তাঁরা এই ফিটনেস তৈরি করতে আরও সময় আশা করেছিল।

সুতরাং প্রায় দুই সপ্তাহ আগে, কিভাবে তাদের এই সমস্যাগুলি সমাধান করা যায় তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বোর্ডের কর্মকাণ্ডে খেলোয়াড়দের ক্ষোভ আস্তে আস্তে আরও সংগঠিত চিন্তাভাবনার দিকে এগিয়ে যায়, কারণ তারা যে কয়েকটি বিষয় সমাধান করা দরকার তা সর্বসম্মতিক্রমে নোট করা শুরু করে।

তাঁরা এই তিনদিনে আরও গুছিয়ে উঠেন নিজেদের।  এরই মধ্যে সাকিব স্থানীয় সংবাদপত্রগুলিতে ইন্টারভিউতে কিছু অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও, নিজেদের পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দেন নি। তারা সারপ্রাইজ সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনা করেছিল, মিডিয়াকে মিরপুরে জড়ো হওয়ার জন্য দুই ঘন্টা সময় দেন এবং  খেলোয়াড়রা গ্রুপ হিসাবে একাডেমির মাঠে যাচ্ছিল, বিসিবি কর্মকর্তারা কিছু অন্যরকম ঘটনার টের পায়।

সংবাদ সম্মেলনটি মাত্র ১৩ মিনিট স্থায়ী হলেও জোরালো ছিল। শিরোনামের পয়েন্টগুলি বর্ধিত বেতনের দাবি ছিল, ছিল অনেক কিছুই, সেখান থেকে বিস্তৃত করলে দাবীটি দাঁড়ায় পদ্ধতিগত পরিবর্তনের।

তারা গত দশ বছর ধরে একই কমিটি দ্বারা পরিচালিত খেলোয়াড়দের সংগঠন কোয়াবে নতুন নির্বাচন চায়। সভাপতি নাইমুর রহমান, সহ-সভাপতি খালেদ মাহমুদ এবং সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পল সবাই বিসিবির সাথে সম্পৃক্ত। নাইমুর ও মাহমুদ বোর্ডের পরিচালক এবং দেবব্রত ম্যাচ রেফারির সমন্বয়ক হিসাবে নিযুক্ত আছেন।

খেলোয়াড়রা ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিংয়ের প্রভাবগুলি নজরে এনেছে। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের ওপেন সিক্রেট, তবে কেউ এ নিয়ে কথা বলার সাহস করেনি কারণ এই সুবিধাভোগী ক্লাবগুলির বিসিবি শক্তিশালী পরিচালকরা পরিচালনা করেন।
খেলোয়াড়রা বলেছেন, এতে ক্রিকেটারদের পাইপলাইন নষ্ট হচ্ছে।

তারা দেশজুড়ে উন্নত সুবিধাগুলির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে, বিশেষত এমন স্থানগুলিতে যেখানে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আছে।
তারা খাবার ও ভ্রমণের জন্য বাড়তি টাকার দাবী জানিয়েছে। খেলোয়াড়দের জন্য ক্রিকেট বোর্ডের সবচেয়ে প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে এটি একটি। খেলোয়াড়রা আরও বলেছিলেন যে নারী ক্রিকেটার, গ্রাউন্ডসম্যান, স্থানীয় কোচ, আম্পায়ার, ফিজিও এবং প্রশিক্ষকরাও তাদের সাথে আছেন এবং তাদের ধর্মঘট আরও জোরদার করা হবে।

– ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।