দ্য পাওয়ার হাউজ অব ডিপ্রেশন

আমরা সামাজিক?

সহজ প্রশ্ন, সহজ উত্তর। হ্যাঁ, মানুষ সামাজিক। সমাজে বাস করে, সামাজিকতা মেনে চলে।
প্রশ্নটা ফের করি, আমরা সত্যিই সামাজিক?

একটু নড়েচড়ে বসলেন মনে হলো! প্রশ্নটাকেও সহজ মনে হচ্ছে না এবার। যাই, ফেসবুকে ঢুকি। পোস্ট করি প্রশ্নটা। বন্ধুরা কমেন্ট সেকশনে উত্তর দিক। দশ মিনিট পর প্রশ্নকর্তাকে উত্তর দেয়া গেল। মানুষ সত্যিই সামাজিক!

আদৌ? সহজ এক প্রশ্নের সমাধানের জন্য ফেসবুকে ঢুঁ মারতে হলো, ওখানকার বন্ধুদের মন্তব্য নেওয়া হলো, তারপর জানানো হলো উত্তর। তাতেও কনফিডেন্সের চেয়ে কনফিউশান বেশি। এই বন্ধুদের কেউ যদি হঠাৎ বলে যে- না, আমরা অসামাজিক, তখন ধাঁধায় পড়ে যাবেন!

উপরোক্ত প্রশ্ন এবং এর উত্তরের জন্য ব্যতিব্যস্ত হবার দৃশ্য কাল্পনিক, আবার হালের প্রেক্ষাপটে এটিই যেন নিখাদ সত্য। যেমনটা সত্য, ‘আমরা সামাজিক, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে’! প্রযুক্তির উৎকর্ষে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। নিত্যনতুন আবিষ্কারে রোজ রোজ খোঁজ করি রোমাঞ্চের।

২০০৪ সালে তেমনই এক আবিষ্কার বদলে দিয়েছে দৈনন্দিন জীবনযাপনের রুটিন। একদম ভেঙেচুরে একাকার করার পর যেটুকু বাকী ছিল, সেটুকুও নতুন করে নতুন নতুন ফিচার দিয়ে ভাঙছে। আবিস্কারের নাম ‘ফেসবুক’। এক বিলিয়নের বেশি ব্যবহারকারীর বদৌলতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গডফাদার বলা যায় যাকে। সামাজিক মানুষের অসামাজিক কিংবা কথিত সামাজিকতার গল্পের সেই শুরু।

বর্তমান প্রজন্মের দিনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটে ফেসবুকে। মাঝবয়সী পুরুষ যাদের অধিকাংশই চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী তারাও উল্লেখযোগ্য সময় কাটান ফেসবুকে। কেবল টিএনএজার বা ওইসব লোকজন নয়, স্মার্টফোন ব্যবহার করা প্রতিটা মানুষের একেকটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে এবং সেখানে তারা একলা সময়টুকু অতিবাহিত করেন। একাকীত্বে ভোগেন না, এমন কারো দেখা পাওয়া কঠিন।

কেউ একাকীত্বের বিরুদ্ধে নিজেকে দাঁড় করান, কেউ একাকীত্বের রাজ্যে ডুব দেন। সঙ্গহীনতা মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ঠিক ওইসময়ে যদি ওই মানুষটা নিজের নিঃসঙ্গতা দূর করতে ফেসবুকে ঢুকে এবং দেখতে পায় তারচেয়েও অনেক অনেক সুখে আছে মানুষজন, তখন উল্টো মানসিক চাপ বাড়ে! হীতে বিপরীত হবার ফলে যেটুকু স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা বাঁচে, তাও মরে যায়। ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষের মধ্যে ৩০ শতাংশেরই কারণ হচ্ছে – ফেসবুক।

২০১৩ সালে জার্মানির হাম্বোল্ট ইউনিভার্সিটি এবং ডার্মস্টাড টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে ৬০০ জন লোকের উপর চালানো এক জরিপে উঠে আসে, প্রতি ৩ জনে ১ জনের ডিপ্রেশনের কারণ ফেসবুক। সেবছরই অন্য এক গবেষণায় বলা হয়, অতিমাত্রায় ফেসবুকিংয়ের ফলে ক্রমাগত মানুষের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ২০১৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, প্রবল হিংসাবোধ একপর্যায়ে হতাশায় পরিণত হয়ে ধীরে ধীরে আপনাকে বিষণ্ন করে তুলবে।

মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মার্গারেট রাফির মতে, যারা ফেসবুক বন্ধুদের ভার্চুয়াল লাইফস্টাইল বা অনলাইন কার্যক্রম দেখে ঈর্ষাণ্বিত হয় মূলত তারাই বেশি বিষণ্ণতায় ভোগে। ফেসবুক কেন, কিসের ভিত্তিতে ডিপ্রেশন তৈরি করে, সেদিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে একটি কমন জিনিস আছে তা হলো ‘ঈর্ষা’!

আপনার কোন বন্ধু কোথাও ঘুরতে গিয়ে চেকইন দিল, কোন বন্ধু বাইকে করে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে হ্যাংআউটে যাওয়ার ছবি দিল অথবা আপনার কেউই নয় স্রেফ ফেসবুক ফ্রেন্ড এমন কারোও যদি এইধরণের কিছু দেখেন এবং আপনি যদি সেই দল শ্রেণির না হন, নিজের কাছে তখন নিজেকেই ছোট লাগবে। বিভিন্ন ছুটিতে ঘুরতে পছন্দ করেন কমবেশি সকলে। ভ্রমণকালীন ছবি দিয়ে স্মৃতিটাকে আরো রঙিন করতে চায় তারা। এই চাওয়াটা উল্টো হীতে বিপরীত ঘটায়। ডিপ্রেশনের প্রধান কারণ ফেসবুক এমন লোকেদের মধ্যে ৫৫ ভাগই অন্যদের এমন অ্যাক্টিভিটিতে হতাশ হন।

প্রেমিক প্রেমিকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো বেশি নাজুক। বর্তমানে ছেলেমেয়েরা স্বাধীনচেতা, মুক্তমনা হওয়ায় ছেলেরা একঝাঁক মেয়ে, মেয়েরা একঝাঁক ছেলে বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা ঘোরাঘুরি, বেলাশেষে ফেসবুকে সেসব ছবি আপলোড করা এসব স্বাভাবিকভাবে নেয়। কিন্তু যুগলের কেউ একজন যদি ভিন্ন মনোভাব পোষণ করে তাহলে খুব দ্রুত সমস্যা ডালপালা মেলে। তুমি আজ এর সাথে কেন গেলে, এভাবে কেন গেলে, এত ক্লোজ কেন হলে, ওর সাথে ছবি তুলার কী প্রয়োজন ছিল; নানান প্রশ্নে ঝগড়া বাঁধে। এতে একপক্ষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে আরেকপক্ষের বিশ্বাসে চিড় ধরে!

অথচ সারাদিনের আড্ডাবাজিতে কী কী হয়েছে তা বলার জন্য হয়ত উন্মুখ হয়ে ছিল ভালবাসার মানুষটি। খেয়াল করলে বুঝা যাচ্ছে, ছবি বা পোস্ট না দিলে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করত না! মেসেঞ্জারের বেশ জনপ্রিয় একটা ফিচার মাই ডে বা মাই স্টোরি। সেখানেও নিস্তার নেই। নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলে তাতেও বাগড়া দেয় ভালবাসার মানুষ। নারীদের ক্ষেত্রে নিজেকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তখনই শুরু হয় যখন ফেসবুকে তারা দেখেন অমুকের শাড়ির দাম তারটার চেয়ে বেশি!

রান্না, সাজসজ্জা এসব বিষয়ে কম্পারিজনের ফলে নারীরা হীন্যমনতায় তুলনামূলক বেশি ভোগেন। তরুণদের বেলায় অ্যাটেনশন সিকিং একটা বড় কারণ। সবাই চায় নিজের ফ্যান ফলোয়ার থাকুক। সেলেব্রিটি হবার তীব্র বাসনা মনের মাঝে উঁকিঝুঁকি মারে। কিন্তু দেখা গেল অনেক প্রচেষ্টার পরেও সে কাঙ্খিত ফলোয়ার পেল না, তাকে কেউ লক্ষ্য করল না; যেখানে আনাড়ি কেউ হয়ত ঝুলিয়ে রাখছে তারই ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট! ওই অবস্থায় মানসিক চাপে চ্যাপ্টা হবার সংখ্যা ভুরিভুরি। আরো একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে বার্থডে। ফেসবুকের কল্যাণে জন্মদিনের কথা ভুলতে চাইলেও ভোলা সহজ নয়।

বার্থডে উইশ, সেলিব্রেশন, গিফট এসব পেয়ে যখন আপনি খুশিতে গদগদ হয়ে ফেসবুকে একের পর এক ছবি আপলোড দিচ্ছেন ফিলিং হ্যাপি ট্যাগলাইনে, তখন আপনারই কোন বন্ধু ঘরের কোণে বসে দেখছে আর মন খারাপে ডুবছে। মধ্য ত্রিশের পুরুষদের ডিপ্রেশনের একটা স্বাভাবিক কারণ হচ্ছে চাহিদা এবং এর পর্যাপ্ত যোগান না থাকা। হরহামেশাই মানসিক চাপে থাকে মিড থার্টির ব্যক্তিরা। মন ভালো করতে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে দেখল অমুক প্রমোশন পেয়েছে, তমুক মোটা অঙ্কের স্যালারিতে চাকরির অফার পেয়েছে, পুরনো বন্ধু গাড়ি কিনেছে; ব্যস যায় কোথায় আর! যতখানি সুখ বাকী ছিল, নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে গিয়ে ডিপ্রেশনের সুইচ ইনাবেল করে দিবে।

এসব থেকে স্পষ্ট হয় যে, ফেসবুক বিষণ্নতা সৃষ্টিতে পারঙ্গম।

সায়ানাইড নিমিষেই থামিয়ে দিতে পারে জীবনঘড়ি। এসিড বদলে দেয় মুখের অবয়ব। সায়ানাইড বা এসিডের চেয়ে হালফিলে ফেসবুকের নীল জগৎ কম নয়। বেদনার রঙ নীল, যেন অলক্ষ্যে প্রমাণ করছে দিনদিন।

তবে অসুখ থাকলে চিকিৎসাও থাকে। এখানে চিকিৎসক আপনি নিজে। ফেসবুকে সময় কম কাটান। সোশ্যাল মিডিয়া যদি আমাদের এন্টিসোশ্যাল করে তোলে প্রয়োজন নেই এমন সামাজিকতার। মানসিকতার পরিবর্তন করুন। বহুবছর বাদে পুরনো বন্ধু, পরিচিতজনদের খুঁজে পেলেন এই ফেসবুকের কল্যাণে যেখানে আদৌ গোটা জীবনে এদের অনেককেই পাবার সম্ভাবনা ছিল না, খুশি হোন তাতে।

ঈর্ষা জিনিসটা বরাবরই খারাপ। প্রত্যাশা কম রাখুন। সবার সান্নিধ্যে থাকুন। ডিপ্রেশন সমাধান নয়। নিজেকে প্রশ্ন করুন, ফেসবুক নাকি জীবন, কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? ফেসবুকে যা দেখা যায় তা সবসময় সত্যি নয়। ঘরে বসেই যদি কেউ ট্রাভেলিং পোস্ট করে, ডিম পাউরুটি খেতে খেতে যদি লিখে ইটিং ব্রেকফাস্ট উইথ ব্রেড অ্যান্ড বয়েলড, তা যাচাই-বাছাই করবেন কিভাবে? তাই অহেতুক নিজেকে ছোট ভাববেন না।

ফেসবুককে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ না ভেবে স্রেফ বিনোদনের অংশ হিসেবে নিন। ঘোরাঘুরির ছবি, স্যালারির অ্যামাউন্ট, শাড়ি গহনার দাম, ভালবাসার মানুষের হ্যাংআউটে হস্তক্ষেপ না করে অন্যকিছু দেখুন। ভালো ভালো বহু লেখক নিয়মিত লিখেন তাদের লেখা পড়ুন, সাফল্যে অনুপ্রাণিত হোন, রক্তদাতার রক্তদানের ছবি দেখে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ হোন, বিভিন্ন গ্রুপে গিয়ে মজা করুন, মেসেঞ্জারের ডে-তে মজার মজার মিম শেয়ার করুন, নিজেই নানান বিষয় নিয়ে স্ট্যাটাস, ছবি তুলে আপলোড দিন।

ডিপ্রেশনে ভুগলে আপনার সাথে সাথে আশপাশের অনেকগুলো মানুষ সমস্যার সম্মুখীন হয় আপনার কারণে। বিশেষত পরিবার, প্রিয়জন। তাদের কথা ভাবুন। সকলের জীবনেই ডিপ্রেশন থাকে, থাকবেই। তা অতিক্রম করতে হবে। মানসিক চাপে জর্জর করে থামিয়ে রাখার জিনিস জীবন নয়, এই ব্যাপারটুকু উপলব্ধি করতে পারলেই ফেসবুক আপনাকে নিয়ে মাইন্ড গেম খেলতে পারবে না আর। সব জটিলতার একটাই সমাধান, সবকিছু সহজভাবে নিতে শিখুন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।