জয়ের ব্যবচ্ছেদ পর্যালোচনা ও ১২ টি সিদ্ধান্ত

১.

ইনিংসের শুরুতে প্রাপ্তি ছিল সৌম্য সরকারের নির্ভীক শুরু! সেটাই ৩৩০ এর একটা টার্গেট সেট করে দেয়। সৌম্যের এই ভয়ডরহীন শুরুটা প্রতি ম্যাচে দরকার। আমাদের ভাগ্য খুব ভালো যে সৌম্যের মতো একজন পুলার আমরা শুরুতে খেলাতে পারছি। সৌম্য পুল করার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা বাউন্সার করা কমিয়ে দিয়েছিলো। প্রথমেই এই অ্যাটাকিং স্ট্র্যাটেজি কাজে দিয়েছে!

আমরা যেহেতু এবার ১৯৯৬ বিশ্বকাপের শ্রীলঙ্কার মতো ফলাফল পাবার অপেক্ষায় আছি, তাই সেবারের শ্রীলংকার স্ট্র্যাটেজি মনে করিয়ে দেই। অর্জুনা রানাতুঙ্গা সেবার সনাৎ জয়াসুরিয়াকে বলেছিলেন, ‘পরের ১০ ম্যাচে শূণ্য রানে আউট হলেও সমস্যা নেই। শুধু প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দিয়ে আসো!’ সৌম্য-লিটন যেই খেলুক- এটাই হওয়া উচিত স্ট্র্যাটেজি!

২.

আগেও বলেছি, আবারও বলি- এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের টপ-মিডল অর্ডার বিশ্বে অন্যতম সেরা। বিশেষ করে ১-৬ (৫?)- এ যে পরিমাণ অভিজ্ঞতা আছে, সেটা আর কোন দলেরই নাই। তামিম, সাকিব, মুশফিক, রিয়াদ চারজনেই ১৭৫ ম্যাচের উপরে খেলেছে। এই অভিজ্ঞতা আর কোন দলের আছে? পাঁচ নম্বর পজিশন নিয়ে এখনও প্রশ্ন আছে- সেটা আপাতত রেখে গেলাম।

আজকে সাকিব-মুশফিক যে ম্যাচিউরিটির সাথে জুটি গড়েছে সেটা একদমই আদর্শ। তারা খুব চার-ছয় মারার দিকে নজর দেয়নি। তাদের জুটির মূলমন্ত্র ছিল সিঙ্গেলস-ডাবলস। আমার দৃষ্টিতে মুশফিক অনেকদিন ধরে স্টিভেন স্মিথের সাথে বিশ্বের সেরা চার নাম্বার ওডিআই ব্যাটসম্যান। তার ব্যাটিংটা মূল চালিকাশক্তি!

৩.

এই বিশ্বকাপে কে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনজনের নাম কেউ চাইলেও আমি কেবলমাত্র সাকিব আল হাসানের নাম নিবো। এটা কেবলই আবেগ নাকি বাস্তবতা? আমি বলি, সাকিবকে এবারের মতো ডিটারমাইন্ড আগে কখনো দেখিনি। সাকিব আল হাসান কখনোই টেকনিক্যালি সাউন্ড ব্যাটসম্যান না, অথবা অসাধারণ টার্নার বোলার না। সাকিবের স্কিলের মূল শক্তি তার নিজের ইচ্ছা, ডিটারমিনেশন এবং স্মার্টনেস। এই বিশ্বকাপের আগে তিনি ৬ কেজি ওজন কমিয়েছেন। তিনি নিজে চাচ্ছেন, তিন নাম্বারে নামতে। তার এই ‘নিজে চাওয়াটা’ তাঁর খেলার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটাই তাঁকে আরও ভালো করতে সাহায্য করবে। এরসাথে তাঁর স্ট্রাইক রোটেট করার ক্ষমতা তো আছেই।

ইশ, তামিমকে যদি বুঝানো যেতো যে, স্ট্রাইক রেট বাড়ানো মানে শুধু হার্ডহিটিং নয়- স্ট্রাইক রোটেট করাও! যাই হোক, সাকিবের বোলিংটা প্র্যাকটীস ম্যাচে খুব একটা ভালো হয়নি। কিছুটা চিন্তা আছে। তবে সাকিবের প্রতি যে বিশ্বাস আছে, তাতে বোলিংয়ে উইকেট পাওয়াও খুব একটা দূরের মনে হচ্ছে না!

অনুমিত ভাবেই সাকিব ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হয়েছে। তবে, এটা শুধু শুরু হোক। এই টুর্নামেন্ট বিশ্বের বিভিন্ন এক্সপার্টের কাছে তার সর্বকালের অন্যতম সেরার স্বীকৃতি পাবার টুর্নামেন্ট হোক!

৪.

সাব্বিরকে না খেলিয়ে মোসাদ্দেককে খেলানোটা কাজে লেগেছে। সাব্বির সুযোগ পেয়ে ক্যাপিটালাইজ করতে পারেনি। তাই মোসাদ্দেকই সঠিক সিদ্ধান্ত। ৪৭ নাম্বার ওভারের শেষ বলে মরিসের ফুল লেংথ বলে ব্যাকফুটে গিয়ে সে কাভারের উপর দিয়ে যে চারটা মেরেছে সেটা ইনিংসের সেরা শট! কোন সন্দেহ ছাড়াই! রিয়াদের ফিনিশিং বরাবরের মতোই। ৪০-৪৫ এই পাঁচ ওভারে রান কিছুটা কম না হলে ১০টা রান আরও বেশি হতো।

৫.

তবে আমরা ব্যাটসম্যানদের শুধু দোষ না দিয়ে, ৩৫-৪৫ ওভারের বোলিংয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকান বোলারদের কৃতিত্ব দিতে হবে। তারাও বোলিং করতে আসছে। তাদেরও স্কিল আছে। সেসময় তাহির, রাবাদা, মরিস ভালো বোলিং করেছে। এই সত্যিটা মেনে নেই। সেসময়টা দেখে খেলার কারণেই রিয়াদ-মোসাদ্দেক শেষ ৫ ওভারে ক্যাশ ইন করতে পেরেছেন। একটু না পারলেই অসহিষ্ণু হওয়ার মানসিকতা থেকে আমাদের দর্শকদের বেরিয়ে আসতে হবে।

৬.

বোলিং ইউনিটের প্রধানতম আশার জায়গা মুস্তাফিজুর রহমান। ভারতের সাথে প্রস্তুতি ম্যাচে তিনি ফর্মে ফেরত আসার ঝলক দেখিয়েছিলেন। প্রথম স্পেলে রান চেক দিয়েছেন। আজকে দ্বিতীয় স্পেলে মনে হলো পুরোপুরি ফিরে আসলেন। তাঁকে আনাই হয়েছিলো ব্রেক থ্রু দেয়ার জন্য। প্রথম ওভারে ক্যাচ উঠিয়েছিলেন। রিয়াদ ধরতে পারেন নি। পরের ওভারে আবার মিলারকে ক্যাচ বানালেন মিরাজের কাছে। এরপর কাটারে বল উঠে গিয়েছিলো।

তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটা কিন্তু রিভার্স সুইং হয়ে ভিতরে ঢুকেছে! ডুমিনিকে ব্যাকফুটে যেভাবে নিলেন, তাতে এলবিডাব্লিউ না হলেও ডুমিনির মাইন্ডসেট কাঁপিয়ে দিয়েছে অবশ্যই! শেষ স্পেলেও ডুমিনিকে ফেরানো, যখন সামান্য ভয়টা ছিল! ফিজের আজকের বোলিং পারফরম্যান্স অনেকদিন পরে তার অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স! গোল্ডেন আর্ম ফর আস!

৭.

সাইফউদ্দিনের বোলিং ভারতের সাথে ওয়ার্ম আপ ম্যাচে প্রথমে দেখে ভালো লেগেছিলো। আজকে শুরুর স্পেলে সে সাধারণের চেয়েও সাধারণ ছিল। তার ব্যাপারে কথা সবসময়েই শুনেছি যে সে ডেথ বোলার। অনেস্টলি বললে, আজকে তার ডেথ বোলিং ভালো হয়েছে। দুইটা উইকেটের প্রথমটা হিট এন্ড মিস। তবে দ্বিতীয় উইকেটটা অবশ্যই সেট আপের উইকেট।

সে এর আগে ওভারের প্রথম বলটা ইয়োর্কার দিয়েছিলো, ব্যাড লাকে চার হয়ে গেছে। পরেরটা স্লোয়ার বাউন্সার। উইকেট টেকিং বলটা লো ফুলটসে ক্যাচ দেয়ানো! এরপরেও ইয়োর্কার ফেলতে পেরেছে। তার বোলিংয়ের যেটা সমস্যা সেটা হলো পেস একদমই কম। তাই ইরর অফ মার্জিনের কোন জায়গা নেই। ডুমিনি যে দুইটা চার মারলো, সেই দুইটা চার হয়েছে কারণ সে লেংথ মিস করেছে। এজন্যেই তাঁকে নিয়ে রিস্ক থাকবেই।

৮.

সাইফ, ফিজ থাকুক। কিন্তু প্রথমে অ্যাটাকে যাবার জন্য রুবেল হোসেনকে লাগবেই। সে রান লিক করুক, সমস্যা নাই। রান চেক দেয়ার জন্য আমাদের স্পিনাররা আছেন। ম্যাচ শুরুর আগেও দেখলাম স্টার স্পোর্টসে, স্কট স্টাইরিশ রুবেলকে নিয়ে কথা বলছেন। তখনও হয়তো তিনি জানতেনই না যে রুবেল একাদশে নেই।

৯.

সাকিব আর মিরাজ দুইজনেই স্মার্টেস্ট স্পিনার। ব্যাটসম্যান বুঝে তাদের আটকে রেখে মাথা দিয়ে বল করতে জানেন। তারা তাদের বোলিং পারফরম্যান্স ধরে রাখুক।

১০.

মাশরাফি বিন মুর্তজা বোলিংয়ে আজকে কিছুটা চিন্তার কারণ ছিলেন। তিনি পরের ম্যাচে ফিরে আসবেন, সেটাই আশা। তার অধিনায়কত্ব কেন সেরাদের সেরা সেটা তো বরাবরই প্রমাণিত।

১১.

ফিল্ডিং বিশাল বড় একটা চিন্তা হয়ে রইলো। মুশফিকের কিপিং মিস, তিনটা ফিল্ড ক্যাচ মিস, ওভার থ্রো, গ্রাউন্ড ফিল্ডিং মিস- সবমিলিয়ে ২৫-৩০ রান বেশি হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার। এই জিনিস পরের ম্যাচে চেক দিতে হবে।

১২.

আমার মনের প্রত্যাশিতভাবেই ম্যাচ জয়ে শুরু করলাম। শেষ দুই ওভারে খেলা একটু ছেড়ে না দিলে ‘.২’ বাড়তো রানরেট। এটা ভবিষ্যতে মাথায় রাখতে হবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।