রোনালদো বনাম ‘শিরোপা ক্ষরা’র নেদারল্যান্ডস

১.

জ্ঞান হবার পর প্রথম বিশ্বকাপ দেখি ১৯৯০ সালে। সেই সময় পত্রিকায় রুড গুলিতকে নিয়ে দেখি বিশাল এক ফিচার। আগের বিশ্বকাপের স্টার ম্যারাডোনার চাইতেও নাকি উনি ভালো খেলোয়াড়। এসি মিলান মাতিয়ে এসে বিশ্বকাপটাতেও ঝলক দেখাবেন এমন বিশ্বাস করার মানুষের অভাব ছিল না সেই সময়। না, সেই বিশ্বকাপটা মোটেও ভালো খেলেনি গুলিত, নেদারল্যান্ডসও বাদ পড়ে যায় দ্বিতীয় পর্বে জার্মানীর কাছে (সেই বিশ্বকাপে জার্মান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল)। আর আমি হয়ে গেলাম ম্যারাডোনার ভক্ত।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে অবশ্য একটু ভালো নেদারল্যান্ডের দেখা পেয়েছিলাম। তাদের প্রথম ম্যাচ দেখি কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে। ব্রাজিল সেই বিশ্বকাপে তুখোড় একটা দল, ৫৩ আর ৬৩ মিনিটে দুই স্টার রোমারিও আর বেবেতোর দুই গোলে পিছিয়ে পড়লেও ৬৪ আর ৭৬ মিনিটে গোল শোধ করে ভালোভাবেই ফিরে আসে। কিন্তু ৮১ মিনিটে ব্রাঙ্কোর অসাধারণ গোলে নেদারল্যান্ড বাদ পড়ে যায়। তবে হেরে যাবার পরেও ভালো খেলার কারণে নেদারল্যান্ডসকে ভালো লেগে যায়।

২.

নেদারল্যান্ডসের ভক্ত হলাম মূলত ১৯৯৮ বিশ্বকাপ থেকে। সফলতা না পাওয়ায় অনেকেই হয়তো নেদারল্যান্ডরকে মনে রাখে নি। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ড দুর্দান্ত খেলাই উপহার দিয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হারায় উড়তে থাকা আর্জেন্টিনাকে। মাঝ মাঠ থেকে উচু করে আসা বল থামিয়ে বার্গক্যাম্প যেভাবে গোলটা করলেন তা অবিশ্বাস্য।

একজন স্ট্রাইকারের তিনটি গুণ অবশ্যই থাকতে হবে- বল রিসিভিং, কন্ট্রোলিং আর প্লেসিং। বার্গক্যাম্পের মাঝে তিনটিই ছিল। ক্লুইভার্টের প্রথম গোলটিও অসাধারণ ছিল। তবে সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনাও দুর্দান্ত খেলেছিল। ওর্তেগা ভুল না করলে হয়তো সেমিতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ক্লাসিকো দেখতে পেতাম। কিন্তু সব সময় তো আর ইচ্ছে পূরণ হয় না।

সেমিতে নেদারল্যান্ড আবার মুখোমুখি হয় ব্রাজিলের। টাইব্রেকারে হারা সেই ম্যাচেও নেদারল্যান্ডস লড়াই করেছে সমানে সমানে। ব্রাজিল অবশ্যই যোগ্য ছিল, তবে আমার বিচারে নেদারল্যান্ডস সেই ম্যাচে ব্রাজিলের চেয়েও ভালো খেলেছিল। কিন্তু দিনশেষে সব সময় যোগ্য দল জেতে না।

৩.

মূলত এই বিশ্বকাপের পর থেকেই নেদারল্যান্ডসের প্রতি একটা ভালো লাগা তৈরী হয়। নেদারল্যান্ডের উপর সবচেয়ে বিরক্ত লেগেছে ইউরো ২০০০ আর ২০০৮ এ। ইউরো ২০০০ এ নেদারল্যান্ডের গ্রুপে ছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক আর ডেনমার্ক। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের রাউন্ডে উঠার সময় ফ্রান্সকে তারা হারায় ৩-২ গোলে। কোয়ার্টারে যুগোস্লেভিয়াকে ৬-১ গোলে হারিয়ে সেমিতে ইতালির বিরুদ্ধে ট্রাইবেকারে হেরে যায় তারা।

ইউরো ২০০৮-এ গ্রুপে বাকি দলগুলো ছিল ইতালি, রোমানিয়া আর ফ্রান্স। দ্বিতীয় পর্বে উঠার শঙ্কায় থাকা নেদারল্যান্ড ইতাকে হারায় ৩-০ গোলে, ফ্রান্সকে হারায় ৪-১ গোলে, আর রোমানিয়াকে হারায় ২-০ গোলে। অথচ দুর্দান্ত খেলতে থাকা এই দল কোয়ার্টারে গিয়ে রাশিয়ার কাছে হারে ৩-১ গোলে।

২০১০ বিশ্বকাপে তো অসাধারণ খেলে কোয়ার্টারে ব্রাজিলকে হারায় তারা। প্রথমেই ১ গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ে স্নাইডারের দুই গোলে ব্রাজিলকে হারানো একটি অসাধারণ কামব্যাক ছিল। ফাইনালে স্পেনের কাছে হারটাও অপ্রত্যাশিত নয়, তবে নেদারল্যান্ড জিতলে সেটাও অপ্রত্যাশিত হতো না। এবং জিতে গেলে ফুটবল ইতিহাসটা হয়তো একটু ভিন্নভাবেই লেখা হতো। ২০১৪ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বাদ পড়ে যায় তারা।

৪.

খুব দুর্দান্ত দল নিয়েও জায়গা মতো ভালো খেলতে না পারার কারণে চুড়ান্ত সাফল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে নেদারল্যান্ডস। অথচ পুণর্গঠনের মধ্যে থাকা দলটা উঠে এসেছে ইউয়েফা ন্যাশন্স লিগের ফাইনালে। সেমিতে ইংল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নিঃসন্দেহে ফাইনালের জোড়ালো দাবিদার। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল।

ঐতিহ্য হিসেবে নেদারল্যান্ড সবসময়েই পর্তুগালের চাইতে এগিয়ে। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে পর্তুগালের বিপক্ষে তাদের রেকর্ড খুবই বাজে। ১৩ ম্যাচের মুখোমুখি লড়াইয়ে মাত্র ২ টি ম্যাচে জয় পেয়েছে নেদারল্যান্ড। ৭ টি ম্যাচে হারের বিপরীতে ড্র করতে পেরেছে মাত্র ৪ টি ম্যাচে।

সবচেয়ে বড় কথা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর রেকর্ডও বেশ ভালো। ইউরো ২০০৪ এ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হয় পর্তুগাল আর নেদারল্যান্ডস। শক্তিশালী এবং ফেভারিট নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-১ গোলে জিতে পর্তুগাল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ১ টি গোল করেন আর একটা গোলে অ্যাসিস্ট করেন।

ইউরো ২০১২-তে পর্তুগাল জায়গা পায় ডেথ গ্রুপে। গ্রুপের অন্য সদস্যরা হচ্ছে ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড আর জার্মানী।

জার্মানীর সাথে প্রথম ম্যাচেই ১-০ গোলে হেরে যায় পর্তুগাল। পরের ম্যাচে গ্রুপের সবচেয়ে সহজ প্রতিপক্ষ ডেনমার্কের সাথে ৩-২ গোলে জেতে পর্তুগাল। নেদারল্যান্ডের সাথে শেষ ম্যাচটা হয়ে যায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এককথায় ক্রুশিয়াল।

শেষ ম্যাচের আগে সমীকরণ ছিল অনেক। যদি পর্তুগাল নেদারল্যান্ডের সাথে হারে আর ডেনমার্ক জার্মানীর সাথে জেতে তাহলে অনেক হিসেব উলটে যাবে। এমনকি পর্তুগাল যদি নেদারল্যান্ডের সাথে বড় ব্যবধানে হারে তাহলেও পর্তুগালের পরিবর্তে নেদারল্যান্ড হবে পরের পর্বে জার্মানীর সঙ্গী।

ম্যাচের শুরুটা তেমনই ছিল। ১১ তম মিনিটেই ভ্যান ডার্ট-এর গোলে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ড। কিন্তু এরপরেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মোটামুটি এক হাতে ম্যাচটা বের করে নেন। ২-১ গোলে জেতা ম্যাচের দুটি গোলই করেন ক্রিশ্চিয়ানো। ম্যাচ সেরা হন রোনালদো।

৫.

জ্ঞান হবার পর থেকে নেদারল্যান্ডসকে শিরোপা জিততে দেখিনি। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ট্রফি না জেতার কারণে অনেক ট্রল হয়। অথচ নেদারল্যান্ড ট্রফি জিতেছে তারও আগে। মানছি পর্তুগাল কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য ট্রফি জেতাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে, নেদারল্যান্ডস ফুটবল জাতিটার উত্থানের জন্যেও একটা ট্রফি জেতা প্রয়োজনীয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।