পকিরি: রুপালি দুনিয়ায় ইতিহাস গড়েছিল যে ছবি

প্রত্যেক অভিনয় শিল্পীর জীবনেই এমন একটা ছবি থাকে, যা দিয়ে সেই তাঁকে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যায়। দক্ষিণী অভিনেতা মহেশ বাবুর জীবনে সেই ছবিটি হল ২০০৬ সালের ২৮ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া ‘পকিরি’। থ্রিলার, অ্যাকশন, ড্রামা, রোম্যান্স কিংবা কমেডি – কোনো কিছুরই যেন অভাব ছিল না এই ছবিতে। মহেশ বাবুর তুখোড় অভিনয় ছবিটিকে অনন্য এক মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা কয়েকটি কাজের একটি এই ছবি।

যেকোনো দর্শকই যখন ছবিটা প্রথমবার দেখেন, তখন নির্ঘাত থ্রিলের সাগরে হারিয়ে যান। মহেশ-এর চরিত্রটা ভিলেন, গ্যাংস্টার নাকি অন্য কেউ? – এই প্রশ্নটাই বারবার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। নির্মাতা পুরি জগন্নাথ তার সেরা কাজে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ অসংখ্য টুইস্ট দেখিয়েছেন।

মজার ব্যাপার হল, এটা মহেশ বাবুর ‘আইকনিক’ ছবি হলেও তিনি কখনোই চরিত্রটির জন্য পরিচালক-প্রযোজকদের প্রথম পছন্দ ছিলেন না।  চরিত্রটির জন্য পবন কল্যান, রবি তেজা কিংবা সনু সুদ – অনেকেকেই প্রস্তাব করা হয়েছিল।

মহেশ ছবিটি করেন। এটা তাঁকে সুপারস্টার তকমা এনে দেয়। ছবিটির জন্য নিজের হেয়ারস্টাইলে পরিবর্তন আনেন। পাঁচ কেজি ওজনও বাড়ান। ছবিতে তাঁর ডাক নাম থাক ‘পান্ডু’। মজার ব্যাপার হল এটা নির্মাতা পুরি জগন্নাথের স্ত্রীরও ডাক নাম!

‘পকিরি’ ছবির গল্পে নায়িকা চরিত্রটি ‍গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। তবে, ইলিয়েনা ডি’ক্রুজ যতক্ষণ পর্দায় ছিলেন, ততক্ষণ আগুন ঝরিয়েছেন। বিশেষ করে মহেশ বাবু আর ইলিয়েনার রসায়নে দর্শকরা জমে গেছেন রোম্যান্সে।

নির্মাতা পুরি জগন্নাথের সেরা কাজগুলোর অন্যতম ‘পকিরি’। বিশেষ করে অসাধারণ স্টোরি টেলিংয়ে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন দর্শক আর সমালোচকদের। স্ক্রিন প্লে, সংলাপ, গান, আবহ সঙ্গীত কিংবা চরিত্র – সব কিছুতেই নির্মাতা পেয়েছেন শতভাগ নম্বর।

১০ কোটি রুপি বাজেটের মধ্যে তিনি এই ছবি করেছেন। এটাও একটা বড় ব্যাপার। ভারত বর্ষের ইতিহাসেই এই ছবিটি অনন্য একটা জায়গা দখল করে আছে। সর্বকারের সেরা ভারতীয় ছবির তালিকায় এটা আছে ১৫৫ তম অবস্থানে।

চেন্নাই শহরে প্রথম তেলেগু ছবি হিসেবে ‘পকিরি’ টানা ১০০ দিন থিয়েটারে চলেছিল। এখানেই শেষ নয়, আন্ধ্রা প্রদেশে এই ছবি টানা ৫০০ দিন চলে। ওই সময় ‘পকিরিই’ ছিল সবচেয়ে বেশি আয় করা তেলেগু ছবি। সেই রেকর্ড টিকে ছিল তিন বছর। টানা এক হাজার দিন থিয়েটারে থাকা একমাত্র তেলেগু ছবিও ‘পকিরি’।

ছবির নামটাও শুরুতে ভিন্ন ছিল – ‘উত্তম সিং সন অফ সুরিয়া নারিয়ানা’। পরে নাম পাল্টানো হয়। ছবির শ্যুটিং শেষ হয় মাত্র ৭০ দিনেই। সব অভিনেতা ও কলাকুশলীরা টানা কাজ করে গেছেন। এর মধ্যে শেষের ১০ দিন কেবল অ্যাকশন দৃশ্যের শ্যুটিং হয়।

ছবিটি তামিল, কান্নাড়া তো বটেই রিমেক হয় বলিউডেও। বলিউডে ছবিটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র করেন সালমান খান। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া সেই ছবির নাম ‘ওয়ান্টেড’। ছবিটি দিয়ে নিজের দু:সময় কাটিয়ে আবারো সুদিন ফিরে পান সালমান খান। বাংলাদেশে এই ছবির রিমেক হয় ‘মনের জ্বালা’ নামে।

ওয়ান্টেডে ইলিয়েনার চরিত্রটি করেছিলেন আয়েশা টাকিয়া। মজার ব্যাপার হল, মূল ছবিতেও প্রথম পছন্দ ছিলেন টাকিয়াই। এমনকি দিপীকা পাড়ুকোন ও কঙ্গনা রনৌতও এই ছবির প্রস্তাব পেয়েছিলেন। পরে চরিত্রটি চলে যায় ইলিয়েনার হাতে।

ছবির সবচেয়ে আলোচিত  দৃশ্য হচ্ছে এর ক্লাইমেক্স। মহেশ বাবু এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এই দৃশ্য আর দু’টি গানের চিত্রায়নেই তাদের ৩৮ দিন শ্যুটিং করতে হয়েছিল। এর মধ্যে কাঁধের ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় মহেশকে।

শ্যুটিংয়ের মাঝে দুর্ঘটনাও ঘটে। পানির নিচে একটা দৃশ্য ছিল, যার জন্য পানির নিচে বৈদ্যতিক বাতিও ব্যবহর করা হয়েছিল। এর মধ্যেই শর্ট সার্কিট হয়। ইউনিটের এক সদস্য মারাও যান। এর কয়েক সেকেন্ড আগেই সেই পুলের পানি থেকে উঠে আসেন মহেশ বাবু। মানে আর কয়েকটা সেকেন্ড দেরী করলে তাঁর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।