আপনাদের কাছে কি পুরুষ যৌনকর্মী আছে?

– আপনাদের কাছে কি পুরুষ যৌনকর্মী আছে?

পতিতালয়ের পরিচালিকাকে জিজ্ঞেস করছেন একজন পুরুষ। জবাবে পরিচালিকা বললেন, ‘এসবের জন্য আলাদা গ্রুপ আছে আপনি চাইলে আমি নাম্বার দিতে পারি।’

– নাহ আসলে আমার জন্য নয়।

– তাহলে?

– আমার মেয়ের জন্য!

‘পেরানবু’ সিনেমার একটা অংশের কথোপকথন এটা। এই সিনামার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা কথোপকথন। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম এই সময়টায়।

প্রকৃতি তার নিজের ধাড়া বজায় রেখে চলে।কে কোথায় কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে আছে তা কোন বিষয় নয়, সে তার নিজের মতই চলবে। আমাদেরই সেই প্রকৃতি এবং পরিবেশের সাথে ক্ষাপ খাইয়ে নিতে হবে। আর এই প্রকৃতির কাছে সবচাইতে অসহায় হয় সমাজের দুর্বল জীবেরা। আর মানুষ তো সকল জীবের শ্রেষ্ঠ জীব। দুর্বলতাকে শুধু মাত্র শারিরিক ভাবে প্রকাশ করলে ভুল হবে কারন দুর্বলতা মানুষিক ভাবেও প্রকাশ পায়।

‘পেরানবু’ এমনই শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসহায় দুজন মানুষের গল্প। একজন বাবার গল্প যে কিনা মানসিক ভাবে অসহায় আর তার মেয়ে যে কিনা শারীরিক ভাবে অসহায়। প্রকৃতি এই দুজনকেই তার নিষ্ঠুর খেলার জন্য বেছে নিয়েছে। বাবা-ছেলের সম্পর্ক নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর সিনামা হয়েছে কিন্তু বাবা-মে’র সম্পর্ক নিয়ে তেমন কোন সিনামা বানানো হয়েছে কিনা আমার মনে পরছেনা আপাতত। তাও এমন একটা মেয়ে যে কিনা শারিরিক ভাবে অসহায়, সোজা কথায় বলতে গেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী।

মেয়ে জন্মের পরই বাবা বিদেশে চলে যায়।শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মেছিলো বলেই নিজেকে একপ্রকার দুরে সরিয়ে নিয়েছিলো। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত মা’ই সেই মেয়ের দেখাশোনা করেছে। কিন্তু একদিন সেও এই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, তাও আবার তার অন্য আরেক প্রেমিকের সঙ্গে। যাওয়ার আগে অবশ্য নিজের স্বামীর কাছে চিঠি লিখে গিয়েছিলো।

সেই চিঠি পেয়েই ১৪ বছর পর নিজের মেয়ের দায়িত্ব নেয়ার জন্য এসে হাজির হলেন বাবা। এখান থেকেই শুরু গল্পের। আগেই তো বলেছি প্রকৃতি নিজের ধাড়ায় চলে তাই কিছু কিছু সময় প্রকৃতি খুবই নিষ্ঠুর। ১৪ বছরের এক প্রতিবন্ধী মেয়ে। এরা সাধারণ মানুষের তুলনায় স্বাভাবিক বুদ্ধিগুণ সম্পন্ন না হলেও বয়সের সাথে সাথে এদের শারিরিক এবং মানসিক পরিবর্তন কিন্তু ঠিকই হয়।

১৪ বছেরের বয়ঃসন্ধিতে পা দেয়া এক প্রতিবন্ধী মেয়ে যে কিনা নিজের খেয়াল ঠিকমত রাখতে পারেনা আর তাকে দেখাশোনা করার মত কেবল মাত্র তার বাবাই আছে এখন। সম্পর্ক বাবা-মে’র কিন্তু এর বাইরেও একজন পুরুষ আর একজন নারী। প্রকৃতিগত ভাবেই অনেক ব্যাপার আছে যেগুলো সবার কাছে শেয়ার করা সম্ভব হয়না বিশেষ করে একজন মেয়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি। এই স্ট্রাগল নিয়েই বাবা-মেয়ের চমৎকার সম্পর্কের একটা সিনামা।

খুবই ইউনিক একটা কনসেপ্ট আর চমৎকার গল্প। এমন ইউনিক একটা কনসেপ্টে বাবা-মেয়ের সম্পর্কটা এত চমৎকার ভাবে দেখানো হয়েছে – এক কথায় দুর্দান্ত!

ম্যামোত্তি বাবা আর সাধনা মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছে। কিংবদন্তিতুল্য ম্যামোত্তির অভিনয় দক্ষতা নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকার কথা না। তবে রীতিমত হতভম্ব হয়েছি মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করা সাধনাকে দেখে। সম্পুর্ণ ছবিতে প্রতিবন্ধীর চরিত্রটা এত নিখুঁত আর সুন্দর ভাবে করেছে আমি সিনেমা শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত বুঝতে পারিনি যে সে একজন স্বাভাবিক মানুষ।

সিনামা দেখতে দেখতে আমার ধারনা ছিলো চরিত্রের প্রয়োজনে হয়তো সত্যি সত্যি একজন প্রতিবন্ধীকে দিয়ে অভিনয় করানো হয়েছে। কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার পর যখন গুগল করলাম তখন জানতে পারলাম যে না সে একজন স্বাভাবিক মানুষ। কিভাবে সম্ভব একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে এমন একটা চরিত্রে এত সাবলীল অভিনয় করা!

শেষে এক কথায় বলতে গেলে এটা সত্যিকারের মাস্টারপিস। জন্য দেখার আমন্ত্রণ রইলো। বিশেষ ভাবে যারা সবসময় সিনেমা দেখেন, সব ধরনের সিনেমা দেখেন তাঁদের জন্যতো অবশ্যই এটা দেখা বাধ্যতামুলক।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।