গালগল্প নয়, সত্যিই তাঁদের সামর্থ্য সুপারহিরোদের মত!

শক্তিমান, চাচা চৌধুরীর সাবু কিংবা হাল আমলের স্পাইডার ম্যান, হাল্ক, আয়রন ম্যান – যুগে যুগে এই সুপারহিরোগুলো কমিকের পাতা থেকে মুভির পর্দা সবকিছুতেই আলো ছড়িয়েছে। কমিকসের পাতা উল্টানোর সময় কিংবা মুভির দুর্ধর্ষ কোন সিনে কাল্পনিক চরিত্র গুলোর জায়গায় আমরা নিজেদেরকে কল্পনা করেছি বহুবার।

কিন্তু কখনো কি ভেবেছি এই সব চরিত্রের মত কিছু আসল সুপারহিরো আমাদের পৃথিবীতে রয়েছে। বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিচিত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এমন কিছু মানুষ নিয়ে সাজানো হয়েছে আমাদের আজকের এই আয়োজন।

  • লিও থো লিন চুম্বক মানব

পৃথিবীতে অনেক মানুষ তাদের শারীরবৃত্তীয় চুম্বক ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু চীনা নাগরিক লিও থো লিন এই ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি পরিচিত তার অসাধারণ চুম্বকীয় ক্ষমতার জন্য। তাঁর শরীর যেকোন ধরনের ধাতু যা চুম্বক দ্বারা আকর্ষিত হয় তাদের কে নিজের কাছে টেনে নেয় এবং চামড়ার সাথে যুক্ত করে রাখে। মালয়শিয়া প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক তার উপর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে তার চামড়া অত্যন্ত উচ্চ ঘর্ষণ ক্ষমতা সম্পন্ন, যার ফলে তাঁর শরীরের চামড়া ধাতুর প্রতি শোষণকারী প্রভাব দেখাতে সক্ষম।

  • ড্যানিয়েল ব্রাউনিং স্মিথ একজন রাবার বালক

শিরোনাম দেখে হয়ত ভাবছেন, ‘এ আবার কী’!

আমেরিকার ড্যানিয়েল ব্রাউনিং স্মিথ আসলে একজন বিভঙ্গবিনোদক অর্থাৎ এই ব্যক্তি তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে নানা ভাবে বাকিয়ে দর্শকদের মনোরঞ্জন দেয়। আপাতদৃষ্টিতে এই ধরনের অঙ্গভঙ্গি সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি কঠিন হলেও ড্যানিয়েলের কাছে এইসব খুবই সহজ। তিনি একাধারে কৌতুকাভিনেতা, টিভি হোস্ট,খেলাধুলোয় বিনোদনকারী এবং স্টান্টম্যান। সেই সাথে গিনেজ বুকে বিশ্বের সবথেকে নমনীয় ব্যক্তির তকমাও তার ঝুলিতে রয়েছে।

তার এই অসাধারন শারীর বৃত্তীয় বৈশিষ্টর জন্য দায়ী মূলত হাইপারমোবাইল – ইহেলারস – ডানোস সিনড্রোম, যা জীনগত পরিবর্তনের কারনে হয়ে থাকে। সাধারণত এই ধরনের সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের তীব্র ব্যথা সহ্য করতে হয়। কিন্তু, ড্যানিয়েলের ক্ষেত্রে এই ব্যাথা খুব হালকা পর্যায়ে রয়েছে।

  • শি লিলিয়াং জলচর মানব

পানির উপর দিয়ে হেটে চলার অলৌকিক ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত শি লিলিয়াং। এই শাওলিন সন্ন্যাসী পানির উপরে ১২৫মিটার(প্রায় ৪৫০ফিট) হেটে ২০১৫ সালে নতুন বিশ্ব রেকর্ড করেন। ব্যপারটা কাল্পনিক মনে হলেও শি লিলিয়াং এই কাল্পনিকতায় বাস্তবের তুলির আচড় দিয়ে বিশ্ববাসীকে অবাক করছে।

  • হাই অ্যাঞ্জোক নির্ঘুম মানব

সামান্য এক রাত ভালো মত না ঘুমাতে পারলে যেখানে আমাদের ১২ টা বেজে যায় সেই জায়গায় ভিয়েতনামের বাসিন্দা, হাই এঞ্জোক আজ ৪৩ বছর ধরে নির্ঘুম জীবন কাটিয়ে যাচ্ছে। কোন ধরনের চা, কফি ছাড়াই দিনের পর দিন তার এই নিদ্রাহীনতার মূল কারন মারাত্মক ধরনের ইনসোমেনিয়া (অনিদ্রা রোগ)। তবে সবথেকে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে। দিনের পর দিন এমন নিদ্রাহীনতার পরেও তিনি, শারীরিক এবং মানষিক ভাবে যথেষ্ট সুস্থ থেকে ভারী জিনিষ পত্র উত্তোলনের মত দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছে নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে।

  • স্টিফেন উইল্টশায়ার অসাধারণ চাক্ষুষ স্মরণশক্তি

পরীক্ষার আগে, রাতভর পড়ে যাওয়া পড়াই যেখানে আমাদের ভালো মত মনে থাকে না সেই জায়গায় একনজর কোন বস্তুকে দেখে তার ছবি হুবহু একে ফেলা নিশ্চয় সহজ কোন কাজ না। আর এই অসাধ্যকে সহজেই সাধ্য করে তুলেছে, ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ স্টিফেন উইল্টশায়ার। কোন কিছুকে এক পলক দেখে তার ছবি আকাতে সিদ্ধহস্ত এই ব্যক্তি। বলা হয়, তাঁর এই অসাধারণ ক্ষমতার পিছনে রয়েছে সাভান্ট সিনড্রোম (মহাপণ্ডিতীয় উপসর্গ), যা তাঁর মধ্যে এই বিস্ময়কর স্মরণশক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছে।

  • রাথাকৃষ্ণান ভেলু শক্তিশালী দাঁতবিশিষ্ট মানুষ

আচ্ছা কখনো কি ভেবেছি দাঁত দিয়ে ট্রেন টানা যাবে কিনা!

অবশ্যই অসম্ভব। কিন্তু ভারতের রাথাকৃষ্ণান ভেলু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। ২৬০.৮ টন বা ৫৭৪,৯৬৪ পাউন্ডের ট্রেনকে তিনি দাঁতের সাহায্যে ৪.২ মিটার (১৩ফিট ৯ ইঞ্চি) টেনে নিয়ে যান। তাঁর এই অসাধারণ ক্ষমতার জন্য গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে তাঁর নাম উঠেছে। তাঁর এই কীর্তি দেখে আবার নিজের দাঁত দিয়ে এমন কিছু না করাটাই ভালো। কাজের কাজ কিছুই হবে না শুধু দাঁত মেরামতের ডাক্তারি খরচটাই যাবে

  • উইম হফ ঠাণ্ডাকে যিনি করেছেন জয়

তীব্র শীতের দিন কিংবা কাঠ ফাটা রোদের দিনগুলোতে আমাদের দেহে ঠান্ডা গরমের অনুভূতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। কিন্তু কেউ যদি এই তাপের অনুভূতির ঊর্ধ্বে চলে যায় তবে তা কি অবাক করার মত বিষয় নয়। হ্যাঁ, এই অবাক করার মত ব্যাপারটিই ঘটিয়েছেন উইম হফ।

তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছেন যাতে ঠাণ্ডা গরমের অনুভূতির উর্ধ্বে যেতে পারেন। আধ্যাত্মিক এবং সাদৃশ্যবিধানকারী এই ব্যক্তি, তার অনুসারীদের নিয়ে ইতস্তত ভ্রমন করে থাকেন, যেখানে তাদের মূল উদ্দেশ্যই থাকে শরীরকে তাপীয় অনুভূতির উর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া।

  • বেন আন্ডারউড ব্যাটম্যান

কমিকসের পাতায় সপ্রতিভ একটি চরিত্র ব্যাটম্যান। কিন্তু বাস্তব জীবনে ব্যাটম্যানের আদর্শ উদাহরণ বেন আন্ডারউড। খুব ছোটবেলায় বাইলেটারেল রেটিনোব্লাস্টোমা নামক এক ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি তার দুই চোখের দৃষ্টি হারান। এরপর থেকে তার মা লক্ষ্য করেন, তিনি শুধু ‘ক্লিক’ শব্দ করছেন।

দৃষ্টি শক্তি হারানোর পূর্বে তিনি যে সকল কাজে নিয়োজিত ছিলেন যেমন ভিডিও গেইম চালানো, স্কেটিং,অশ্বচালনাসহ প্রভৃতি কাজ খুবই সাবলীল ভাবে করে যাচ্ছেন, যাতে করে মনেই হয় না যে তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে,শব্দের প্রতিধ্বনিকে কাজে লাগিয়ে তিনি অন্ধকারেও সঠিক ভাবে দিক নির্ণয় করে যা কিনা বাদুড়েরা করে থাকে কোন অন্ধকার গুহায় চলাচলের জন্য।

  • মাইকেল লোটিটো সর্বভুক মানব

আমাদের সামনে কোন ব্যাক্তি যদি রাবার, লোহার মত জিনিসপাতি খাওয়া শুরু করে তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে??

হয়ত ভাবছেন কি না কি আজগুবি কথা বলছি। না,ব্যাপারটা একদম ডাহা সত্যি। ফ্রান্সের বিনোদন জগতের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি মাইকেল লোটিটো এই কাজে খুব প্রসিদ্ধ। লোহা, কাঁচ, রাবার কোন কিছুই তার খাদ্যতালিকায় বাদ পরেনি। তবে তিনি সব থেকে বেশি প্রসিদ্ধ হয়েছিলেন আস্ত প্লেনের অংশ খেয়ে। এই সর্বভুক মানবকে কোন দুর্বৃত্ত খুন করতে এলে, দেখা যাবে তিনি সেই দুর্বৃত্তকেও খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছেন।

  • কেভিন রিচার্ডসন সিংহমানব

দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দা, কেভিন রিচার্ডসন পেশায় একজন চিড়িয়াখানা রক্ষক এবং বন্য প্রাণিদের আচরণবিদ হিসেবে কাজ করেন।বন্যপ্রানীদের সাথে তার সখ্যতা এবং ভয়ডরবিহীনভাবে তাদের নিকটবর্তী হওয়া আসলেই নজরকারার মত। সিংহ, বাঘ, হায়েনার মত হিংস্র প্রাণিদের সাথে তার শত শত ঘনিষ্ঠ ছবিতে ইন্টারনেট দুনিয়া ভরপুর। বন্য প্রানীর সাথে তার এই অসাধারণ সম্পর্ক প্রমাণ করে, বন্ধুসুলভ সখ্যতা হিংস্রতাকেও কোমল করে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।