ব্রাজিলিয়ানরাই বিশ্বের সেরা ফুটবলার: পেলে

শিশু বয়সে যখন কেউ মানুষ তাঁকে ‘পেলে’ ডাকতো, খুব রাগ হত। মাসের পর মাস এই নামের জন্য কেঁদেওছিলেন এডসন আরানতেস দো নাসিমেন্তো। বাবা বিখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস আলা এডিসনের নামের সাথে মিল রেখে নামটা দিয়েছিলেন। নামটা খুব গর্বের সাথে ধারণ করতেন পেলে। তাই, অন্য নামে কেউ ডাকলেই বেঁকে বসতেন।

তখনও বুঝতেও পারেননি যে, একটা সময় এই ‘পেলে’ শব্দটাই হবে ফুটবল গ্রেটনেসের অপর নাম। চারটা বিশ্বকাপ খেলেছেন, এর মধ্যে জিতেছেন তিনটি। তিনি হলেন ফুটবলের প্রথম সুপার স্টার, সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন।

বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন ফিফা.কমের। স্মৃতিচারণা করেছেন নিজের সময়ের। একই সাথে এবারের বিশ্বকাপে নেইমার-জেসাসদের ব্রাজিল দল ও অন্যান্যদের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।

এই ৭৭ বছর বয়সেও আপনার নামটা বিশ্বকাপেরই যেন সমার্থক…

–  ঠিক তাই। আমার বিশ্বকাপ নিয়ে অসংখ্য গল্প বলার আছে। সব কিছু আমার মন মত হয়নি, তবে আমি শীর্ষেই ছিলাম। ১৯৫৮ সালে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম একজন কিশোর হিসেবে, কেউ ভাবেনি আমরা জিতে যাবো। কোচ ভিসেন্তে ফিওলাকে লোকে জিজ্ঞেস করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল যে, কি করে তুমি এক ১৭ বছরের ছোকড়াকে দিয়ে বিশ্বকাপ জিতে ফিরলে! এরপর আসলো ১৯৬২, দলটা তখন দারুণ শেপে আছে। আমার ইনজুরি হয়ে গেল। তারপরও আমরা জিতলাম। এরপর ইংল্যান্ডে আবারো ইনজুরি, এবার আর আমরা পারলাম না। ১৯৭০ সালে গিয়ে আমি সবগুলো ম্যাচ খেললাম, আবারো বিশ্বকাপ জিতলাম। চক্রটা পূরণ করলাম। শুরুর মত শেষটাও হল চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই।

১৯৫৮ সালের ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে আপনার ডিফেন্ডারের হাতের ওপর দিয়ে ফ্লিক করে কিংবদন্তিতুল্য এক গোল করেন। কি করে করেছিলেন?

– যদি বলি ওটা পরিকল্পনামাফিক ছিল, তাহলে মিথ্যা বলা হয়। তবে, ওটা স্বতস্ফুর্ত একটা মুহূর্ত ছিল। আমাকে খুব দ্রুত কিছু একটা করতে হত। চাইলে, বুক দিয়ে আগে বলের কনট্রোল নিয়ে শট নেওয়া যেত, কিন্তু তাতে অনেক সময় ব্যয় হত। আমাকে যে করেই হোক ওই ডিফেন্ডারকে এড়াতে হত। ওই সময় ঐশ্বরিক কিছু ঘটেছিল। ভাবার কোনো সময় ছিল না।

৫০ থেকে ৭০-এর দশকে ব্রাজিলের দলগুলো দারুণ ছিল। কি ওই সময় মনে করতেন যে আপনারাই সেরা?

– ওটা ব্রাজিলের জন্য দারুণ একটা সময় ছিল। গারিঞ্চা, দিদি, জিতোরা ছিলেন। এমন একটা সময় ছিল, যখন আমরা খুব গোছানো ফুটবল খেলতাম। আমার মনে আছে, ‘ভিসেন্তে ফিওলা বলতেন, আমি জানি আমি কি নিয়ে কথা বলছি, আমি তোমাদের চেয়ে বড়, আমি কোচ। একটা ব্যাপারে নিশ্চিত থাকো যে, তোমরাই বিশ্বের সেরা দল। তবে, তোমাদের প্রতিপক্ষকে শ্রদ্ধা করা শিখতে হবে। কখনোই ভাববে না যে, তোমরা জিতে গেছো।’ কোচের এই কথাগুলো আমরাও মানতাম।

এবারে আসরটা রাশিয়ায়। ব্রাজিলের সুযোগ কতটুকু?

– ব্রাজিল সব সময় বিশ্বকাপ জয়ের জন্য যোগ্য দল। গত বেশ কয়েকটা টুর্নামেন্ট সেটা হয়নি, কারণ আমরা প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য খুব কম সময় পাই। খেলোয়াড়দের বড় একটা অংশ দেশের বাইরে খেলে। আমাদের সময় এই ব্যাপারটা আজকের দিনের মত ছিল না। আমরা অনেক সময় পেতাম। এখনকার কোচদের জন্য তাই দল গড়া খুব কঠিন। সময় বদলেছে। তবে, আমার ব্যক্তিগত মত হল, ব্রাজিলিয়ানরাই বিশ্বের সেরা ফুটবলার।

তাঁরা কি এবার ফেবারিটের তালিকায় থাকবে?

– অবশ্যই, ব্রাজিল সব সময়ই ফেবারিট। যথাযথ ভাবে প্রস্তুত হতে পারলে বিশ্বকাপ জয়ের সব যোগ্যতাই ওদের আছে।

ব্রাজিল ছাড়া আর কেউ কি থাকবে এই ফেবারিটের তালিকায়?

– জার্মানিকে সব সময় প্রতিপক্ষ হিসেবে শ্রদ্ধা করতে হবে। এমনকি রাশিয়াকেও, যাদের দেশে খেলা তাঁরা বাড়তি সুবিধা পাবেই। লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনা দলটাকে চোখে রাখতে হবে।

নেইমার কি ব্রাজিলকে চূড়ায় নিয়ে যেতে পারবেন?

– ক্লাব ফুটবলে নেইমার যেভাবে খেলে জাতীয় দলে সেই ধরণটা পাল্টে ফেলেছে। ওর এটা করতেই হত। ক্লাবে ও বাঁ-দিকে খেলে। জাতীয় দলে খেলে সেন্ট্রালে, ট্র্যাডিশনাল নম্বর টেনের মত। এটা শক্ত, কিন্তু ও খেলাটা আয়ত্ব করে ফেলেছে। আপনি যদি গোটা বিশ্বে দেখেন, তাহলে এমন খেলোয়াড় আছেন কেবল লিওনেল মেসি আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এর বাইরে আর কোনো সুপারস্টার নেই। জাতীয় দলে সবাইকে খুব একতাবদ্ধ থাকতে হয়, কারণ এখানে একজনের পজিশনে খেলার জন্য তিন-চারজন খেলোয়াড় নেই। একই কথা জার্মানির ক্ষেত্রেও সত্য। এখানে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স তাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন অবশ্যই আগের চেয়ে বিষয়গুলো কিছুটা বদলেছে, কিন্তু মূল ব্যাপারটা একই আছে।

আপনি কি মনে করেন যে, নেইমার দলে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত?

– হ্যা, ও তৈরি।  ও হয়তো ক্লাব ফুটবলে ট্যাকটিক্যালি ভিন্ন ভাবে খেলে। হয়তো, ও সদ্যই ক্লাব ছেড়ে অন্যত্র গেছে, তবে এটাই সত্যি যে নেইমারই ব্রাজিলের মূল খেলোয়াড়। ওকে সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে হবে। আমি একটু বাড়িয়ে বলবো, টেকনিক্যালি ও এখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়, আর এই ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।