পি মাক: যত বিপত্তি, ততই ভালবাসার বিস্তার

প্রেমের কোন জাত নেই, প্রেমের কোন বয়স নেই, প্রেমের কোন সীমারেখা নেই। প্রেমের আরেক নাম পাগলামি। এসব জানা কথা। প্রেমে কোন ভয় নেই। তবে প্রচুর বাঁধা আছে। সমাজ, সংস্কৃতি, বাস্তবতা, প্রকৃতি! বাঁধার উপাদানের অভাব নেই।

আবার এও জানি, যেখানে যত বিপত্তি সেখানে ভালবাসার তত বিস্তার। ‘পি মাক’ এমনই এক ছবি- উপলব্ধি করাবে ভয়, আনন্দ, প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি, অনন্তকাল তার সঙ্গে কাটানোর তীব্র আকাঙ্খা।

মাক, টার, শিন, ইয়ে, পুয়াক। পাঁচ বন্ধু। যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ হারাতে বসে পাঁচজনই। মাক ছাড়া বাকীরা অবিবাহিত। মাক বাঁচতে চায়। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে ফেলে এসেছে, একনজর দেখার জন্যে হলেও তাকে বাঁচতে হবে। বাঁচবে যখন বন্ধুদের নিয়েই বাঁচবে।

বন্ধুদের সঙ্গে করে মাক ফিরে আসে নিজ গ্রামে, প্রেয়সীর কাছে। অপেক্ষার পালা ফুরলো! প্রতি রাতে নবজাতক শিশুকে নিয়ে পুকুর ঘাটে এসে স্বামী মাকের নাম ধরে স্ত্রীর ডাকে মিশে থাকে ভালবাসার চূড়ান্ত আবেগ। কিন্তু তাতে গ্রামবাসীর মনে সঞ্চার হয় ভয়ের, দরজায় খিল এঁটে থরথরিয়ে কাঁপতে থাকেন তারা। যেন কোন অশরীরীর অস্বাভাবিক ডাকে ভারী হচ্ছে বাতাস!

স্ত্রী নাককে ফিরে পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত মাক বন্ধুদের নিয়ে পরদিন হাটে গেলে সকলে তার সঙ্গে অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে। গ্রামের মানুষ তাকে এড়িয়ে যেতে থাকে! সেসব অগ্রাহ্য করে ওরা বাড়ি ফিরে এলেও কয়েকদিন পর বন্ধুদের নজরে আসে কোথাও একটা গণ্ডগোল আছে!

মাকের স্ত্রী নাক অসম্ভব সুন্দরী, তবুও তার হাসিতে কোন মায়া নেই। বরঞ্চ কেমন যেন খাপছাড়া! পুকুরের একপাড়ে পরিবারসহ মাক থাকে, অপর পাড়ের ঘরটায় থাকে ওরা চারজন। খেয়াল করে গভীর রাতে তাদের বাড়ির দিকে কে যেন জ্বলজ্বল চোখে পিটপিটিয়ে তাকিয়ে থাকে।

বন্ধুর স্ত্রীর খাবারের ডিশে শুকনো পাতা, কাঁচা পোকা আর নানান অসঙ্গতির ইঙ্গিতে ওরা বুঝতে পারে গ্রামবাসীর ভয়ের কারণ! নাক আর কেউ নয়, একটা ভূত! ভূতের সঙ্গেই আহ্লাদে সংসার করছে প্রিয় বন্ধু! যেভাবেই হোক রক্ষা করতে হবে তাঁকে।

মাককে বললে কেনভাবেই বিশ্বাস করে না এই কথা। তারপর শুরু হয় মিশন। সেই মিশন আপনাকে নিয়ে যাবে ভিন্নজগতে! ভয়ে প্রায় প্যান্ট ভিজে যাওয়ার অবস্থায়ও আপনি দম ফাটিয়ে হাসবেন। ভাবুন একবার! চার বন্ধুর কীর্তিকলাপে থ্রিলারের হালকা আবহ পাবেন, পাবেন দমফাটানো হাসির চমৎকার সংলাপ, ভয়, ভালবাসার উপঢৌকন!

ওরা যতবারই চেষ্টা করে মাককে বোঝাতে, এখান থেকে পালাতে ততবারই টের পায় নাক, ভেস্তে দেয় পরিকল্পনা। ভূত হলেও নাক সুন্দরী, তার প্রেমে হাবুডুবু খায় বন্ধুদের একজন! তান্ত্রিক বাবার কাছ থেকে মন্ত্রপড়া চাল এনে নাকের শরীরে ছিটানোর বেলায় টের পায় মাকও খানিক অন্যরকম আচরণ করছে! মাকের গায়ে চাল ছিটালে তার চিৎকারে ঘন অন্ধকার জঙ্গলে বাকীদের আত্নারাম খাঁচাছাড়া!

তবে কী নাক নয়, আসল ভূত মাক? কোনমতে নৌকা নিয়ে পালাতে গিয়ে ফের টের পায় ভূত তো সর্ষের মধ্যেই! স্বামী স্ত্রী দুইজনের বাইরেও ভূত আরেকজন আছে বন্ধুমহলেই! গল্প মোড় নেয় অন্যদিকে.!

হরর, কমেডি, রোমান্টিক জনরার থাই এই মুভির গল্প থাইল্যান্ডের উপকথা থেকে নেওয়া। সিনেমার গল্প বলার ধরণ, কস্টিউম, লোকেশনে তাই আপনি পুরনো আমেজ পাবেন। এখনকার সময়ে কমেডি মানে বেশিরভাগই ভাঁড়ামি, সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর চেষ্টা। পি মাকে আপনি উল্টো সুড়সুড়ি দেয়া থেকে বিরত রাখবেন নিজেকে।

এমনিতেই হাসতে হাসতে দম ফাটবে। পি মাক চরিত্রে অভিনয় করেছেন মারিও ম্যোরের, নাক চরিত্রে দেভিকা হর্ণ। দুইজনই থাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চেনামুখ। অভিনয়ও করেছেন অসাধারণ। পর্দায় দুজনের রসায়নে মিষ্টি এক প্রেমের গল্পে মজে যাবে দর্শক। ভালবাসার কাছে যে আসলে দুনিয়ার বাদবাকী সব তুচ্ছ ওরা তা উপলব্ধি করাবে।

ঠোঁটের কোণে হাসি আনাবে, চোখ ভেজাবে জলে। সিনেমার প্রাণ বলা চলে বাকী চার বন্ধুকেও। প্রত্যেকের অভিনয়, এক্সপ্রেশনে ১ ঘন্টা ৫৫ মিনিটের সিনেমায় চোখ আটকে থাকতে বাধ্য। আর এদের দিয়ে দর্শককে অন্যরকম অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়ায় ধন্যবাদ প্রাপ্য পরিচালক ব্যাঞ্জং পিচানথানাকুনের।

২০১৩ সালের ২৮ মার্চ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটির বাজেট ছিল ১.৮ মিলিয়ন, আয় ৩৩ মিলিয়ন। এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ডের ফিল্ম ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমা এটি। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, লাওস, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশেই মুক্তি দেওয়া হয় সিনেমাটি। প্রদর্শিত হয় আমেরিকাতেও। স্বভাবতই অসংখ্য পুরস্কার ঝুলিতে পুরেছে পি মাক।

বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও ছোটবড় সকল অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানেই ২০১৩/১৪ সালে পুরস্কার বাগিয়ে এনেছে সিনেমাটি। ২০১৩ এর সেরা অভিনেতা অভিনেত্রী, সেরা পরিচালক, সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পার্শ্বঅভিনেতাসহ সিনেমাটোগ্রাফি, মিউজিক, মেকআপ এসবের জন্যেও প্রত্যেকেই পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। থাইল্যান্ডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনবদ্য সৃষ্টি নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করবে যেকোন সিনেমাপ্রেমীকে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।