সেই হাসিমুখ আর ফিরবে না!

ব্রায়ান ও’কনর – নামটা বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে ‘ফার্স্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’ ফ্র্যাঞ্চাইজির হাসিমাখা একটি চরিত্রের মুখ। ১৯৭৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার গ্ল্যান্ডেল শহরে জন্মানো এই অভিনেতার পুরো নাম ছিল পল উইলিয়াম ওয়াকার ফোর্থ। পল উইলিয়াম ওয়াকার ছিল তাদের পারিবারিক নাম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে ওয়াকার ছিলেন বড়। তার মা ছিলেন একজন ফ্যাশন মডেল এবং বাবা ছিলেন একজন বক্সার ও সুয়ারার কনট্রাক্টর।

মাত্র ২ বছরে বয়সে প্যাম্পারের বিজ্ঞাপনে প্রথমে ক্যামেরার সামনে আসেন শিশু পল। বড় হবার পর তিনি বিভিন্ন টিভি সিরিজে কাজ করেন। এর মধ্যে ‘চার্লস ইজ চার্জ’, ‘হু’স দ্য বস’, ‘দ্য ইয়াং অ্যান্ড দ্য রেস্টলেস’ সহ আরো কিছু সিরিজের কথাই বলা যায়। কলেজ পাস করার পর সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান নিয়ে ছিল তাঁর আগ্রহ। কিন্তু একটা সময় বুঝতে পারেন, তার ডেডিকেশন আর চেষ্টা চলচ্চিত্র জগতকেই টানছে বেশী। ১৯৮৬ সালে হরর/ কমেডি চলচ্চিত্র মনস্টার ইন দি ক্লোজেট এবং থ্রব টিভি ধারাবাহিক দিয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিনয়জীবনের যাত্রা শুরু।

এরপর বেশকিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ১৯৯৯ সালে অভিনীত ‘ভার্সিটি ব্লুস’, ‘শি’জ অল দ্যাট’ এবং ২০০০ সালে অভিনীত ‘দ্য স্কালস’ ছবিগুলো তাঁকে দর্শকের সামনে পরিচিত করায়। আর তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন ২০০১ সাল থেকে শুরু হওয়া ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস মুভি সিরিজে। প্রথম কিস্তি ‘দ্য ফাস্ট অ্যান্ড দ্য ফিউরিয়াস’-এ আন্ডারকভার কপ ব্রায়ান ও’কনর চরিত্রে ভিন ডিজেলের সাথে অভিনয় শুরু করা এই ছবিটি এতোটাই জনপ্রিয় হয় যে, ২০০৩ সালেই বেরোয় এর দ্বিতীয় পর্ব ‘টু ফাস্ট টু ফিউরিয়াস’।

এই চলচ্চিত্রের অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ‘টিন চয়েস অ্যাওয়ার্ড’ পান। এ ছাড়া তিনি জো রাইড, ইনটু দি ব্লু এবং টাইম লাইন ছাড়াও আরও কয়েকটি ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। এরমধ্যে ২০০৬ সালে ক্লিন্ট ইস্টউডের ফ্ল্যাগস অফ আওয়ার ফাদার ছিল বেশ আলোচিত।

বেশ কয়েকটি ফ্লপের পর ২০০৯ সালে তিনি আবার সিরিজের তৃতীয় মুভি ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস এর মাধ্যমে সদর্পে ব্যাক করেন আবার। এরপর ২০১১ সালে পঞ্চম মুভি ‘ফাস্ট ফাইভ’ এবং ২০১৩ সালে ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সিক্স’-এ অভিনয় করে নিজেকে রীতিমত কিংবদন্তী এক স্থানে নিয়ে যান ওয়াকার। ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস মানেই যেন তার সাথে ভিন ডিজেলের কেমিস্ট্রি বোঝাত। এমনকি ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সেভেন’ ছবির কাজও এগিয়ে চলছিল পুরোদমে। কিন্তু বিধাতার হিসেবটা ছিল একটু আলাদা।

২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর টাইফুন হাইয়ানের শিকার মানুষদের জন্য গঠিত চ্যারিটি থেকে ফেরার সময় ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যালেন্সিয়ায় তিনি এবং তাঁর বন্ধু রজার রোডাস ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাদের গাড়িটি কেলি জনসন পার্কওয়ের কাছে হারকিউলিস স্ট্রিটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি কংক্রিটের ল্যাম্প পোস্ট আর দুটো গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে আগুন ধরে যায়। রোডাস অনেকগুলো আঘাতে এবং ওয়াকার আঘাত ও পুড়ে যাওয়ায় মারা যান। প্রচন্ড বিস্ফোরণে তাদের শরীর এমনভাবেই পুড়েছিল যে তাদের চেনার বা শনাক্ত করার কোন উপায় ছিল না।

পল ওয়াকারের মৃত্যু এক প্রচন্ড আঘাত হয়ে আসে সারা বিশ্বের দর্শক এবং ভক্তদের জন্য। তাদের গাড়িতে বা দেহে কোন অ্যালকোহল, ড্রাগ কিংবা উত্তেজক পানীয় পাওয়া যায়নি, তারা কোন ড্রাগ রেসে অংশ নেননি, গাড়িতে কোন মেকানিক্যাল ত্রুটি ছিল না। যে স্থানে অ্যাক্সিডেন্টটি হয়েছিল, সেই জায়গাটি কার ড্রিফটিং-এর জন্য কুখ্যাত ছিল। প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে আসে গাড়ির স্পিড প্রতি ঘন্টায় ৮০ (১৩০ কিলো) থেকে ৯৩ মাইল (১৫০ কিলো) ছিল এবং চাকাগুলো পুরোনো ছিল। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এক্সিডেন্টটি ঘটে।

তার মৃত্যুর ঠিক পরপরেই মুক্তি পায় হ্যারিকেন ক্যাটরিনার উপর নির্মিত মুভি ‘আওয়ার্স’। এছাড়াও‘পন শপ ক্রনিকলস’ আর ব্রিক মেনশনও মুক্তি পায় এরপর। ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস সেভেন শেষ করে যেতে পারেননি পল, তার হঠাৎ মৃত্যুতে মুভির কাজও থমকে যায়। পলের অংশের দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য প্রথমে তাঁর ছোট ভাই স্টান্টম্যান কডি ওয়াকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এরপর চারজন বডি ডাবলকে নিয়ে পলের বাকি কাজ শেষ করেন পরিচালক জেমস ওয়ান। তাঁদের দৈহিক গড়নের সঙ্গে পলের দৈহিক গড়নের অদ্ভুত মিল ছিল। ক্লোজআপ শটের ক্ষেত্রে দৃশ্য ধারণের পর সম্পাদনার সময় সিজিআই (কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারি) পদ্ধতিতে তাঁদের মুখের জায়গায় পলের মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়।

শুটিংয়ের সময় কডির পেছন দিক থেকে ক্যামেরা ধরা হয় এবং অনেক দূর থেকে দৃশ্য ধারণ করা হয় যাতে কডির চেহারা স্পষ্টভাবে বোঝা না যায়। এ প্রসঙ্গে জেমস বলেছিলেন, ‘ছবিটির কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কোনো রকম পরিকল্পনা আমাদের নেই। পলের মৃত্যুতে ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই প্রচণ্ড ভেঙে পড়লেও বুকে পাথর চেপে ছবিটির কাজ শেষ করবেন তাঁরা।’

মেরিন বায়োলজির উপর অসম্ভব আগ্রহ থাকায় ২০০৬ সালে পল বিলফিশ ফাউন্ডেশনের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে যোগ দেন। সেখান থেকেই তিনি তার আজন্ম সাধ পূরণ করেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের পক্ষ হতে “শার্ক মেন” নামে কয়েক পর্বের একটি ডকুমেন্টরী তৈরি করে। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ধারাবাহিকটি করতে গিয়ে টানা ১১ দিন ক্রু হিসেবে কাজ করেছেন, মেক্সিকো উপকূলে ধরেছেন সাতটি গ্রেইট হোয়াইট শার্ক।

জীবন থেকে হয়তো আর খুব বেশি কিছু পাওয়ার ছিল না গতির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এই তারকার! তাই তিনি একবার বলেছিলেন, ‘যদি কখনো গতির কারণে আমার মৃত্যু হয়, তাহলে কেঁদো না। কারণ আমি হাসিমুখেই মারা যাবো।’ কী আশ্চর্য, সত্যিই সেই গতিই তাকে এই দুনিয়া থেকে কেড়ে নিয়ে গেলো! তবে তিনি কি হাসতে হাসতে মারা গিয়েছিলেন সেদিন।

প্রশ্নটা তাঁর ভক্তদের তাড়া করে যাবে সবসময়ই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।