একই নামে ওরা কী বানায়, আর আমরা কী বানাই!

সিনেমা কি শুধুই বিনোদনের মাধ্যম? হ্যাঁ! না!

সিনেমা বিনোদন দেয়, তবে শুধু বিনোদন নয়! বিনোদন মানে তো আনন্দ। কিন্তু আশির দশকে রাজ্জাক অভিনীত ‘ছুটির ঘন্টা’ দেখে অশ্রুসজল হয়নি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না একজনও। তার মানে সিনেমা স্রেফ বিনোদনের মাধ্যম নয়, সিনেমা জীবনেরও অংশ।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিতাস একটি নদীর নাম, পদ্মা নদীর মাঝি, হাজার বছর ধরে, আগুনের পরশমণি, বাবা কেন চাকর এগুলো কেবল ছবির টাইটেল না, একেকটি দলিল। জীবনবোধ, দর্শনের অলিখিত দলিল। বাংলার মানুষ এমন বহু চলচ্চিত্র বহুবার করে দেখেছে, নিজেদের সেখানে খুঁজে পেত বলে।

এছাড়াও চলচ্চিত্র সমাজের আয়নাসম। সিনেমার বিষয়বস্তুর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠে সমাজব্যবস্থা, বর্তমানসহ নানাবিধ বিষয়াদি। এসবের দ্বারা প্রসারিত হয় জ্ঞানের পরিধি, তৈরি হয় সচেতনতা। যুগে যুগে তাই সময়োপযোগী বিষয়কে চিত্রনাট্য হিসেবে বেছে নিতে দ্বিতীয়বার ভাবেনি লেখক, পরিচালকেরা।

‘পাসওয়ার্ড’। শব্দটির সঙ্গে সকলে পরিচিত। পরিচিত বললে ভুল বলা হবে, বলা ভাল সকলে জড়িত। কেননা, প্রযুক্তির রমরমা যুগে সকলেরই রয়েছে এক একটা সোশ্যাল প্রোফাইল। সেই প্রোফাইলে আবার অসংখ্য জিনিস। ফেসবুক থেকে শুরু করে ই-মেইল, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট রাখার ড্রাইভ সবকিছুর নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন পাসওয়ার্ডের। আর পাসওয়ার্ড হ্যাক করার মাধ্যমে সূত্রপাত ঘটে সাইবার ক্রাইমের।

এই সাইবার ক্রাইমকে উপজীব্য করে হলিউডে বহু সিনেমা তৈরি হয়েছে, হয়েছে ভারতের বিভিন্ন ফিল্মপাড়ায়ও। কলকাতা বাংলায় গতবছর ডার্কওয়েব’ নামক ওয়েব সিরিজও বের হয়েছে এমন প্লটে। যদিও বড়পর্দায় বড়পরিসরে এর সাথে টালিগঞ্জের দর্শক তেমন পরিচিত নয়। এবার অতৃপ্তি ঘুচল। অক্টোবরের দুই তারিখ মুক্তি পায় দেব এর প্রযোজনা ও অভিনয়ে ‘পাসওয়ার্ড’ নামক মুভি। একদম বর্তমানকে চেপে ধরেই তৈরি সিনেমায় আরো অভিনয় করেছেন পরমব্রত, পাওলি দামের মতো পরীক্ষিত কলাকুশলী।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের ছবি ভারতে রপ্তানি হতো। আমাদের ছবির পুনঃনির্মাণ করত তারা। আমাদের অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে কাজ করাতো। সেসব এখন সোনালী অতীত। তারা এখন নিজেদের নিয়েই সমৃদ্ধ। রিমেক করে না যে তা নয়, তবে সেসব যথেষ্ট মানসম্পন্ন। সৃজিতের মাস্টারপিস ‘বাইশে শ্রাবণ’ও রিমেক।

আপনি টোটাল দাদাগিরি বা ভিলেনের মতো বস্তাপঁচা রিমেকের কথা বললেও তাদের অরিজিনাল কনটেন্টগুলি আবার ইদানিংকালে দারুণ হচ্ছে। যেখানে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। গেল ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় শাকিব খানের ‘পাসওয়ার্ড’। পাসওয়ার্ড নাম শুনলে যা যা চোখে ভাসে সেসবের ধারে কাছে ছিল না সেটি। দুটো মুভির জগাখিচুড়িতে তৈরি পাসওয়ার্ড এমনিতেই গুবলেট পাকানো, তার উপর যে দুটো মুভি থেকে মেরেছে সেগুলিও অত মানসম্মত ছিল না। আমাদের দেখার চোখটাই কি দিনদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কি না সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন!

দুই বাংলার সিনেমার একাল সেকাল নিয়ে লিখতে গেলে শেষ করা যাবে না। সিনেমা মানেই তো মস্তবড় প্ল্যাটফর্ম। প্রতিটি সিনেমা নতুন নতুন গল্পের জন্ম দেয়। কোনটায় জীবনঘনিষ্ঠ গল্প বিদ্যমান, কোনটায় দেখা মেলে চোখের সামনে অজান্তেই ঘটতে থাকা অপরাধের। দেব এর পাসওয়ার্ডের ট্রেলার দেখে যতটা বুঝা গেল, বলা যায় বেশ ভালভাবেই বোঝা গেল, সিনেমার কাহিনী ইন্টারনেটের অন্ধকার জগৎ কেন্দ্রিক।

প্রতি সেকেন্ডে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, ইন্টারনেট আসক্তি এসবকে অস্ত্র বানিয়ে ফায়দা লুটছে এক দল! হলফ করে বলতে পারি, এই পাসওয়ার্ড দেখে একটু হলেও নড়েচড়ে বসবেন, হাতের স্মার্টফোনটা নেড়ে দেখবেন। তারপর সতর্ক হবেন, সচেতন হবেন। ঠিক এইখানেই কাজের সার্থকতা।

এবার আসি আমাদের ‘সুপারস্টার’-এর পাসওয়ার্ডে। সিনেমার চমৎকার মার্কেটিং করেছেন শাকিব খান এবং পরিচালক মালেক আফসারী সাহেব। তাদের বড় বড় ফাঁকা বুলিগুলি কেউ ভুলে যায়নি। অথচ মুক্তির পর দেখা গেল তথৈবচ হাল! মানহীন আরো একটি কাজ উপহার দিলেন সুপারস্টার মহোদয়।

এখন আপনি বলতেই পারেন, বাজেট কই? শিল্পী কই? বিশ্বাস করেন সবই আছে। খালি চোখ নেই দেখার। নেই ডেডিকেশন, মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহ। তারা ছবি বানান নিজেদের জন্য। একটা সময় ওপার বাংলার দেবও অখাদ্য উপহার দিতেন। আবার শাকিব খানই করেছিলেন ‘শুভা’র মতো অনন্য ছবি।

আমাদের দেশেও ভালো ছবি হয়, তবে আজকাল সেটি হাতেগোনা। শাকিব খান বলতেন, হলে দর্শক রাখতে তিনি কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটিতে নজর দিতেন। এতেও কি হল বাঁচলো? কারণ, মানুষ এখন তফাৎ বোঝে ভালমন্দের। তাই, একদম নিঃশেষ হবার আগে জেগে উঠতে হবে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের। ফারুকী, অনিমেষ আইচ, তৌকির আহমেদরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আয়নাবাজি, অজ্ঞাতনাম, হালদা, থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার, দিয়েছেন।

সিনেমার চূড়ান্ত প্রসারের জন্য এই পথ ধরে আরো অসংখ্য ঢাকা অ্যাটাক, সাপলুডু, স্বপ্নজাল দিতে হবে। সব সিনেমা হিট খাবে তা নয়। কিন্তু লোকে যেন বলে- ব্যবসা করেনি তো কী হয়েছে, গল্প ভাল তো?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।