পাসওয়ার্ড: এলাম-দেখলাম-হাসলাম, ভুলে গেলাম কি দেখলাম!

পাসওয়ার্ড নিয়ে অনেক কথা বলার আছে। পাসওয়ার্ড এমন একটা চলচ্চিত্র যা আপনাকে ‘সস্তা বিনোদন’ দেবার অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়ে অপেক্ষা করছে। পাসওয়ার্ডকে দুইভাবে আলোচনা করবো।

  • একজন সাধারণ বাংলা সিনেমা দর্শক যেভাবে দেখতে পারে।
  • ক্লাস অডিয়েন্সের কাছে কেমন লাগতে পারে।

তো শুরু করা যাক পাসওয়ার্ডের পাশের আলোচনা।

অনেক দর্শক আছে যারা মূলত বিনোদন পাবার জন্য সিনেমা দেখেন। রাস্তার টং দোকানে যেকোন সিনেমা, ভিসিআর-এ কিংবা ডিশের লাইনে দেখে তারা বিনোদিত হন। তাদের জন্য পাসওয়ার্ড একটি উৎকৃষ্ট মানের বিনোদনের সিনেমা।

এ শ্রেণীর দর্শকদের নিকট ভিক্টর রূপী মিশা সওদাগরের চরিত্র এতো মজা লাগবে যে তারা হয়তো কয়েকদিন ওভাবেই মানুষের সাথে কথা বলবে, নেচে নেচে। কারণ তিনি নিজেকে ঠিক এখন ডিপজলের ‘হিসাব বোঝো নাই, দুদু খাও’ লেভেল নিয়ে গেছেন। শাকিব খানের গান দেখার পর তারা বলবে এটা আসলেই আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা, কারণ তাদের কাছে আলফ্রেড হিচকক, কোয়ান্টিন টারান্টিনো, কুব্রিক কিংবা কিম কি দুকের নাম এখনো পৌছায়নি।

তারা বড়জোর ‘জিসম টু’ কিংবা সালমান খানের ‘এক থা টাইগার’-এর নাম পর্যন্ত শুনেছে কিংবা বলিউড সিনেমা দেখেছে। তাঁদের কাছে ‘নাম শাবানা’ এখনো একটা বোরিং ধাচের সিনেমা। এখানে ‘আগুন জ্বালাইলো’র বুলবি হয়ে থাকবে গরিবের ক্যাটরিনা কাইফ। কি হবে কি হবে!

এই চিন্তা কাহিনীকার হয়তো তাদের মধ্যে ঢুকাতে পারবেন। এসব দর্শকের কথা চিন্তা করলে পাসওয়ার্ড আসলেই ইন্টারন্যাশনাল সিনেমা হয়ে যাবে। দু একটা ড্রোন শর্ট আর বিদেশী গানের লোকেশন দেখে মাস্ট শিস দিবে। শাকিব খানের লুক দেখে স্ট্যাইল করবে হয়তো কেউ কেউ। যদি আপনি সেই ক্যাটেগরির দর্শক হয়ে থাকেন তাহলে পাসওয়ার্ড আপনার জন্য একটা দারুণ থ্রিলার সিনেমা।

এবার আসি আমাদের মত যারা একটু শিক্ষিত, যাদের কাছে সিনেমাটা শুধুই বিনোদনের নয়, সিনেমাকে যারা শিল্প হিসাবে বিবেচনা করে, তাদের কাছে পাসওয়ার্ড একটা আক্ষেপের নাম। শাকিব খান, প্রেজেন্টলি দ্য বিগ নেম ইন ঢালিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। ২০ বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করে চলেছেন কিন্তু তার ভালোর থেকে সমালোচিত কাজের পরিমাণ এতো বেশি যে সেটা নিয়ে রীতিমত গবেষণা করা যাবে!

পাসওয়ার্ড এর কাহিনী শুরু হয় পেটে গুলি নিয়ে অন্ধকারে শাকিবের দৌড়ে পালানোর মধ্য দিয়ে। দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি মাইক্রোর সাথে ধাক্কা খান, রাস্তায় শুয়ে পরে। তার একটা ভাই আছে, যার একটা রোগ আছে, রোগের নাম অটিজম।

কিছুক্ষণ পরপর সে ঘাড় কাত করে ‘অ্যা অ্যা অ্যা ভাই ভাই’ করে উঠে, আবার সে কিডন্যাপিং কিভাবে করে তা বুঝে। তো সে আবার ক্লাবে যায়, যেন তেন ক্লাব না বড়লোকদের ক্লাব। সেখানে গিয়ে একটা পেন ড্রাইভ পায়। মিশা সেই পেনড্রাইভ চায়, এই শুরু হল লুকোচুরি ছুপাছুপি খেলা। কে পাবে পেনড্রাইভ, দেখলে যাবে বোঝা।

যাই হোক নাই হোক, গল্প ছিল মোটামুটি কিন্তু প্রেজেন্টেশনে করেছে একদম বাড়াবাড়ি। সিনেমার প্রথম অর্ধ ছিল রীতিমত অত্যাচার। ভাঁড়ামো, আর সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানো আর প্রচুর পরিমান ভুলে ভরা দৃশ্য যেকোন বুঝবান দর্শক দেখলেই বুঝতে পারবেন।

কয়েকটার নমুনা দেওয়া যাক।

  • এইচএসসি, এসএসসি পরীক্ষায় এই যুগে একদম নেকাপ পড়ে মুখ ঢাকা ছবি দিয়ে এক্সাম দেওয়া যায় তা আসলে এই সিনেমা না দেখেল জানতে পারতাম না।
  • নিচ তলা থেকে উপরের সাত তলাতে পুলিশ যেতে লাগল পাক্কা ১০ মিনিটের মত। আর পুলিশ নিচে বসে বসে ক্যামেরাতে দেখছে কিভাবে মার দিচ্ছে। পুরো শিট একটা দৃশ্য।
  • নায়ক রাস্তায় গুতা খেয়ে অজ্ঞান পড়ে আছে। আবার সেই ন্যারেট করছে ‘আমার জীবন আগে কত ভালো ছিল’, বলেই হুট করে চলে গেলে গান গাইতে। গান থেকেই দেখি নায়কের ঘুম ভেঙে প্রসাব চেপেছে। গানের কি দরকার ছিল এখনো বুঝতে পারি নি।
  • দ্বিতীয়ার্ধ বুবলির মোবাইল ভিক্টর নিয়ে চলে যায় আবার বুবলিকে দেখা যায় মোবাইল নিয়ে,মোবাইল কোথা থেকে আসল?
  • দ্বিতীয়ার্ধ প্রথমার্ধের তুলনায় বেশ ভালো। ধরে নিলাম উপরের ভুলগুলো ভুল না। কারণ পরিচালক আলাদা একটা জগত তৈরি করেছেন এই সিনেমার জন্য। সেখানে তিনি হিচককের থিওরি অফ সাসপেন্স দিয়ে দর্শক এমনভাবে ধরে রেখেছেন কি বলব।

এবার আসি অভিনয়ের প্রসঙ্গে।

সবার আগে ইমনের ব্যাপারে। ফিফটি-ফিটটি টাইপ চরিত্র। তিনি যে মাথাটা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাকি দিচ্ছেন তা বোঝা যাচ্ছে। প্রথম অর্ধের ১৫-২০ মিনিট দেখে বোঝার কোন উপায় নেই তিনি কোন অটিস্টিক এর অভিনয় করছেন। দ্বিতীয়ার্ধে করেছেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতি অভিনয়। বারবার মনে হয়েছে তিনি ক্যারেক্টার থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।

শবনম ইয়াসমিন বুবলির অভিনয় নিয়ে বলার আগে একটা কথা বলি, প্লিজ ফিটনেসের দিকে নজর দিন। বুবলির অভিনয় থেকে নাচ এবং অ্যাকশন ক্যাপাবিলিটি বেশ দারুণ। অভিনয় টার দিকে মনোযোগ দিতে হবে প্রচুর।

মিশা সওদাগরকে আসলে একটা ভাড় বানানো হয়েছে এ চলচ্চিত্রে। মিশা সওদাগরের সাবলীল অভিনয়টা ঢাকা পরে যাচ্ছে। পরিচালক কিভাবে একটা কুল হেডেড ভিলেনের ক্যারেক্টারকের ভাড়ে পরিনত করতে পারেন তার ডিরেকশনের দক্ষতায় তা মিশা সওদাগরের চরিত্র দেখলে বুঝতে পারবেন। শেষ তিনমিনিট মিশা ন্যাচারাল অভিনয় করেছে ওই পার্ট বাদে তাকে পুরোপুরি ওয়েস্ট করেছে সিনেমাতে।

অমিত হাসান অভিনয় ভুলে গেছেন আর কিছু বলার নেই তাকে নিয়ে।

শাকিব খানকে সিনেমার ‘গোবরে পদ্মফুল’ বলা যায়। শাকিব খান অ্যকশনে, নাচে আসলেই দারুণ। তিনি যেদিন বুঝতে পারবেন তিনি আসলেই ভালো অভিনেতা, নায়ক নন সেদিনই তিনি তার ক্যারিয়ারকে একটা অন্য লেভেলে নিয়ে যাবেন।

সিনেমার গান, কোরিওগ্রাফি বেশ ভালো। এজন্য কোন কৃতিত্ব পরিচালকের নয়। সবই ড্যান্স ডিরেক্টরের কারসাজি। প্রথম অর্ধে অনেকটা স্বস্তি দিয়েছিল সিনেমার দুই গান।

পুরো সিনেমাটা মার খেয়েছে এর চিত্রনাট্যের জন্য, হুটহাট গানের জন্য। কতটা তাড়াহুড়ো করে সিনেমাটা বানিয়েছে তা বুঝার জন্য যথেষ্ট। মালেক আফসারির সব থেকে বাজে মেকিং ও বলা যায়। যথারীতি তিনি এটাও মেরে দিয়েছেন ফ্রেঞ্চ চলচ্চিত্র ‘পয়েন্ট ব্ল্যাংক’ থেকে। কিন্তু, এতো বাজেভাবে নকল তিনি এর আগে কখনো করেন নি। এর থেকে তার পরিচালিত ‘অন্তর জ্বালা’র মেকিং অনেক ভালো ছিল। তবে সিনেমাতে গগনচুম্বী উদরের দুলুনি দেখে আপনার হাসি আসবে, মন ভালো করবে।

যদি আপনি একটু হলেও সিনেমা বুঝেন আর শাকিব খানের ‘শিকারী’ কিংবা ‘নবাব’ কিংবা ‘ফুল এন্ড ফাইনাল’ দেখে ভেবে থাকেন সিনেমা দেখতে যাবেন তাহলে বলবো – আবার ভেবে দেখুন, হতাশ হতে পারেন। আর যদি সস্তা বিনোদনের জন্য, ভুড়ির দুলুনি ও ভাঁড়ামো পূর্ণ কমেডি সিনেমা দেখতে চান, তাহলে বলবো – ‘গো ফর ইট অ্যান্ড গ্রাব ইট’। তখন চিন্তা করবেন এলাম-দেখলাম-হাসলাম, ভুলে গেলাম কি দেখলাম!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।