পরিণীতা: ভালোবাসা এক অদ্ভুত ব্যাপার

– তুমি আমায় কোনোদিন ছেড়ে যাবে না তো, বাবাই দা?

– আমি কোথায় যাবো? ছেড়ে তো তুই চলে যাবি। দু’দিন বাদে বিয়ে করে চলে যাবি !

ভালোবাসা এক অদ্ভুত ব্যাপার। যখন তাঁকে খুব করে কাছে পেতে ইচ্ছে হয়, তখন সে ছেড়ে চলে যায়। আর যখন সে-ই ভালোবাসাই কাছে ডাকে, তখন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় অভিমানের দেয়াল। একটা সময় সেই ভালোবাসাই হয়ে যায় না হওয়া সংসার।

ছবির নাম ২০১৯ সালের ‘পরিণীতা’। রোম্যান্স ও ড্রামা জনরার ছবি।

পাড়ার ডানপিটে কিশোরী মেহুলের দিন কাটে দুই কাছের বান্ধবীর সাথে দুরন্তপনা করে। গোটা পাড়া মাতিয়ে রাখলেও একজনের কাছে তার দুষ্টুমি পাত্তা পায় না। সে তার শিক্ষক, মেন্টর, ভালোবাসার মানুষ, বাবাই দা। বাবাই দা’র শাসন, আদর, স্নেহ- সবই তার আকর্ষণের মাত্রা দিন দিন বাড়িয়ে তোলে। অবশ্য, তার বয়স অনুযায়ী অতিরিক্ত আহ্লাদীপনা’র কারণে কারও কাছে সেটা প্রকাশ পায় না।

বাবা-মা-ভাই-বন্ধু -বাবাইদা’কে নিয়ে মেহুলের দিন বেশ ভালোই কাটলেও একদিন সত্য সামনে আসে। মেহুল বুঝতে পারে কত বড় ভুলের মাঝে সে ছিল। একই সাথে বজ্রপাতের মতো বাবাইয়ের মৃত্যু সংবাদ তাকে বানিয়ে দেয় পাথরের প্রতিমা। মৃত্যুর পূর্বে বাবাই মেহুলকে একটা চিঠি দেয় যেটা পাল্টে দেয় মেহুলের জীবন। কি ছিল সেই চিঠিতে? জানতে হলে দেখে ফেলুন।

বর্তমানে ঋত্বিক চক্রবর্তী’র ক্যারিয়ারে ভরা বসন্ত। টালিপাড়ার হিট মেশিন বলা যায় তাঁকে। ঋত্বিক থাকলে ছবিতে অতিরিক্ত একটা ভাইব যোগ হয়, সেটা বলাই বাহুল্য। ভিঞ্চি দা, জ্যোষ্ঠপুত্র, পরিণীতা, টেকো – ঋত্বিকের সাফল্যরথ চলছেই। তার অভিনয়ের এক্স ফ্যাক্টর তার অসাধারণ ন্যাচারালিটি। ওর মতো ন্যাচারাল অভিনয় সবার পক্ষে করা সম্ভব না, এটা ওর সহকর্মীদেরই স্বীকারোক্তি। আমি আগে কখনো ঋত্বিকের কণ্ঠে আবৃত্তি শুনিনি। এই ছবির কল্যাণে সেটা হয়ে গেলো। সবমিলিয়ে দারুণ কাজ করেছেন।

কমার্শিয়াল ছবির শো-পিস হিসেবে অনেকগুলো বছর কাটানো শুভশ্রী’র অসাধারণ ট্রান্সফর্মেশন এই ছবিতে। টিনএজ বয়সের চরিত্রে অভিনয় বেশ চ্যালেঞ্জিং কারণ এখানে ছোট ছোট অনেক ডিটেইল থাকে যেগুলো মিস করলে চরিত্রের আবেদনটাই কমে যায়। বলতে হবে এক্ষেত্রে লেটার মার্কসে উত্তীর্ণ শুভশ্রী। তার হাসি, কথা বলার ধরণ, চোখের ভাষা, ডায়ালগ ডেলিভারি – বলতেই হবে রাজ বউয়ের থেকে বেস্ট আউটপুটটাই নিশ্চিত করেছে।

‘ফটোকপি মেশিন’ খ্যাত রাজ চক্রবর্তী ‘প্রলয়’ ও ‘চ্যাম্প’-এর পর আবারও মৌলিক গল্পের ফ্রেশ উপস্থাপনে হাজির করেছে ‘পরিণীতা’কে। রাজ মেধাবী পরিচালক, সন্দেহ নেই। বছরের পর বছর ধরে নিজের প্রতিভা ‘রিমেক’ নামক ডাস্টবিনে নষ্ট করার পর মৌলিক গল্পের প্রোজেক্টগুলো তাঁকে প্রশংসিত করছে। তার রিমেক প্রজেক্টগুলো বক্স অফিস কাঁপিয়েছে। তবে কলকাতার দর্শকদের পরিবর্তিত চাহিদা বুঝে সে অনুযায়ী নিজেকে পাল্টে ফেলাটা ভালো লেগেছে। শিবপ্রসাদের পথ অনুসরণ করলে সাফল্য আরও বাড়বে।

‘ফেলুদা’ খ্যাত সব্যসাচী চক্রবর্তী’র বড় ছেলে গৌরব চক্রবর্তীর পারফরম্যান্সও দারুণ। বাবার ছায়াতল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন অনেকটাই। টেলিভিশনে ‘ব্যোমকেশ’ হিসেবে তার কাজ প্রশংসিত হয়েছে। মা টিভি সিরিয়ালের নিয়মিত মুখ। তার ছোট ভাইকে চিনেন তো? ব্যোমকেশ গোত্রের সেই লেডি কিলার চরিত্রহীন ব্যক্তি, ‘সত্যকাম’।

চলচ্চিত্রে নতুন হিসেবে ফালাক, আদ্রিজা – ভালো কাজ করেছে। আদ্রিজা রাজেরই প্রোডাকশনের সিরিয়াল থেকে উঠে আসা মুখ। ‘নুরজাহান’ ও ‘প্রেম আমার ২’ এর মতো একঘেয়ে কাহিনীর ডাহা ফ্লপ প্রজেক্টের পর ‘পাসওয়ার্ড’ ও ‘পরিণীতা’ দিয়ে আদৃত নিজেকে ভেঙ্গেছে, এজন্য তার প্রশংসা প্রাপ্য।

শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠ আপনাকে মোহিত করবে নির্ঘাত। অর্ক’র কম্পোজিশন চমৎকার।

শেষ করছি ছবি থেকে নেওয়া জীবনানন্দের দু’লাইন দিয়ে –

হাজার বছর শুধু খেলা অন্ধকারে করে জোনাকির মতো

বালির উপরে জ্যোৎস্না — দেবদারু ছায়া ইতস্তত

বিচূর্ণ থামের মতো — দ্বারকার; দাঁড়ায়ে রয়েছে নত, ম্লান।

শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ আমাদের ঘুচে — গেছে জীবনের সব লেনদেন;

‘মনে আছে?’ শুধালো সে — শুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।