তেজা, বাবু রাও কিংবা ব্যাংকার থেকে লাল গালিচায় আসা একজন পরেশ রাওয়াল!

যতগুলো চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, তার প্রত্যেকটিই যেন একেকটা মাইলফলক।  কখনো তিনি চরিত্রাভিনেতা বনেছেন, কখনো হয়েছেন ভিলেন, কিংবা কমেডিয়ান – তিনি যাই করেন না কেন মনে হয় যেন চরিত্রটা অন্য কাউকে দিয়ে হত না। বলিউডের ইতিহাসে তাঁর মত সব্যসাচী অভিনেতা এসেছেন অনেক, কিন্তু লম্বা সময় আধিপত্ত ধরে রেখে একাধারে বানিজ্যিক ও বিকল্পধারার সিনেমায় অভিনয় করে যাওয়ার নজীরটা ‍খুবই বিরল।

তিনি হলেন পরেশ রাওয়াল। তার প্রসঙ্গে কম বেশি সবারই জানা। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে শুরু করেছিলেন, কালক্রমে বড় ভিলেন হয়েছেন, সেখান থেকে কমেডি চরিত্র করেছেন, সুনাম কুড়িয়েছেন। ক্যারিয়ারে কোনো অপ্রাপ্তি তাঁর নেই বললেই চলে। আমরা বরং একটা অজানা অধ্যায় দিয়ে পরেশ-গাঁথা শুরু করি।

পরেশের জীবনের লাভ স্টোরিটা খুবই সিনেম্যাটিক। স্বরুপ সম্পাতের প্রেমে পড়েছিলেন ১৯৭৫ সালে। একদম প্রথম দেখায় প্রেম। এরপর তাদের রোম্যান্স চলে দীর্ঘ ১২ বছর। এরপর আসে সম্পর্কের পরিণতি। মানে বিয়ে করেন এই যুগল।

এই সময়ে মাঝে অবশ্য জীবনে অনেক উত্থান এসেছে তাদের। স্বরুপ ১৯৭৯ সালে মিস ইন্ডিয়া খেতাব জিতে যান। তখন তিনি এক গাদা টেলিভিশন সিরিজের প্রস্তাব পেতে শুরু করেন। ‘ইয়েহ জো হ্যায় জিন্দেগি’ নামের আশির দশকের জনপ্রিয় এক সিরিজে অভিনয় করেছিলেন শফি ইমামদারের স্ত্রীর চরিত্রে।

মজার ব্যাপার হল, শফির চরিত্রটির জন্য প্রথমে নাকি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল পরেশকেই। যদিও, তিনি সেটা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, পরেশের বরাবরই স্বপ্ন ছিল বড় পর্দা।

মুম্বাইয়ের এক গুজরাটি পরিবারের ছেলে পরেশ নার্সি মানজি কলেজে পড়াশোনা করেন। ওই জমানা থেকেই তিনি ছিলেন থিয়েটারের পোকা। থিয়েটার গুলে খেতেন। ভাইদাস অডিটোরিয়ামের নিয়মিত মুখ ছিলেন তিনি। পাশাপাশি ব্যাংক অব বারোদায় চাকরিও করতেন।

যদিও, সিনেমায় রোল পাওয়ার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাকে। বলা হয়, অপেক্ষার ফল নাকি মধুর হয়। পরেশের জীবনেও তাই হয়েছিল।  ১৯৮৪ সালে, ‘হিফাজত’, ‘দুশমন কা দুশমন’ বা কেতন মেহতার ‘হোলি’-তে ছোট খাটো চরিত্র করেন। এর পরের বছর তিনি ‘অর্জুন’-এ ‘আন্নু ভাই’ চরিত্রটি করেন। বড় রোল পাওয়ার পর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

আশি ও নব্বইয়ের দশক জুড়ে প্রায় শতাধিক ছবিতে পরেশ রাওয়াল টানা ভিলেনের চরিত্র করে গেছেন। কমিকের ছোঁয়া তিনি পান ১৯৯৪ সালে এসে। আন্দাজ আপনা আপনা (১৯৯৪) ছবিতে এসে তাঁর দ্বৈত চরিত্র দেখে দর্শক ও সমালোচকরা বুঝে ফেলেন যে এই ভদ্রলোককে দিয়ে সবই সম্ভব। ‘তেজা ম্যায় হু, মার্ক ইধার হ্যায়’ – সংলাপটা রীতিমত ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে।

সেরা কমেডিয়ান হিসেবে দু’বার ফিল্ম ফেয়ার পান। এর মধ্যে শেষটা এসেছে ২০০১ সালে ‘হেরা ফেরি’ সিনেমার জন্য। এটা পরেশের আরেকটা আইকনিক ছবি। ‘বাবু রাও’ নামের কিপটে, পাগলাটে ও আত্মভোলা চরিত্রটির জন্য তিনি সিনেমার দুই নায়ক অক্ষয় কুমার ও সুনিল শেঠির চেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়ান।

এখান থেকে শুরু হয় পরেশের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়। এরপর থেকে বিস্তর কমিক চরিত্র করেছেন। থিয়েটার থেকে আসার সুবাদেই কি না, কোনো চরিত্র করতেই তাঁকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে যখন তিনি ‘সাঞ্জু’ ছবিতে স্বয়ং সুনীল দত্তর চরিত্র করলেন, তাতেও শতভাগ পাশ মার্কের সাথেই মানিয়ে গেছেন।

প্রযোজক হিসেবে তিনি ‘ওএমজি – ওহ মাই গড!’ ছবিটি করেছেন। এখানে বিখ্যাত ভারতীয় নাটক ‘কিষাণ বানাম কানহাইয়া’-কে বড় পর্দায় দেখানো হয়েছে। মূল চরিত্রে পরেশ নিজেই ছিলেন। ছবিটি সমালোচক ও দর্শকদের দৃষ্টি কেড়েছিল।

রাজনীতির মাঠেও নেমেছিলেন পরেশ। ২০১৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় পার্টির (বিজেপি) হয়ে নির্বাচন করে তিনি আহমেদাবাদ থেকে সংসদ সদস্য বনেছিলেন। একই বছর তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পান।

পরেশের পরের প্রজন্মও জোরে সোরে বলিউডে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক ছেলে অনিরুদ্ধ রাওয়াল নিউ ইয়র্কে স্ক্রিন প্লে’র ওপর পড়াশোনা করছেন। আরেক ছেলে আদিত্য রাওয়াল এরই মধ্যে সালমান খানের ছবি ‘সুলতান’-এ সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন।

এই সময়ে এসে পরেশকে অবশ্য কমিক চরিত্রে খুবই কমই দেখা যায়। এই নিয়ে সিনেমাপ্রেমীদের আক্ষেপের শেষ নেই। এই প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পরেশ বলেছিলেন, ‘আমি একটা ভাল স্ক্রিপ্ট খুঁজছি। এখনো তেমন কিছু চোখে পড়েনি। আমার হাতে সুযোগ থাকলে রোজই এমন একটা করে ছবি করতাম। এই চরিত্র করতেই আমি মজা পাই। আমি এমন কমির রোল খুঁজছি যা কি না একজন অভিনেতা হিসেবে আমাকে আরো সমৃদ্ধ করবে।’

এবার তাহলে তেমন একটা চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করা যাক!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।