পাপন, প্রেস কনফারেন্স, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতি

গতকাল বাংলাদেশের প্রথম সারির ক্রিকেটাররা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডেকেছে। আমি এটাকে দুই দলের মধ্যে একটি কূটনৈতিক দক্ষতার টেস্ট ম্যাচ হিসেবে দেখছি, যেটি ৬-৭ দিনব্যাপী চলবে।

কী হতে পারে ম্যাচের রেজাল্ট, দেড়দিন শেষ; দুই দল আজকের মতো বিশ্রামে গিয়ে পরবর্তী দিনের কৌশল ঠিক করছে। প্রথম দিনে সাকিবের দল আগে ব্যাট করে ৪ উইকেটে ৪৩০ রান করে ইনিংস ঘোষণা করেছে।

জবাবে পাপনের দল আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে ৩৬০ রানে অল আউট হয়ে গিয়েছে। সাকিবের দল ৭০ রানের লিড পেয়েছে।

মনে রাখতে হবে পাপনের দলকে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে হবে।

৩য় আর ৪র্থ দিনে চরম সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে, ৫ম দিন পর্যন্ত উত্তেজনা বিরাজ করবে, এরপর ৬ষ্ঠ বা ৭ম দিনে মিরাকল জাতীয় কিছু ঘটবে। মাঝের সময়টা ক্লাইম্যাক্স উঠানামা করবে।

মধ্যবর্তী সময়টাতে প্রধানমন্ত্রী নামক উইকেট বা পিচের সুবিধা যারা বেশি নিবে তারাই এগিয়ে যাবে। সাকিব আর পাপনের মধ্যে যার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বেশি সুসম্পর্ক সে তুলনামূলক বেশি রানে জয় পাবে, আর যদি সম্পর্কের মাত্রা সিগনিফিক্যান্টলি পার্থক্যসূচক না হয়, সেক্ষেত্রে ম্যাড়মেড়ে ড্র হতে পারে ম্যাচের ফলাফল।

ক্রিকেটারদের আন্দোলন বিষয়ে এখনই মন্তব্য করাটা বোকামি হবে। যে কোনো বিষয়েই আমরা যা দেখি আর আদতে যা ঘটে দুইয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’ এমনই এক দাহ্য পদার্থ সামান্য ‘শিখা’ শব্দটি শুনলেও দাউ দাউ জ্বলে উঠে। এই অতিদাহ্য পদার্থের সংস্পর্শ বাঁচিয়ে সমগ্র ঘটনা নির্মোহ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নীরবতা পালন করাই উত্তম। তাতে ঘটনাকে আরো গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার সুযোগ এবং নিজস্ব এন্টারপ্রেটেশন তৈরির অবকাশ পাওয়া যায়।

ম্যাচ শেষ হলে সমগ্র ব্যাপারটা নিয়ে ক্রিটিকাল এনালাইসিস লিখবার ইচ্ছা রয়েছে।

আগামী কয়েকদিনে অফ দ্য ফিল্ডে কী কী ঘটছে বা ঘটবে কিছুই জানতে পারবো না, কেবল অন দ্য ফিল্ডের কিছু রুটিন ব্যাটিং-বোলিং প্রদর্শনী দেখেই অনেক কিছু বুঝে ফেলেছি ভাব ধরতে হবে।

তারপূর্বে আজকে পাপনের দলের পারফরম্যান্স দেখে সাময়িক ‘প্রতিক্রিয়া’ লিখে রাখছি। এখানে স্মর্তব্য, প্রতিক্রিয়া আর পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। পর্যবেক্ষণের সাথে আনুষঙ্গিক বহু উপকরণ সংযুক্ত থাকে, প্রতিক্রিয়া পুরোটাই তাৎক্ষণিক একশনের পরিপ্রেক্ষিতে হওয়া রিফ্লেক্স, যেখানে তেমন কোনো আগাপাশতলা ভাবনা নেই।

পাপনের সংবাদ সম্মেলন কতক্ষণের জানি না, তবে ইউটিউবে দীর্ঘতম যে ক্লিপিংসটা পাওয়া গেছে সেটা একদম শেষ পর্যন্ত দেখেছি। শুরুর ৫-১০ মিনিট হয়তো মিসিং থাকতে পারে।

১.

পাপন সবচাইতে বড়ো ব্লান্ডার করেছে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ দিয়ে পুরো ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। ‘ষড়যন্ত্র’ এদেশের দলীয় রাজনীতির অভিধানের সবচাইতে চর্বিত চর্বনসর্বস্ব কী-ওয়ার্ড৷ কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী,কখনো দেশবিরোধী, কখনো উন্নয়নবিরোধী, ভাবমূর্তি বিরোধী – এরকম অজস্র প্রসঙ্গে ষড়যন্ত্রের যত্রতত্র ব্যবহার একে এতোই খেলো আর হাস্যকর বানিয়ে ফেলেছে যে কোথাও ষড়যন্ত্র শব্দের অস্তিত্ব দেখলেই মানুষ সেখানে কমেডি দেখার প্রত্যাশা করে। পাপন এক্ষেত্রেও একই শব্দের দ্বারস্থ হয়ে পাবলিক সেন্টিমেন্টে রাশি রাশি দিয়াশলাই কাঠি সরবরাহ করেছে,যে কারণে তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বা উদ্যোগও ছাইচাপা পড়ে যাবে।

২.

ক্রিকেট অবকাঠামো এবং ক্রিকেট দুই শব্দ অনুধাবনের ক্ষেত্রে পাপনের বিরাট কনসেপচুয়াল গলদ রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্রিকেট সংগঠক হিসেবে জড়িত থেকেও সেই গলদ কেন কাটেনি তা প্রশ্নের জন্ম দেয়। নিজেকে অতিবুদ্ধিমান ভেবে মাছ দিয়ে শাক ঢাকতে চাওয়ার বোকামিটাই সে বারবার করে। তার সমগ্র আলোচনার সারবেত্তা হলো– ক্রিকেট বলতে সে কেবল জাতীয় দলকেন্দ্রিক কার্যক্রম বুঝে। যে কারণ ক্রিকেট এবং ক্রিকেটার সংক্রান্ত সকল উদাহরণের স্যাম্পল তার জাতীয় দল সর্বস্ব। খেয়াল না করে থাকলে আবারো শুনতে পারেন।

আরো ব্যথিত হলাম, প্রেস কনফারেন্সে থাকা এতজন ক্রীড়া সাংবাদিকের একজনও তাকে এই মৌলিক ভুলটি ধরিয়ে দিয়ে সে সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন করলো না। যখনই টাকার প্রসঙ্গ, ফ্যাসিলিটির কথা উঠে সে তামিম, সাকিব বা মুশফিকের উদাহরণ দিয়েছে, কিন্তু নাদিফ চৌধুরী বা ফজলে মাহমুদ রাব্বি ধর্মী ক্রিকেটার যারা জাতীয় দলে খেলছে না তাদের উপার্জন, ফ্যাসিলিটি বিষয়ে তার কোনো উদাহরণ নেই। জাতীয় দলে খেলে মাত্র ১৪-১৫ জন, সেখানেও তারকা হয় বড়োজোর ৫-৭ জন, বাকি স্পটগুলো ম্যাজিকাল চেয়ারের মতো ঘুরতে থাকে।

ফার্স্ট ক্লাস খেলা অধিকাংশ ক্রিকেটারকে যদি উদাহরণ হিসেবে টানতে না পারেন, জাতীয় দলে খেলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে ক্রিকেট অবকাঠামো, সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই আপনার। জাতীয় দলের ক্রিকেটার আর ফার্স্ট ক্লাস খেলা ক্রিকেটারের মধ্যে ব্যবধান যদি সহস্র আলোকবর্ষের হয়, ৭ বছরে সভাপতি থেকে আপনার অর্জনের খাতাতেও দশমিকের পরে সতেরোটা শূন্য বসিয়ে ১৮ তম ঘরে গিয়ে কোনো একটা ডিজিট বসা উচিত।

৩.

পাপন একদম প্রকাশ্যে ‘রুল অ্যান্ড ডিভাইড’ নীতির ঘোষণা দিয়েছে, এটা আনাড়িপনা। সে বলেছে অধিকাংশ খেলোয়াড়ই এ ব্যাপারে তেমন কিছু জানে না। এরপর এক অংশে বলেছে, দেখি কারা ক্যাম্পে আসে। অর্থাৎ সে জুডাসদের ওপেন ইনভাইটেশন দিয়ে রাখছে, মূল খেলোয়াড়দের ছাড়াই খর্বশক্তির দল নিয়ে হলেও ভারত সফরে যাবে। যেমনটা ঘটেছিল ২০০৮-০৯ এর দিকে বাংলাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। খেলোয়াড়দের বিদ্রোহের মুখে তৃতীয় সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল মাঠে নেমেছিল। ২০০০ সালের দিকে এমসিসি দলের বিপক্ষে বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটেছিল। বিসিবি বাধ্য হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন একাদশ নামের এক দল মাঠে নামায়। সেসময়কার বিসিবির প্রেসিডেন্টের নাম সাবের হোসেন চৌধুরী, যাকে নিয়ে এখনো বেশ কয়েকজনকে স্ট্যাটাস লিখতে দেখি – আহা সে কী অমায়িক এক বিসিবি সভাপতি ছিল!

সেই আন্দোলনের তিন খেলোয়াড় ( আকরাম, দুর্জয়, সুজন) এখন বোর্ডে, কিন্তু তারা ক্রিকেট ছাড়ার সাথে ক্রিকেটার সত্তাটিও ড্রেসিংরুমের কমোডে ফ্ল্যাশ করে দিয়ে এসেছে। মানুষ মানতেই পারে না লংকায় যে-ই যাক সে রাবণই হবে, নইলে রামদের বীরত্বগাঁথা রচিত হবে না।

ক্যারিয়ার নিয়ে শংকায় থাকা কিছু ক্রিকেটারকে যদি পেয়েই যায়, সেটা দিয়েই হয়তো দল সাজাবোর পরিকল্পনা। পাপনের প্রধান শত্রু তার ব্যক্তিগত ইগো। নিজস্ব ইগো পুষতে সে কতদূর যেতে পারে সেটা একটা ইন্টারেস্টিং পর্যবেক্ষণ হতে পারে।

৪.

পাপন অনমনীয়তাকে গ্লোরিফাই করতে গিয়ে নিজের জন্য বুমেরাং বানিয়ে ফেলেছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিটিক্যালসের এমডি, নিজে একজন জনপ্রতিনিধি, অথচ সে এখনো উপলব্ধি করতে পারছে না পাবলিক সেন্টিমেন্ট বরাবরই ভিক্টিমের প্রতি থাকে, প্রশাসক চিরজন্মের আনপপুলার ক্যারেক্টার। সে যদি নিরেট সত্যি কথাও বলে তবু কি সাকিব, তামিম বা মুশফিকদের ফ্যানদের কাছে তাদের ভিলেন প্রতিপন্ন করতে পারবে? তাহলে এই হাস্যকর অপচেষ্টার মানে কী? সে বলছে ক্রিকেটাররা খেললে খেলবে না খেললে নাই, বাইরের কারা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত তা আমরা জানি, কিন্তু আমাদের টিমের মধ্যে কেউ আছে কিনা সেটা জানতে হবে। এটা কী ধরনের স্টেটমেন্ট!

যেহেতু ভারতের বিরুদ্ধে খেলার আগে সাইবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, ভারতের কাছে পরাজয়কে পাবলিক স্পোর্টিংলি নিতে পারে না, ক্রিকেটারদের মধ্যেও মেন্টাল ব্লক কাজ করে, এই সুযোগটাকে সে এনক্যাশ করতে চেয়েছে। ‘ভারতের বিপক্ষে সিরিজ’ – শব্দটাকে সে যেভাবে উপস্থাপন করেছে তাতে পাবলিক সেন্টিমেন্ট হয়তোবা বিসিবির দিকে ঘুরবে, জাতীয় দলের প্লেয়ারদের ইনকামের কথা বলে কিছুসংখ্যক হীনম্মন্য মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে, কিন্তু সে এটা মাথায় রাখেনি, পাবলিকের এই অংশটা মূলত গারবেজ, যারা নিজেরা দুই লাইনের পোস্ট লিখবে না কোথাও, বিভিন্ন পোর্টালের কমেন্ট সেকশনে গিয়ে বর্জ্য ত্যাগ করাই তাদের সর্বোচ্চ এফোর্ট। অন্যদিকে ক্রিকেটারদের মার্জিত এবং অন্ধ ফ্যানেরা শয়ে শয়ে পোস্ট লিখবে। স্ট্র‍্যাটেজিক প্ল্যানিংয়ে পাপনের টিম এইখানে মারত্মকভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে।

খেলা চলছে, দেখতে থাকি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।