কারাবাস, হোটেলের রান্নাঘর থেকে রুপালি পর্দার আশ্চর্য প্রদীপ

মঞ্চ নাটকের কাছে আধুনিক বলিউডের ঋণের কথা বলে শেষ করা যাবে না।  থিয়েটারের কাছে ইন্ডিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কৃতজ্ঞ থাকতেই হবে। কারণ, এই মঞ্চই বর্তমান সময়ে বলিউডে কাজ করা তুঁখোড় ও আশ্চর্যজনক রকমের প্রতিভাবান কয়েকজন অভিনেতার জন্ম দিয়েছে।

তেমনই একজন হলেন পঙ্কজ ত্রিপাঠি। এই ভদ্রলোক নিজের অভিনয় প্রতিভা দিয়ে বলিউডে অনন্য এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তিনি এমন ভাবে প্রতিটা চরিত্র করেন যেন, চরিত্রগুলো কেবল তাঁর জন্যই বানানো হয়েছে। মঞ্চের অভিজ্ঞতা ছিল বলেই তো এটা সম্ভব হয়েছে।

তো কিভাবে মঞ্চে জড়ালেন? পঙ্কজের উত্তর, ‘একদিন আমি পাটনা গেলাম। থিয়েটার দেখা শুরু করলাম। ভাল লাগলো। এরপপর থেকে রোজ দেখতে লাগলাম। মঞ্চের লোকদের সাথে কাজও করা শুরু করলাম। শুরুর দিকে এটা আমার জন্য সৌখিন একটা ব্যাপার ছিল। আমি ছিলাম খুব বিশ্বাসভাজন দর্শক। দু’বছর আমি পাটনার সব থিয়েটার ও সাংস্কৃতির অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।’ বোঝাই যাচ্ছে রীতিমত থিয়েটারের পোকা ছিলেন পঙ্কজ।

পঙ্কজের থিয়েটারে কাজ করাটাও প্রায় অসম্ভব আর অমানসিক পরিশ্রমের ব্যাপার ছিল। রাতে তিনি একটা হোটেলের রান্নাঘরে কাজ করতেন। রাতের শিফট ১১টায় শুরু হয় সাতটায় শেষ হত। এরপর বাড়ি ফিরে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন। দুপুর দু’টা থেকে সাতটা অবধি থিয়েটার করতেন।

ত্রিপাঠি এমন একটা জায়গা খুঁজছিলেন, যেখানে তাকে কেউ বিনে পয়সায় অভিনয় শেখাবে। কারণ, তিনি জানতেন অভিনেতা হওয়ার টাকা কখনোই বাবার কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। তখনই দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার (এনএসডি) খবর পান। কিন্তু, এ কি! তাঁর জন্য যে আগে নুন্যতম স্নাতক পাশ করে আসতে হবে।

দ্বাদশ শ্রেণি শেষ করেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন পঙ্কজ। হোটেল ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং করেছিলেন। অভিনয়ের জন্য আবারো কলেজে ভর্তি হলেন। থিয়েটার আর হোটেলের কাজের মধ্যেই হিন্দি সাহিত্যে স্নাতক শেষ করলেন।

এই গল্পেও একটু টুইস্ট আছেন। কলেজে থাকতে রাজনীতিতে জড়ালেন। বিজেপির ক্যাম্পাস উইং অখিল ভারতীয় বিদার্থী পরিষদের (এবিভিপি) হয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে এক সপ্তাহ জেলেও কাটাতে হয় পঙ্কজ। জেলের সেই সময়টা যেন ভিন্ন এক দুনিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল পঙ্কজকে।

ত্রিপাঠি বলেন, ‘জেলে আপনার কিছুই করার নেই। কোনো মিটিং নেই, রান্নার ঝামেলা নেই, কিচ্ছু নেই। আপনি একদম একা। আর একজন মানুষ যখন একদম একা থাকে, তখন সে নিজেকে নতু করে আবিষ্কার করে। সেই সাতদিনে আমি নতুন একজন মানুষকে পেলাম নিজের মধ্যে। আমি হিন্দি সাহিত্য পড়া শুরু করলাম। আমি দেখলাম বাইরের দুনিয়ার ব্যাপারে আমার কোনো ধারণাই নেই। এই ব্যাপারটা পুরোপুরি পাল্টে দিল আমাকে।’

২০০৪ সালে এনএসডি থেকে তিনি নিজের কোর্স শেষ কলেন। সেখানে আরেক অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী তাঁর চেয়ে আট ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন। পঙ্কজ সে বছরের ১৬ অক্টোবর ৪৬ হাজার রুপি নিয়ে  মুম্বাই আসলেন। ২৫ ডিসেম্বর নাগাদ তাঁর সেই কোষাগার ১০ রুপিতে গিয়ে ঠেকলো।

পঙ্কজ বলেন, ‘দিনটা আমার মনে আছে, কারণ সেদিন ছিল আমার স্ত্রীর জন্মদিন। কিন্তু, আমার কাছে সামান্য একটা উপহার বা কেক কেনার মতও কোনো অর্থ ছিল না।’

শুরুর দিকে তারকা হতে চাননি পঙ্কজ। চেয়েছিলেন অভিনয় করে নিজের সংসার চালাবেন।  বলিউডে তাঁর ক্যারিয়ার পূর্ণতা পাওয়ার ব্যাপারটা খুব বেশিদিনের পুরনো নয়। সেটা শুরু হয় ২০১২ সালে নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপের ‘গ্যাঙস অব ওয়াসিপুর’ মুক্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে।

আগেই অবশ্য তিনি ‘ওমকারা’ ও ‘রান’-এ ছোটখাটো চরিত্র করেছেন। কিন্তু, কারো নজরে পড়েননি। তবে, গ্যাঙস অব ওয়াসিপুরেই তিনি সবটুকু আলো কাড়তে সক্ষম হন। রাতারাতি তারকাও বনে যান।

আর এই সময়ে এসে তিনি যা করেন তাতেই বাজিমাৎ করেন। তার এমন কোনো কাজ সাম্প্রতিক সময়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা দেখে দর্শকদের ভাল লাগেনি। হোক সেটা বলিউডে কিংবা ওয়েব প্লাটফরমে। চরিত্রগুলোও নানা মাত্রার। ‘স্ত্রী’, ‘লুকাছুপ্পি’-তে তাঁর কর্মকাণ্ডে দর্শকরা যেমন হেসেছেন, তেমনি ‘মির্জাপুর’ বা ‘স্যাকরেড গেমস’-এ তাঁর অবতার ভীতির সঞ্চার করেছেন।

এখন পঙ্কজ সব রকম পরিচালকের কাছের মানুষ। তার ডায়লোগ ডেলিভারি স্কিল, কাজের প্রতি তাঁর একাগ্রতার কারণে, দর্শকও অপেক্ষায় থাকেন – এরপর কোন নতুন ধামাকা নিয়ে হাজির হবেন পঙ্কজ!

পঙ্কজের জন্ম হয় সাধারণ এক কৃষক পরিবারে। সিনেমার ভূবনেও নিজেকে তিনি কৃষকই মনে করেন। বললেন, ‘আমি একজন অভিনেতা, কিন্তু আমার মানসিকতা এখনো একজন কৃষকের। আমি বীজ বুনেছি। এখন গাছটা বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।’

– টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আইডব্লিউএমবাজ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।