‘আনপ্রেডিক্টেবল’ বলেই পাকিস্তানও আলোচনায়

‘আনপ্রেডিক্টেবল’ তকমাটা পাকিস্তান ক্রিকেটের সাথে একদম শুরু থেকেই জুড়ে আছে। ১৯৯২ সালে এমন অবস্থা থেকে ফিরে এসে বিশ্বকাপ জিতেছিল পাকিস্তান, যা ছিল বাকিদের কল্পনার বাইরে। এমনকি ২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তান যখন চ্যাম্পিয়ন হলেও টুর্নামেন্ট তারা শুরু করেছিল একেবারেই আন্ডারডগ হিসেবে।

ফলে, পাকিস্তান ক্রিকেট দল কখন কি করে ফেলে, সেটা আগাম বলে দেওয়া মুশকিল। এই যেমন, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ের পর তাদের বড় কোনো সাফল্য নেই। ব্যার্থ হয়েছে এশিয়া কাপে। হোম কন্ডিশনে হেরেছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সম্প্রতি ইংল্যান্ড সফরেও বলার মত কোনো সাফল্য এখনও পাকিস্তান দলের নেই। সর্বশেষ নয়টি ওয়ানডের সবগুলোই হেরেছে দলটি। তবে, দুয়ারে যখন বিশ্বকাপ, তখন পাকিস্তানকে হিসাবের খাতায় না রাখার কোনো বিকল্পও নেই।

  • দলের শক্তিমত্তা

পাকিস্তানকে বলা হয় ফার্স্ট বোলারদের আঁতুড়ঘর। যুগ যুগ ধরে বহু প্রতিভাবান ফার্স্ট বোলার এই ভূখণ্ড থেকে উঠে এসে পরবর্তীতে বিশ্ব কাপিয়েছেন। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনূস, শোয়েব আখতার, আব্দুর রাজ্জাক, ইমরান খান, মোহাম্মাদ আসিফ এমন আরো অনেক বাঘা বোলার অতীতে মাঠ কাপিয়েছেন।

ইংলিশ কন্ডিশনে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে গতির ঝড় তুলতে পারবে, বর্তমান পাকিস্তান স্কোয়াডে এমন ফাস্ট বোলার আছে পাঁচ জন! এরা যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপের জন্যই ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। এর সাথে স্পিন ডিপার্টমেন্টে রয়েছে অভিজ্ঞ ইমাদ ওয়াসিম, মোঃ হাফিজ, শোয়েব মালিকেরা। রয়েছে শাদাব খানের মতো এক্সাইটিং লেগ স্পিনার। সবমিলিয়ে পাকিস্তানের বোলিং লাইনআপ এই আসরের অন্যতম সেরা।

সেরা বোলিং লাইনআপের পাশাপাশি পাকিস্তান টিমে রয়েছে ফখর জামান, ইমাম-উল-হক, বাবর আজমদের নিয়ে তৈরী নির্ভরযোগ্য টপ অর্ডার। ম্যাচের হাল ধরে রাখতে এদের ব্যাটিং এর জুড়ি মেলা ভার।

  • অভিজ্ঞতা

এবারের ওয়ার্ল্ড কাপের ম্যাচ সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে কম অভিজ্ঞ দল হলো এটি। অলরাউন্ডার মোহাম্মাদ হাফিজ দলের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। বামহাতি ফার্স্ট বোলার ওয়াহাব রিয়াজ খেলেছেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দু’টি। এছাড়া অধিনায়ক সরফরাজ আহমেদ, হারিস সোহেল এবং শোয়েব মালিক খেলেছে একটি করে। বাকি দশজনের সবাই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে।

  • তুরূপের তাস

ওপেনিং ব্যাটসম্যান ফখর জামান হতে পারেন পাকিস্তানের জন্য একজন গেম চেইঞ্জার। তার সেঞ্চুরির ওপর ভর করেই দু’বছর আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে পাকিস্তান বড় সংগ্রহ দাড় করিয়েছিল। তার সাথে আরেক ওপেনার ইমাম উল হক লম্বা ইনিংস খেলতে পারেন। দলের সেরা ব্যাটসম্যান বাবর আজম কঠিন পরিস্থিতিতে মূল্যবান ইনিংস খেলে জয়ের ভিত গড়ে দিতে পারেন। ওয়ানডে তে এই তিন জনের ব্যাটিং গড় পঞ্চাশের ওপরে, যা ঈর্ষণীয়!

এছাড়া বোলিং এ হাসান আলির মতো একজন এক্সাইটিং ট্যালেন্ট রয়েছে। সবশেষ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যিনি ৫ ম্যাচে ১৩ উইকেট শিকার করেছিলেন, হয়েছিলেন সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী। এছাড়া লেগ স্পিনার শাদাব খান যেকোনো সময় টপাটপ উইকেট তুলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। রয়েছেন মোঃ হাসনাইন এর মতো আরেকটি এক্সাইটিং ট্যালেন্ট, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি নতুন। তবে তার প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া মোহাম্মদ আমির এবং ওয়াহাব রিয়াজদের মতো বড় ম্যাচের খেলোয়াড়রা নতুনভাবে স্কোয়াডে যুক্ত হওয়ায় পুরো টিমকে ভালো খেলতে সহায়তা করবে।

  • দূর্বলতা

ভঙ্গুর মিডল অর্ডার পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের একটি চিরায়ত সমস্যা। আদিকাল থেকেই তাদের এ সমস্যা বিরাজমান। বর্তমান স্কোয়াডে থাকা মোহাম্মদ হাফিজ, সরফরাজ আহমেদ, শোয়েব মালিকেরা দীর্ঘদিন ধরে মিডল অর্ডারে খেলে আসলেও তারা ধারাবাহিকতা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এবার তাদের সাথে ইমাদ ওয়াসিম, শাদাব খান এবং আসিফ আলি রয়েছেন। দেখা যাক নতুন পুরাতন মিলে তারা এই পজিশনে কতটুকু ভালো করতে পারে।

পাকিস্তান টিমের আরেকটি চিরায়ত এবং বড় সমস্যা হলো তাদের ফিল্ডিং। বাজে ফিল্ডিংয়ের কারণে ম্যাচ হেরেছে এমন পরিসংখ্যান ঘাটলে হয়তো তাদের নামটাই বেশিবার উচ্চারিত হবে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, তারা এসমস্যা সমাধানে মোটেও সিরিয়াস না।

  • প্রেডিকশন

এই ইংল্যান্ডের মাটিতেই সরফরাজ আহমেদের দল ২০১৭ সালে আন্ডারডগ হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় করেছে। ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় করেছে, সেটাও ইংল্যান্ডের মাটিতে। ১৯৯৯ সালের ওয়ার্ল্ড কাপে রানার্সআপ হয়েছে। ১৯৭৯ ও ১৯৮৩ সালের দুই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে। ইংলিশ কন্ডিশনে পাকিস্তান যে ভালো খেলে অতীতে তা প্রমাণিত।

যদিও বর্তমানে তাদের অবস্থা লেজে গোবরে, সেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর বড় কোনো সাফল্য নেই। তবে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মে প্রায়সময়ই হুট করে আকাশ মেঘে ঢেকে যায়, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়তে থাকে। এমন কন্ডিশনে পাকিস্তানের ফার্স্ট বোলিং কতটা ভয়ংকর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ওয়ার্ল্ড কাপে পাকিস্তানের প্রথম ম্যাচ ৩১ শে মে, উইন্ডিজের বিপক্ষে। এ টুর্নামেন্টে পাকবাহিনীকে ঠেকাতে হলে বাংলাদেশ, উইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ডকে কঠিন পরীক্ষারই সম্মুখীন হতে হবে। ইংল্যান্ড এবার শক্তিশালী টিম হলেও পাকিস্তানের সাথে তাদের অতীত রেকর্ড সুবিধার না। তাই তারাও সহজে পার পাবে না। রাউন্ড রবিন লিগের এই ৬ টি ম্যাচ পাকিস্তানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ছয় ম্যাচ থেকে নূন্যতম তিনটি না জিততে পারলে, বিশ্বকাপে টিকে থাকা তাদের জন্য অনেক কঠিন হবে।

  • পাকিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

ফখর জামান, ইমাম উল হক, বাবর আজম, হারিস সোহেল, আসিফ আলি, সরফরাজ আহমেদ (উইকেটরক্ষক-অধিনায়ক), শোয়েব মালিক, মোহাম্মদ হাফিজ, ইমাদ ওয়াসিম, শাদাব খান, মোহাম্মাদ আমির, হাসান আলী, মোহাম্মদ হাসনাইন, শাহীন শাহ আফ্রিদি ও ওয়াহাব রিয়াজ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।