বাংলাদেশ-পাকিস্তান, সাম্প্রদায়িকতা ও দানিশ কানেরিয়ার কেস স্টাডি

একটা খবর হয়তো আপনারা জেনেছেন। আমার কাছে একজন বাংলাদেশি হিসাবে ঘটনাটার তাৎপর্য অনেক।

পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার শোয়েব আখতার জানিয়েছেন, পাকিস্তান ক্রিকেট দলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে নানাভাবে অপদস্ত হতেন ওয়াসিম-ওয়াকার-ইমরানের পর দেশটির ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেট শিকারি দানিশ কানেরিয়া।

শোয়েবের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেছেন কানেরিয়া নিজেও। তবে, কানেরিয়া যে ব্রাত্য ছিলেন এবং তাঁকে যে নানাভাবে এখনও কাঠামোগতভাবে হেনস্তা হতে হয়, এটা তিনি নিজেই বহু আগে বলেছেন। সে সময় তিনি এমনকি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন।

কিন্তু, আমরা তো জানিই, উপমহাদেশে ‘ধর্ম’ এমন একটি ‘ডগমা’ যে, এখানে এখনও একে অতিক্রম করে রাজনীতির পাটাতন দাঁড়ায়নি। পৃথিবীর আর কোন অঞ্চলে এতো বিশাল ধর্মবৈচিত্র্য নেই। বৈচিত্র্য আশীর্বাদ হয় কোথাও কোথাও। কিন্তু, এ অঞ্চলে হয়ে গেছে অভিশাপ! অভিশাপ না হলে কি শুধু ‘হিন্দু ব. মুসলিম ব. শিখ’ নামক বিভাজন তৈরি করে আমরা এতো বড় একটা অঞ্চল ভাগাভাগি করে নেই!

আর এ ভাগাভাগির ‘কল্যাণে’ই সম্ভবত আজও এ অঞ্চলে কোন একটা ইস্যুতে রাজনীতি ঢুকে গেলে তাতে ধর্মও ঠাণ্ডামাথায় নীরব ঘাতকের মতো ঢুকে পড়ে।

কানেরিয়ার ঘটনাটা হঠাৎই বড় হয়ে গেল কেন? অতীতেও তিনি তাঁর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। তখন এতো আলোচনা হয়নি কেন? এবার হলো, তখন হয়নি কারণ ভারত সরকারের করা সাম্প্রতিক ‘এনআরসি’ ও ‘সিএএ’।

এটা একটা কেইস স্টাডি হিসেবে নিতে পারি আমরা। রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাগ হওয়ার পরও, এক দেশের নিয়মনীতির প্রভাব কী করে আরেক দেশের মানুষকেও প্রভাবিত করে, কানেরিয়ার ঘটনাটা থেকে সুন্দর বোঝা যায়।

তবে, শোয়েব আর কানেরিয়ার এই অভিযোগের পিঠে একটা ছোট্ট কথা আছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল কেন? কারণ, ওরা রাষ্ট্র হিসেবে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক। ওদের সাম্প্রদায়িকতার উদাহরণ আমরা বরং ওদের চেয়ে বেশি দিতে পারব।

ভারতের সাম্প্রদায়িকতা তো হেনকালে রাজনীতি দ্বারা আরোপিত হচ্ছে। কিন্তু, ড. জাকির হুসাইন, এপিজে আব্দুল কালাম দেশটির রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, আজহারউদ্দিন ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন, খানেরা বলিউড মাতিয়ে চলেছেন, এসবও কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। এসবের পেছনে তাঁদের যোগ্যতাই মূখ্য। কিন্তু, পাকিস্তানের ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি স্পিনার কানেরিয়া তো যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এগোতে পারলেন না বেশিদিন পাকিস্তানে!

এদিক থেকে আমি সৌম্য সরকার, লিটন দাসসহ বিভিন্ন সেক্টরের বিভিন্ন অ-মুসলিম পেশাজীবীকে অনেক ‘ভাগ্যবান’ মনে করি। পাকিস্তান থাকলে, তাদের অবস্থা কানেরিয়ার চেয়ে খুব উন্নত থাকত না!

বাংলাদেশ আমার কাছে অসাম্প্রদায়িকতার আধার। সাম্প্রদায়িকতা তো এখানে এসেছে কখনও ৪৭, কখনও ৭১, কখনও ৭৫-এর হাত ধরে খুবই ক্ষুদ্র একটা গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের কারণে। কিন্তু, আমি যে বাংলাদেশকে চিনি জানি, তা ‘কানেরিয়ার পাকিস্তান’ না!

যারা সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায়, সেই গোষ্ঠীর পরাজয় একদিন ঘটবেই। লড়াইটা জারি থাকুক পুরো উপমহাদেশ জুড়ে। বৈচিত্র্যের উপমহাদেশে শান্তি ফিরে আসুক। মানুষই ফেরাবে এ শান্তি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।