পদ্মনাভস্বামী টেম্পল: পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় মন্দির!

ভারতের কেরালা রাজ্যের পদ্মনাভস্বামী মন্দির – বলা হয়, এটাই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় মন্দির! আগে আমরা রুপকথা-উপকথাতে রাজা বাদশাহদের সময়ে যে মন্দিরে ধন-সম্পদের কথা শুনতাম, সেটাই সত্যি হিসেবে এসেছে পদ্মনাভস্বামী মন্দিরে!

বেশিদিন আগের কথা নয়, ২০১১ সালেই ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে এ মন্দির থেকে বিপুল পরিমান ধন-সম্পদ বের করে আনা হয় মানুষের সামনে! শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দির, ভারতের কেরালা রাজ্যে অবস্থিত এই মন্দির পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে রহস্যময় মন্দিরগুলোর মধ্যে একটি।

আসলেই রহস্যময়!

এই মন্দির পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মন্দির। কিন্তু পৌরাণিক এবং মাহাত্ম্যের দিক থেকে এটি যত না সুপরিচিত তার থেকে বেশি পরিচিত এর পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্যের জন্য। আসলে এই মন্দিরে এমন কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে যা এই মন্দিরটিকে অন্যান্য মন্দির গুলির থেকে আলাদা করে তোলে।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মনে করত এই মন্দিরের নিচে গুপ্তধন লুকানো আছে, এই মন্দিরে ভেতরে অনেকগুলি গুপ্ত দরজা আছে, যেগুলিকে কখনোই খোলা হয়নি। খোঁজ করার পর জানা যায় যে, এই মন্দিরে মোট ছয়টি গুপ্ত দরজা রয়েছে, কিন্তু কেউ জানে না, যে কি রহস্য লুকিয়ে রয়েছে এই দরজার আড়ালে।

২০১১ সালে ইন্ডিয়ান সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই মন্দিরের দরজা গুলিকে একের পর এক খোলা হয় এবং অবশেষে পাঁচটি দরজা খোলা হয়। এই দরজার পেছনে যা পাওয়া গিয়েছিল তা সারা বিশ্বকে হতভম্ব করে দিয়েছিল।  ওই দরজা গুলির পেছনে পাওয়া যায়, প্রচুর পরিমাণে সোনা, সোনার তৈরি অসংখ্য প্রাচীন মূর্তি এবং প্রচুর সোনার মুদ্রা যার মূল্য কয়েকশো কোটি নয়, কয়েকশো হাজার কোটি।

অর্থাৎ মানুষ যা প্রাচীনকাল থেকে শুনে এসেছিল তা শুধু গল্প ছিল না। বেশি দিন আগের ঘটনা নয়, আজ থেকে আট বছর আগের ঘটনা।

এ তো কিছুই না। শ্রী পদ্মনাভস্বামী টেম্পলের আসল আকর্ষণ তো এর ‘ভল্ট বি’ মানে ছয় নম্বর দরজা! এই ভল্টটিকে ঘিরে রহস্য এবং কিংবদন্তির কোনো শেষ নেই। কারণ একটিই – অন্য ভল্টগুলো খোলা হলেও এটি এখনো খোলা হয় নি!

দেশটির সুপ্রিম কোর্ট থেকে জানানো হয়েছে ‘ভল্ট এ’-তে থাকা মূল্যবান সামগ্রীগুলো ঠিকমতো নথিভুক্ত করা গেলে তবেই খোলার অনুমতি দেয়া হবে এ ভল্টটি। তবে এমন ঘোষণায় বসে নেই গবেষকেরা। বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তারা যে দাবী করছেন তাতে বিস্ময়ে মুখ ‘হাঁ’ হয়ে যেতে বাধ্য।

তাদের মতে ভল্ট বি-তে মজুদকৃত সম্পদের বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে! ধারণা করা হয়, ভল্ট বি’র দরজার সামনে দুটো কোবরা সাপের প্রতিকৃতি রয়েছে।

কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, ভল্ট বি’র দরজা ভেতর থেকে পাহারা দিয়ে রেখেছে বিশালাকৃতির দুটি কোবরা। যদি কোনো অনুপ্রবেশকারী সম্পদের লোভে সেখানে প্রবেশ করেও থাকে, তবে সাথে সাথেই সাপের ছোবলে পরপারে পাড়ি জমাবে সে।

তবে এটি শুধু রহস্যের শুরু এখনও আসল রহস্য আপনার সামনে তুলে ধরা হয়নি। সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপারটি হল এই দরজাতে মানে ভোল্ট বি তে না কোন চাবির গর্ত আছে, না কোন এমন জিনিস যার সাহায্যে এই দরজাটি খোলা যায় অর্থাৎ এটি এমন একটি দরজা যাকে কেউ সহজে খুলতে পারবে না।

বলা হয়ে থাকে এই দরজাটিকে একমাত্র ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী খোলা সম্ভব।

এটিকে, একটি মন্ত্র দ্বারা খোলা যেতে পারে, যাকে গারুদা মন্ত্র বলে আর এই দরজাটি সেই পবিত্র মানুষই খুলতে পারবে যার মনের শক্তি সবচেয়ে বেশি, যিনি মহান আর মনে করা হয় সেই মহান মানুষের জন্ম আজ পর্যন্ত হয়নি, যিনি এই দরজাটি খুলতে পারবেন।

স্থানীয়রা বিশ্বাস করে – কেউ যদি জোর করে এই দরজাটি খোলে তাহলে তাঁর জীবন অভিশপ্ত হয়ে যাবে। আর সেই জন্য এই দরজাটিকে পুনরায় সিল করে দেয়া হয় আজ পর্যন্ত কেউ জানে না এই দরজার পেছনে কি রয়েছে! কিন্তু, এর আগেও বহুবার এই দরজা গুলিকে খুলবার প্রচেষ্টা করা হয়েছিল।

আজ থেকে ১০০’রও বেশি বছর আগে ১৯০৮ সালে এই দরজাগুলিকে খোলার প্রথম চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই সময় যখন তারা প্রথম দরজাটিকে খোলার চেষ্টা করে তখন প্রচুর পরিমাণে সাপ তাদের সামনে বেড়িয়ে আসে যার ফলে তারা একটিও দরজা খুলতে পারিনি।

কিন্তু এরপর ১৯৩১ সালে আরো একবার এই দরজাগুলিকে খোলার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং এবার একটি দরজা খোলা হয় আর ওই দরজার পিছনে থেকে বেরিয়েছিল প্রচুর পরিমাণে সোনা। এর মানে হচ্ছে, আসলে প্রথম দরজাটি ১৯৩১ সালেই খোলা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারা বাকী দরজাগুলিকে কেন খুলতে পারিনি তার কারণ কেউ জানে না।

এবার একটা রহস্য সামনে উঠে আসছে। ১৯০৮ সালে দরজা খোলার সময় প্রচুর পরিমাণে সাপ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৩১ সালে যখন পুনরায় চেষ্টা করা হয় তখন কিন্তু কোন সাপ দেখা যায়নি, তাহলে যখন এবার কোনো বাঁধা ছিলনা, যখন কোন সাপই তাঁদের সামনে আসেনি তাহলে তারা প্রথম দরজাটিকে খোলার পর অন্যগুলি খোলার চেষ্টা কেন করেনি?

কিছু মানুষের মনে করে যে জিনিসগুলি এই দরজার পেছন রয়েছে সেগুলি সব দৈবীয় জিনিস, মনে করা হয় এগুলি মানুষের হাতে আসা উচিত নয়, আর এই জন্যই হয়তো তারা বাকি দরজা গুলি খোলেনি এবং প্রথমে খোলা দরজাটিকেও বন্ধ করে দেয়।

আর এই রহস্যের জন্যই মানুষ এই মন্দিরটির প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ে এবং প্রচলিত হয়ে যায় যে এই মন্দিরে প্রচুর পরিমাণে গুপ্তধন লুকানো আছে।

এইজন্যই সরকারের লক্ষ্য এই মন্দিরের উপর পরে, এত কিছু করার পরেও এই মন্দিরে পাঁচটি দরজাকে ২০১১ সালে খোলা হয় যা ১৯৩১ সালের পর অর্থাৎ প্রায় ৮০ বছর পর খোলা হয় কিন্তু ছয় নম্বর দরজাটি আজ পর্যন্ত কেউ খুলতে পারিনি।

রহস্যময় ব্যাপারটি হল ২০১১ সালে এই দরজা খোলার সময়ও কোন সাপের দেখা মেলেনি। আর কোনো বাধা না পাওয়ায়, ভারত সরকার এই মন্দিরের পাঁচটি গুপ্ত দরজাকে সম্পূর্ণভাবে খুলে দেয়। কিন্তু আজও ছয় নম্বর দরজাটি খোলা সম্ভব হয়নি।

এই দরজার সবচেয়ে আলোচিত ব্যাপারটি হল, অন্য পাঁচটি দরজার মত এই ছয় নম্বর দরজাটিও ভারত সরকার খোলার চেষ্টা করছিল কিন্তু যখন এটি খোলার চেষ্টা করা হয় তখন সেখানকার মানুষ, সরকারের এই কাজে বাধা দেয় আর তারা কোর্টে আপিল করে এই কাজ বন্ধ করার জন্য।

মন্দিরের সাথে যুক্ত মানুষেরা কেউ চাইছিল না এই ছয় নম্বর দরজাটা কেউ জোর জবরদস্তি খুলুক। আর তার কারণ হলো তারা একটি রিচুয়াল করেছিল যেখানে পণ্ডিতেরা ভগবানকে জিজ্ঞাসা করে যে ভগবান কি চাইছেন, তিনি কি এই দরজাটি খোলার অনুমতি দিচ্ছেন আর এরপরে তাঁরা জানতে পারে ভগবানও চায়না এই দরজাটি খোলা হোক।

যারা এই রিচুয়ালটি পারফর্ম করেছিল সেই মানুষদের কথা অনুযায়ী এই দরজাটিকে খোলার পরিণাম অনেক ভয়ংকর হতে পারে, যদি এই ৬ নম্বর দরজাটিকে জোর জবরদস্তি খোলা হয় তাহলে সুনামির মতো ভয়ংকর প্রলয় আসবে এবং চারদিকে ধ্বংস লীলা চালু হয়ে যাবে আর সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাবে,এমনটাই তারা মনে করে।

সেখানকার মানুষ যে গল্প শুনেছিল এই মন্দিরের গুপ্তধনের ব্যাপারে তা আসলেই এই মন্দিরে ছিল। আর পাঁচটি দরজা খোলার পর সেই গুপ্তধন তাদের চোখের সামনেই ছিল।

সবচেয়ে মজার বিষয় আজ অবধি ভারত সরকার অনুমতি দেয়নি এ মন্দিরের ছয় নম্বর দরজাটি খোলার জন্য, যেখানে ধারনা করা হয়। এক ট্রিলিয়ন ডলার দামের ও বেশি পরিমানে মনি-মানিক্য-স্বর্ন-রত্ন রয়েছে। কি বিশ্বাস হয়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।