পাতাল লোক: ভারতের ‘সর্বকালের সেরা’

দাবার চালে সবসময় সামনে যা দেখা যায়, ঘটনা আসলে সেটা থাকে না কখনোই। প্রতিটা চালের পেছনেই একটা করে গল্প লুকানো থাকে। সে গল্পের লেয়ার ধীরে ধীরে খুলে যায় খেলার গতির সাথে সমান্তরালে।

সেখানে সবার গল্পই থাকে। সৈন্য, হাতি, ঘোড়া, নৌকা, রাজা, রানী, মন্ত্রী সহ সবার। তাদের প্রত্যেকেরই এই গল্পের ফুল দিয়ে চমতকার একটা মালা গেথেঁছেন সুদ্বীপ শর্মা। যা পরিচালনা করেছেন অবিনাশ অরুণ আর প্রসিত রয় আর নাম দিয়েছেন ‘পাতাল লোক’।

হুট করে একদিন সিবিআই এনোনিমাস টিপসের মাধ্যমে চার সন্ত্রাসী কে ধরে। নিয়ম অনুযায়ী সেটা লোকাল থানার অফিসার কে দায়িত্ব দিয়ে দেয়, এই কেসের ইনভেস্টিগেশন করার জন্য। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় পরে কোন একটা কেইস হাতে পায় হাতিরাম চৌধুরী। এই কেইসটা সলভ করতে পারলেই কোন একটা প্রমোশন বাগিয়ে নেয়া যাবে। শুরু হয় হাতিরামের ইনভেস্টিগেশন আর বেড়িয়ে আসতে থাকে থলের ভেতর থাকা এক একটা বেড়াল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হাতিরাম পারবে এই কেইস সলভ করতে নাকি আর হাজারটা কেসের মতো হারিয়ে যাবে অতলে?

মোটা দাগে বলতে গেলে এই হলো সিরিজের গল্প। তবে এই মোটা দাগের আড়ালে যে কত চিকন চিকন জমজমাট গল্পের লেয়ার লুকিয়ে আছে সেটা সিরিজ না দেখলে কখনোই জানা যাবে না।

একটা সিরিজের মধ্যে যখন আপনি বর্তমান রাজনীতির প্রতীয়ামান দৃশ্য দেখতে পাবেন। যেখানে কিভাবে সিম্প্যাথীর জন্য ভোট ব্যাংক রেডি করা থেকে শুরু করে অপজিশন ঠিক করা হয়। দেখানো হয় কিভাবে ভারতের এক স্টেট থেকে আরেক স্টেটের কন্সপাইরেসি থিওরি কারণে কত কি বদলে যায়। পুলিশের বাইরের দুর্নীতির চেয়ে ভেতরে যে আরো কি কি চলে সেটার উপস্থাপন।

সিরিজে ছোট্ট একটা ডায়লগ আছে, ‘ম্যাঁয় মেরে বেটে কো মুসলমান নেহি বানহে দিয়া, অউর আপলোক উসকো জিহাদী বানা দিয়া।’ ছোট্ট একটা ডায়লগ দিয়েই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আজো ভারতে মাইনোরিটি থেকে কেউ ভালো কিছু করলে সেটার প্রাপ্য সম্মানের বদলে উপহাসের যন্ত্রণা উপহার দেয়া হয়। মুসলিম মানেই জঙ্গী এই ভ্রান্ত ধারনার জন্য সুন্নতে খাতনা কে অন্য অপারেশন নামে চালিয়ে দেয়া। আজো কাওকে গরুর মাংস খেতে দেখলে বমি করা থেকে শুরু করে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীর হাতে হতাহত প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাড়িঁয়েছে। কিছু হলেই ঘটনায় মুসলমান কিংবা পাকিস্থানকে দোষারোপ দেয়া অনেকটা ডাল ভাত বানিয়ে দেয়া। এ সবই উঠে এসেছে।

‘ভবিষ্যতের ভূত’ সিনেমার দৃশ্যে, একটা চরম বাস্তবিক কথা লেখা ছিলো সাংবাদিকতা সম্পর্কে, ‘জার্নালিজম ইজ অর্গানাইজড গসিপ।’ মিডিয়া ম্যানিপুলেশন করে কিভাবে রাতারাতি কি কি করা যায়, সেটা হয়তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মিডিয়ার কাছে সত্যি বা মিথ্যে বলে কিছু নেই। সেখানে ইনফো হলো প্রোডাক্টের মতো, যতটা পলিশ করে অডিয়েন্সের কাছে বিক্রি করা যায়।

এতো সব কিছু যখন একটা সিরিজে পারফেক্টলি ব্যালেন্স করে উপস্থাপন করা হয়। তখন সেটা ইন্ডিয়ার এখন পর্যন্ত হওয়া, বেষ্ট ক্রাইম থ্রিলারের মর্যাদা পাবে এটাই স্বাভাবিক। সিরিজ দেখার সময় কখনোই মনে হবে না জোর করে কোন কিছু চাপিয়ে দিয়েছে। যেনো প্রতিটা চরিত্র তার জায়গায় স্বমহিমায় স্বকীয়তা নিয়ে দাড়িয়ে আছে।

এতো ভালো সিরিজের মধ্যে খারাপ কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেটা সম্ভব না। তবে সিরিজের চিত্রনাট্য এতো দারুণ ভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে যে, ভুল খুঁজে বের করার সময় আপনাকে এই সিরিজ দিবে না খুব একটা। তবে, একটা জিনিস ভাবাচ্ছে, দলিত শ্রেনীকে ইদানীং অনেকে সিরিজ/সিনেমাতে ক্রাইমের আতুঁরঘর হিসেবে দেখানোর একটা টেন্ডেন্সি শুরু হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। এটা কন্টিনিউ হতে থাকলে একটা সময় এটা থেকে পঁচা গন্ধ আসা শুরু করবে। গল্পের প্রয়োজনে, চরিত্রের প্রয়োজনে আসুক তবে গল্পে থাকতেই হবে এমন যেনো মনোভাব না হয়ে যায়। কারণ খোলা চোখে, ট্রেন্ডিং কিংবা রাজনৈতিক ইস্যু অডিয়েন্সের জন্য চটকদার প্রোডাক্ট!

এতোদিন সিনেমা/ সিরিজে ছোট খাটো চরিত্রে অভিনয় করা জয়দ্বীপ আহলাওয়াত এই প্রথম কোন সিরিজের লিড রোলে অভিনয় করলেন। আর এমন ফাটিয়ে অভিনয় করলেন যে পরবর্তীতে অনেকেই তাকে লিডে ভাববেন সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। থিয়েটার থেকে উঠে আসা নীরাজ কবি বরাবরের মতোই দুর্দান্ত।

‘জামতারা’ তে লোকাল সাংবাদিক কিংবা ‘পঞ্চায়েত’-এ বরের বেশে অভিনয় করা আসিফ খানের অভিনয়ের কথা অনেকদিন মনে থাকবে। থানায় যখন তার প্যান্ট খুলে ফেলা হয়, তখন যে তার এক্সপ্রেশন ভুলে যাওয়ার মতো না। এমনকি হাতিরামের টিনেজ বাচ্চা ছেলের চরিত্রে অভিনয় করা ছেলেটাও ফাটিয়ে অভিনয় করেছে। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে বোধহয় অভিষেক ব্যানার্জী নামের কাস্টিং ডিরেক্টর।

ড্রিম গার্ল, স্ত্রী বা অন্যান্য সিনেমায় ছোট খাটো চরিত্র করা এবং বেশিরভাগই কমেডি অভিনয় করা মানুষটা এই সিরিজে যা করে দেখালেন, সেটা এক কথায় অভাবনীয়। ৯ পর্বের সিরিজে গুনে গুনে হয়তো ১০-১২ টা ডায়লগ সে দিয়েছে কিন্তু চোখ, মুখের এক্সপ্রেশন দিয়ে যা করেছেন তাতে অনেক ধুরন্ধর অভিনেতার ভাত মেরে দিবেন বলে মনে হচ্ছে।

ইন্ডিয়ার ওয়েব সিরিজ গুলোর উন্নতি চোখে পড়ার মতো। আর হবেই না কেনো! মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় আপনি যা বলতে পারবেন না, তা অনায়েসেই ওয়েবে বলে দিতে পারবেন। কাজের স্বাধীনতা এখানে ভালই দেয়া হয়। নিজের বলতে চাওয়া গল্প বলা যায়। যেখানে নিজের স্বাধীনতা আর গল্প বলার স্পেস থাকে সেখানে তো এমন ভালো ভালো জিনিস তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক। ‘পাতাল লোক’- তেমনই স্বাধীন ভাবে বলা ভাল একটা নির্মান। একটু বাড়িয়ে এটাকে ভারতের সর্বকালের সেরা ক্রাইম সিরিজও বলা যায়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।