ওটিস গিবসন ও সিন্দাবাদের ভুত

ওটিস গিবসন আজ থেকে আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের বোলিং কোচ। ‘আজ থেকে’ কথাটার উপর জোর দিচ্ছি, কারণ কাল থেকেই প্রত্যাশার চাপটা তার ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভুতের মত চেপে বসবে! কথা ঠিক না বেঠিক, সেটা পাকিস্তান সফর শেষেই মিলিয়ে নিয়েন!

যাই হোক, প্রসঙ্গে আসি। ধরুন, পাকিস্তান সফরে বোলিং ইউনিট খুব ভালো করলো। গিবসনকে ক্রেডিট দেবার লোকের অভাব পড়বে না, আবার খুব খারাপ করলে হুদামুদা কোচের তকমা দেয়া ফ্যানেরও অভাব থাকবে না। এদেশে ফাইনাল এক্সামের মাসখানেক আগে হাউজ টিউটর নিয়োগ দিয়ে রেজাল্ট ভালো /খারাপের সবটুকু দোষ/গুন টিউটরের উপর চাপিয়ে দেবার ইউনিক স্বভাব আমাদের কালচারে পুরনো কিন্তু চলিত রীতি! আমি আশা করি, গিবসন কালচারটা জেনে বুঝেই দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এই কালচারে অ্যাডপ্ট করবার ক্যারেক্টর তার আছে।

একজন ব্যাটিং বা বোলিং কোচের দায়িত্ব কি অথবা কি কি? মোটা দাগে বললে, একটা স্ট্রং ইউনিট দাড় করানো, যারা ম্যাচ সিচুয়েশনের প্রতিটা দিক কভার করে। ডেথ স্পেশালিষ্ট, নিউ বল সোলজার, রান স্টপার সহ আরো বেশ কিছু এলিমেন্ট নিয়ে গঠিত একটা ইউনিট। ধরুন, একজন কোচ দশজন বোলার নিয়ে কাজ করছে একটা পাচজনের ইউনিট তৈরি করতে। সেখানে তার দরকার পড়বে মিনিমাম দু’জন নিউ বল বোলার, মিডল ওভারে রান স্টপার হিসেবে দুই জন, মিডল ওভারে উইকেট টেকার হিসেবে দুই জন এবং ডেথ ওভারে দুই জন স্পেশালিষ্ট।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিউ বল বোলাররাই ডেথের দায়িত্ব নেয়, সেক্ষেত্রে তাদেরকে দুইধারী তলোয়ার বানাতে হবে, আবার অনেক নিউ বল বোলার ডেথে কার্যকর নয়, সেক্ষেত্রে তার কোটা মিডল ওভারেই শেষ করতে হবে এবং রান স্টপারের ভুমিকায় তখন তাকে তৈরি করতে হবে। সো, কাজটা খুব একটা সহজ নয়। বোলার সম্পর্কে হিউজ ধারনা না থাকলে কোচের জন্য ডিসিশন নেয়া টাফ যে, সে কাকে কিভাবে মেক করবে।

এছাড়া প্রতিটি পজিশনে তাকে বিকল্প রাখতে হবে, যেটা আরও কঠিন।

এবার আসি মেকিং প্রসঙ্গে। কোচ চাইলেই রাতারাতি কোন বোলারকে ট্রান্সফর্ম করে ফেলতে পারবে না। বোলারের স্বদিচ্ছা এবং পটেনশিয়ালটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন আমি নিউ বল বোলার, কিন্তু কোচ চাইছেন আমাকে মিডলে ইউজ করা যায় এমন বোলার বানাবেন। এক্ষেত্রে, আমি কতটা আগ্রহী, সেটার উপর নির্ভর করছে কোচ কতটা সফল হবেন। আবার, আমার ন্যাচারালিটি কেড়ে নিয়ে নতুনভাবে আমাকে কতটা গড়ে তুলতে পারবেন এবং সেই ব্যাপারে আমার সামর্থ্য কতটা সেটাও একটা বড় ফ্যাক্ট।

মোদ্দা কথা, বোলারের সামর্থ্য এবং স্বদিচ্ছার উপর পুর্ণ দখল না থাকলে পুরো ব্যাপারটাই লেজে গোবরে হয়ে যেতে বাধ্য। যেমন ধরুন মুস্তাফিজের ন্যাচারাল একশন এবং কবজির পজিশন অনুযায়ী তার ইনসুইং ডেভেলপ করাটা বেশ কঠিন। এখন, কোচ তাকে নিয়ে ইন্সুইং ডেভেলপমেন্ট এর কাজ শুরু করলেন এবং প্রাথমিক ধাপে তার কবজির পজিশন বদল করলেন। প্রথম কথা হচ্ছে, মুস্তাফিজ কি এতে আগ্রহী? দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, এতে কি তার ন্যাচারালিটি নস্ট হবে? সবথেকে বড় কথা হচ্ছে, এদেশের ফ্যানরা কি এতটা ধৈর্যশীল?

প্রথম দুটো ছাড়ুন, তৃতীয়টার ভয়েই প্রথম পয়েন্টে নেগেটিভ উত্তর আসবে। অর্থাৎ, মুস্তাফিজ আগ্রহী নাও হতে পারেন। নিজেকে এই পর্যায়ে এসে ভেঙে গড়তে গেলে যে সময় প্রয়োজন, সেই সময় এদেশের মানুষ মুস্তাফিজকে দেবে না। সো, এক্ষেত্রে একজন কোচ কি করবে? প্ল্যান বি!

যার যার শক্তির জায়গাকে আরও পলিশ করা! বিশদে বললে, ন্যচারালিটি ধরে রেখে, সেটাকে নিখুঁত করা। তবে, র ট্যালেন্ট নিয়ে কাজ করতে কোন মানা নেই। আর, এখানেই একজন কোচের চুক্তির মেয়াদ নিয়ে প্রশ্ন আসে। অলরেডি মেড প্লেয়ার, আর ইন মেকিং প্লেয়ার পুরোটাই ডিফ্রেন্ট। ইন মেকিং একজন বোলারকে ইচ্ছেমত কিলিং মেশিন বানাতে একজন কোচের দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। ৩/৬ মাসের জন্য কাউকে ধরে এনে ভবিষ্যতের জন্য কোন ইউনিট তৈরি করার পরিকল্পনা হাস্যকর। এই যে ভেট্টরিকে ধরে আনছে, কিস্যু হবে না, হুদাই। গিবসনের চুক্তিটা অবশ্য বেশ ভালো, দুই বছর সময় নেহাত কম নয়। একটা ইউনিট স্ট্যান্ডআউট করতে এটা আদর্শ।

স্কিল ডেভেলপমেন্ট বলতে শুধুই বল নিয়ে কারিকুরি বোঝায় না। সিচুয়েশন অ্যাওয়ারনেস, ব্রেইন ইউজিং, রিডিং দ্য ব্যাটসম্যান, রিডিং দ্য কন্ডিশন, এমন অনেক ক্রাইটেরিয়া স্কিলের অন্তর্ভুক্ত। এবং সরি টু সে, উপরে উল্লেখিত প্রায় প্রতিটা পয়েন্টের কমতি আছে আমাদের বোলারদের ভেতর। গিবসন আশা করি এগুলো নিয়ে কাজ করবেন।

পরিশেষে, জাতীয় দলে একজন ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট নিয়োগ দেয়া জরুরী, যার কাজ হবে ইংলিশ লিসেনিং এন্ড স্পিকিং এর উপর প্রতিদিন একটা সেশন করা। যদিও এটা আমার একান্তই পার্সোনাল ধারনা, তবে কমুনিকেশন গ্যাপের কারনে অনেক কিছুই শেখা শেখানো সম্ভব হয় না।

অবশেষে, গাছ লাগিয়েই ফলের আশা করবেন না প্লিজ। শেষের এই বাক্যটা শুধু শুধু লিখলাম, আমি নিজেও বরই গাছ লাগিয়ে প্রতিদিন সকালে চেক করতাম বরইয়ের ফুল ফুটছে কিনা!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।