গুজরাটের মঞ্চে আলো ছড়াচ্ছেন বাংলাদেশের অরণী

ভারতের জি বাংলায় প্রচারিত ‘সারেগামাপা’ অনুষ্ঠানে ঢাকার ছেলে মঈনুল আহসান নোবেলের জনপ্রিয়তা পাওয়ার খবরটা এতদিনে সবাই কম বেশি জেনে গেছে। তবে, ভারতের আরেকটি রাজ্যে বাংলাদেশের মেয়ে অরণীর মঞ্চ কাঁপানোর খবরটা এখনো অধিকাংশেরই অজানা।

ভারতের গুজরাট রাজ্যের বাণিজ্যিক রাজধানী আহমেদাবাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলনায়তনে সদ্যই শেষ হল ভারতের ১৪ তম জাতীয় নৃত্য উৎসব। গেল ২৬ অক্টোবর এই উৎসবের তৃতীয় ও শেষ দিনে ভরতনাট্যম নৃত্য পরিবেশন করেন বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পী অরণী ভক্ত। অরণী বর্তমানে ভারতীয় সরকার প্রদেয় আইসিসিআর স্কলারশিপ নিয়ে উপমহাদেশের প্রখ্যাত বারোদার মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের (এমএসইউ) পারফরমিং আর্টস ফ্যাকাল্টির অধীনস্ত ভরতনাট্যম নৃত্য বিভাগে স্নাতক সম্মান নিয়ে পড়ছেন। নৃত্য উৎসবে তিনি মূলত বাংলাদেশ ও আইসিসিআরের প্রতিনিধিত্ব করেন। এদিন তিনি দুটি নৃত্য পরিবেশন করেন। প্রথমটি ছিল গণেশবন্দনা আর শেষটি ছিল তিল্লানা।

উৎসবের অতিথি হয়ে আসা বিখ্যাত নৃত্যগুরু ও সমালোচকরা এই নৃত্যশিল্পীর নাচের ভূঁয়সী প্রশংসা করেছেন। পদ্মশ্রী ড. সুনীল কোঠারি, কলাগুরু লক্ষ্মীবেন ঠাকুর, এসডি দেশাই, ভিরাজবেন ভাট, উমা অনন্তানির মতো বিখ্যাত নৃত্যগুরুরা এদিন উপস্থিত ছিলেন।

উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে আসা নৃত্য সমালোচক ড. অপর্ণা পাঞ্চোলি অরণীর নৃত্য বিষয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অরণী ভক্ত দারুণ নৃত্যশিল্পী। তাঁর পরিবেশনাকে দর্শকরা বেশ কয়েকবার করতালির মাধ্যমে অভিনন্দিত করেছেন। তিনি খুবই ভালো নেচেছেন এবং বলা যায়, নিজের নৃত্যগুণাবলীকে দারুণ হৃদয়ঙ্গমতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন।’

এই নৃত্যগুণের কারণেই বাংলাদেশের মেয়ে অরণী স্থানীয় গণমাধ্যমেও স্থান করে নিচ্ছেন বারবার। অরণী এর আগেও গুজরাটের বিভিন্ন মঞ্চে ভরতনাট্যম পরিবেশন করে প্রশংসিত হয়েছেন। গত মার্চে গুজরাটের গণপত বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়া সাংস্কৃতিক উৎসবে (সাউফেস্ট) বাংলাদেশ-আইসিসিআরের পক্ষে অংশ নেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকে স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট, ফরেইনার রিজিওয়ানাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও), ২০১৮ সালের বিশ্ব নৃত্য দিবসে আহমেদেবাদের জেজি পারফরমিং আর্টস কলেজের আয়োজনে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি নৃত্য পরিবেশন করেছেন।

অরণীর নৃত্যযাত্রা শুরু হয় মূলত বাংলাদেশেই। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ছয় মাস তিনি নাচ শেখেন ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন পরিচালিত ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে। এর কিছু দিন পরেই, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের স্বনামধন্য নৃত্যশিল্পী লুবনা মারিয়াম পরিচালিত ‘সাধনা সাংস্কৃতিক মণ্ডলে’র শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর প্রকৃত নৃত্যজীবন শুরু করেন।

এখানে তাঁর সরাসরি নৃত্যগুরু হলেন অমিত চৌধুরী এবং আহমেদাবাদের নৃত্য উৎসবে পরিবেশিত অরণীর দুটি নাচই তাঁরই শেখানো। সাধনায় নৃত্যশিক্ষা চলাকালীনই ২০১৭ সালে আইসিসিআরের স্কলারশিপ পাওয়ার সৌজন্যে তিনি এমএসইউতে পড়ার সুযোগ পান। সম্প্রতি দেশে তিনি সাধনার নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষার্থী হিসেবে লুবনা মারিয়ামের পরিচালনায় ও অমিত চৌধুরীর নির্দেশনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাটমণ্ডলে’ রঙ্গশ্রী ২০১৮-তেও নেচেছেন। যে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এসেছিলেন পদ্মশ্রী ড. সুনীল কোঠারি। আহমেদাবাদের এই উৎসবেও অরণীর নৃত্যের প্রশংসা করে উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই নৃত্যগুরু বলেন, ‘এতো অল্প সময়ে নাচ শিখে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মঞ্চে নেচে যাওয়াই অরণীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

স্থানীয় গণমাধ্যমে অরণী

গোপালগঞ্জের মেয়ে অরণী পিতার চাকুরিসূত্রে ঢাকায় জন্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন। একটা সময় এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ হয়েছে নৃত্যও। নিজের নৃত্য পথযাত্রা সম্বন্ধে অরণী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই নাচের ব্যাপারে আমার আগ্রহ। কিন্তু, প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা শৈশব-কৈশোরে ছিল না, যেটা থাকলে হয়তো আরও এগোনো যেত। বাংলাদেশের মতো দেশে নৃত্যশিল্পী হতে চাওয়াটা তো একটা কঠিন স্বপ্নের পেছনে ছুটা মূলত। পরিবার-সমাজ কোন না কোনভাবে নাকচ করবেই। হয়তো সে কারণেই এ পথে স্বাধীনভাবে আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে।’

নৃত্য হিসেবে ভরতনাট্যমকে কেন পছন্দ? – এমন প্রশ্নের জবাবে অরণী বলেন, ‘ভরতনাট্যমের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল। যখন বুঝলাম, শখ করে নাচা আর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধ্রুপদী নৃত্য শেখার মধ্যে আকাশ-মাটির পার্থক্য, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ধ্রুপদী নৃত্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন বিকল্পই নেই। তো কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে চলে এসেছি বলা যায়, এমন সময়ে সাধনার পথ বেছে নিলাম। ঢাকাস্থ ইন্দিরা গান্ধী কালচার সেন্টারে কিছুদিন শিখে, মূলত সাধনায় শুরু করলাম প্রকৃত সাধনা।’

বিশ্ব নৃত্য দিবস ২০১৮-তে অরণী ভক্তের হাতে স্মারক সম্মাননা তুলে দিচ্ছেন আইসিসিআর গুজরাটের আঞ্চলিক পরিচালক সুভাষ সিং।

তিনি আরো বলেন, ‘সেখান থেকে বারোদার বিখ্যাত মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্কলারশিপের জন্য যখন আবেদন করেছিলাম, তখন দেখলাম আবেদনপত্রে পছন্দক্রম অনুযায়ী তিনটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়; আমি ঝুঁকি নিয়ে পছন্দ একটিই দিয়েছিলাম— ভরতনাট্যম। আবেদনপত্রের সঙ্গে নিজের পারফরম্যান্সের যে ধারণকৃত ভিডিও পাঠাতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের বিবেচনার জন্য, সেখানেও শুধু ভরতনাট্যমই নেচেছিলাম। ভরতনাট্যম যদি পাই, তাহলেই কেবল ভারত সরকারের বৃত্তি নেব, নতুবা নয়।’

বাংলাদেশে ভরতনাট্যমকে আরো এগিয়ে যেতে চান অরণী। তিনি বলেন, ‘আমি এখনও অতি ক্ষুদ্র এক শিক্ষার্থী। প্রতিনিয়ত শিখছি। কোন একদিন বাংলাদেশে ভরতনাট্যমকে একটি শিল্প হিসেবে আরও এগিয়ে নিতে পারলে এই শেখা ও সাধনা সার্থক হবে।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।