নান্না বিরিয়ানি: কোনটা আসল! কোনটা নকল!

ঢাকার সবচেয়ে ‘আইকনিক’ খাবার কোনটি? – এমন একটা তালিকা করলে সবার আগেই থাকবে বিরিয়ানির নাম। আর রসনাবিলাসী ঢাকার জনগোষ্ঠীর জন্য বিরিয়ানির অপর নাম হল হাজী নান্না বিরিয়ানি।

তবে, সমস্যা একটাই, ঢাকায় তো বটেই, ঢাকার বাইরেও এখন ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে নান্না বিরিয়ানি। কোনটা আসল? নকলই বা কোনটা? আলাদা করবেন কি করে?

প্রথম কথা হল ঢাকার বাইরে হাজী নান্না বিরিয়ানির কোনো শাখা নেই। আর ঢাকার মধ্যে এর শাখা আছে আটটি। সেগুলোর ঠিকানা হল –

  • ৪১ নং বেচারাম দেওরী (সরদার ভবন)
  • নাজিম উদ্দিন রোড (চানখারপুল)
  • লালবাগ (শাহী মসজিদ সংলগ্ন)
  • নবাবগঞ্জ
  • মা ভিলা (বেনারসি পল্লি), মিরপুর-১০
  • এ্যলিফেন্ট রোড
  • নুরুননেছা ভিলা, সেকশন-৬, ব্লক-খ, বাউন্ডারী রোড, মিরপুর
  • সাভার বাসস্ট্যান্ড

তবে, নান্না বিরিয়ানির সত্যিকারের স্বাদ পেতে হলে পুরান ঢাকার ৪১ নং বেচারাম দেওরীতে (সরদার ভবনে)। সেখানে ঠিক আগের মতই দেশি মোরগ, দেশি চিনি গুঁড়া পোলাও চাল, দেশি মশলা ব্যবহার হয়ে আসছে। এখানে মোরগ পোলাও, খাসির বিরিয়ানি, খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি, খাসির রেজালা, ফিন্নি টিকিয়া ও বোরহানি পাওয়া যায়।

হাজী সিরাজুল ইসলাম নান্না মিয়া

নান্না বিরিয়ানির জনক হাজী সিরাজুল ইসলাম নান্না মিয়া। নান্না মিয়ার বাবা ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। তাই, শৈশবেই সংসারের হাল ধরতে নান্নাকে। প্রথমে তিনি পাতার বিড়ি বানাতেন। প্রতিদিন দেড় টাকা আয় হত। এরপর তিনি হোটেলের কাজ নেন, মাওলানা দ্বীন মোহাম্মদ সাহেবের খাদেম হন।

দ্বীন মোহাম্মদ সাহেবই নান্নাকে বাবুর্চি হওয়ার উৎসাহ যোগান। নান্না তখনকার ঢাকার বিখ্যাতা পেয়ারা বাবুর্চির অধীনে রান্নার কাজ শেখা শুরু করেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে নান্না বাবুর্চির কাজ শুরু করেন ১৯৫২ কি ১৯৫৩ সালে। তখন ঢাকার মৌলভীবাজারে সর্বপ্রথম মোরগ পোলাও বিক্রি করতেন।

বাসা থেকে কয়েকটা মোরগ আর এক হাঁড়ি পোলাও নিয়ে বসতেন ছোট্ট একটি দোকানে। চাটাইয়ে বসে খেত লোকজন। প্রতি প্লেটের দাম ছিল দুই টাকা। সে সময় মোরগ পোলাওয়ের সঙ্গে আলাদা কোনো ঝোল দেওয়া হতো না। শুধু পোলাও ও রোস্টের সঙ্গে থাকত সুস্বাদু ঝোল। ভোজনরসিক পুরান ঢাকার মানুষদের মধ্যে নান্নার রান্নার সুনার ছড়িয়ে পড়ে।

কালক্রমে নান্না বেচারাম দেওরীতে দোকান দেন। সেটা ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সালের কথা। আজো সেই ঠিকানা টিকে আছে। এখানেই বিক্রি হয় নান্না মিয়ার বিখ্যাত মোরগ পোলাও। সকাল সাতটা থেকে রাত ১১ টা – রোজ পাওয়া যায় বিরিয়ানি।  এখন দোকানটিতেও এসেছে পরিবর্তন। চাটাইয়ের জায়গা নিয়েছে চেয়ার টেবিল। খাবারের স্বাদেও এসেছে পরিবর্তন।

৮০ বছর বয়স পর্যন্ত নিজ হাতেই রান্না করতেন বাবুর্চি নান্না মিয়া। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর বর্তমানে নান্না মিয়ার ছেলে হাজি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এই ব্যবসাটি চালিয়ে আসছেন।

আটটি শাখা বাদে এই ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানির দোকানের আর কোনো শাখা নেই। কোথাও – অরিজিনাল নান্না বিরিয়ানি, নিউ নান্না বিরিয়ানি ইত্যাদি নামের দোকান পেলে সেটাকে নান্না বিরিয়ানির শাখা বা ফ্র্যাঞ্চাইজি বলে ভুল করবেন না, নান্না বিরিয়ানির স্বাদ পাওয়া তো দূরের কথা। এমনকি মাঝে মধ্যে বানিজ্য মেলাতেও যে নান্নার বিরিয়ানির দোকান দেখা যায়, সেটাও ‘অরিজিনাল’ নয়। আসল-নকলের পার্থক্য করুন, প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকুন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।