কার্যকর ফলাফলহীন এক জ্ঞানগর্ভ বিশ্লেষণ

অপু ভাইয়ের গ্রেফতার নিয়ে আলাপগুলো ক্রমে আবুল কালাম আজাদ অভিনীত ‘বামরুল’ নাটকের মত হয়ে যাচ্ছে। শ্রেণী পার্থক্য, সাবঅল্টার্ন- জাতীয় পরিভাষায় অপু আজ নিপীড়িত নিম্নজীবিদের প্রতীক হয়ে গেছে। এতদিন যদিও এসব শোনা যায়নি।

আলাপকারীদের করা বিরাট একটা অভিযোগ দেখলাম, তাদের কথা নাকি নাটকে সিনেমায় উঠে আসে না। চায়না মোবাইলের ওসব ভিডিওতে উঠে আসে। তাদের কথা কি ভাই, ‘আজকালকার মেয়েরা চিটিংবাজ’- এসব? কিংবা একই ভিডিওতে মাকে সম্মান দেয়ার কথা বলে প্রেমিকার রোল প্লে করা মেয়ের গায়ে হাত তোলার এক্ট? নাকি সংসারে চাল ডালের জন্য টাকা না দিয়ে সেই টাকা দিয়ে চুল স্ট্রেইট, কালার করে এসব আধুনিকতার মোহে গা ভাসানো?

যারা আজ ল্যাপটপ, মোবাইলে ভাল সফটওয়্যারে বাংলায় মহান উদারচিন্তার লেখা দিচ্ছেন, আমি বলব তারা এদের চিনেনই না।

আমাদের খেলার সাথীদের একটা বড় অংশ ছিল এসব বস্তিতে বাস করা ছেলেমেয়েরা। আর এটি নিয়ে আমাদের অভিভাবকরাও বেশি চিন্তিত ছিলেন বলে মনে হতো না। তো যখন হঠাৎ করে ডিশের প্রভাব বেড়ে গেলো আর আমরা সবাই বয়ঃসন্ধিতে পড়লাম, দেখা গেলো তারা দেব অমুক সিনেমাতে এমন গেঞ্জি পরে নেচেছে, এমন ব্লেজার পরে এই সেই করেছে, তাই তাকেও এটা কিনতে হবে- এরকম একটি ধারায় মাতছে। আমাদের স্কুলের সামনেই ছিল কমদামী কাপড়ের হকার্স মার্কেট।

সেখানে এরকম ছেলেদের ভিড় লেগেই থাকতো। কিন্তু কম দামী হলেও একশ-দেড়শ-দুশো টাকা খরচ তো হতোই। আর তা নিয়ে বস্তির ঘরগুলোতে হতো অশান্তি। তাদের মায়েরা চিল্লাতো। বাবাটা ভ্যান চালিয়ে যা পায় তা উড়িয়ে আসে নেশার আড্ডায়, আর ছেলেও ধরেছে এসব উটকা খরচ। মা-টির বুয়ার কাজ করা আরো বাড়ে সংসার চালানোর জন্য। যেসব বাবা ভাল, তারা মসজিদের হুজুরের কাছে গিয়ে বলতো একটু বুঝানোর জন্য। অথচ তার আয় অনুযায়ী জামা কাপড় আছেই। বাড়তি ওসব, স্রেফ অনুকরণপ্রিয়তার জন্য, কোন দরকার ছিল না।

আপনি যদি চোখ কান খোলা রাখেন তাহলে দেখবেন আশেপাশে এখন অপু ভাইদের ধরনে চুলের ওরকম বিশেষ কাট, রং করা বেড়ে গেছে। সেদিন ঢাকা গেলাম, বাসে দেখি অমন চারজন, হাতে তালুর চেয়েও বড় মোবাইল অথচ ভাড়ার পাঁচ টাকা নিয়ে তুমুল খেঁচাখেঁচি। আমি একজনকে বললাম, আপনারা মাস্ক ছাড়া কেন?, তারা বলল, সেলফি তুলতাছি এজন্য।
কী অবস্থা!

সেদিন সাইকেল চালিয়ে স্থানীয় এক চা বাগানের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, বুধবার ছিল, আর বুধবারে সব বাগানের বেতন হয়। এক মোড়ে দেখি প্রবল ঝগড়া। এবং সেখানেও একজন চুলে কালার করা, রংচঙে জিন্স পরা। কাছে গিয়ে জনতাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম দুই ভাইয়ে ঝগড়া। বড় ভাই বেতন পেতেই ছোট ভাই এসে টাকা দিতে জোরাজুরি করছে।

বড় ভাই বলছে এসব সে উটকা খরচ করবে, নিজে যেন গতর খেটে কামাই করে- ইত্যাদি। কিন্তু ছোট ভাই আবার মুখের উপর ‘এসব কামলাগিরি’ সে করবে না বলে বড় ভাইকে ধাক্কা মেরে চলে গেলো। বড় ভাই দৌড়ে মারতে যেয়েও বাকিদের আটকানোতে পারলো না। এখন একজন চা শ্রমিক দৈনিক ১০২ টাকা মজুরিতে সপ্তাহে ৭২০-৩০ টাকা পায়। নানা সংস্থা এদের দেশি মদে টাকা নষ্ট করা কমিয়ে বাচ্চাদের পড়ালেখা, ছাগল পালন এসবে বিনিয়োগ করার জন্য শেখাচ্ছে।

কিন্ত, এই আধুনিকতার মোহগ্রস্ত হবার থেকে পরিত্রাণ কী? আমার মনে পড়লো আমাদের সাথে খেলা করা আচার বিক্রেতা সোহেল কীভাবে কয়েকদিন এসব ফুংফাং করে পরে আর টানতে না পেরে চট্টগ্রাম শহরে পালিয়েছিল, সেখানেও নাকি ফল বিক্রি করে, কিন্তু পরিচিত কেউ তো দেখছে না। – এটাই সান্ত্বনা।

আর তাদের কথা বেঁচেই তো আপনি সিনেমা করে ভেনিস, কান, বুসানে তা নিয়ে যান। এসি রুমে বসে সমবেত স্বরে চুকচুক করেন। আহারে কী কষ্ট এসব নিপীড়িত লোকের! সেই সিনেমা দেশের প্রান্তিক অঞ্চল কি, কামরাঙ্গীরচর বস্তিতে অবধি যায় না তো কী হয়েছে! প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ন্যাশনাল এওয়ার্ড তো পাচ্ছে, প্রগতিশীলদের থেকে ‘গুড জব’ এর থাম্বস আপ পাচ্ছে, এটাই অনেক! আর দায়িত্ব কী।

এই গেলো একটি সমস্যা।

অপরটি আমার মতে, এসব নিম্নজীবী সমাজের বিনোদন মাধ্যম কখন হয়ে উঠলো? একসময় তো শুনতাম এসব বাগদী, হাঁড়িয়া, ডোমেরা মাদল বাজিয়ে কীর্তন করতো। পুঁথি পড়তো। ক্রমে ভিসিআর আনিয়ে সিনেমা দেখা শুরু হলো। যে সিনেমা মধ্যবিত্ত দেখতো, সে সিনেমা তারাও দেখতো।

রাজ্জাকের ‘হৈ হৈ রঙিলা’ বা ‘আয়নাতে ঐ মুখ’ অথবা জাফর ইকবালের ‘ভেঙেছে পিঞ্জর’ বা ‘আমি এত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ফারুকের ‘সব সখীরে পার করিতে’- গানগুলো তো স্কুলের জুনিয়র শিক্ষকটি থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা সবার মুখস্থ ছিল। সেই রুচিটা আলেকজান্ডার বো-তে অধঃপতিত হলো কী করে? একসাথে ভিড় করে আসাদুজ্জামান নূরের ‘বাকের ভাই’ দেখতো যারা, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের বিনোদনের মাধ্যম কেন হাবিজাবি কথা বলার টিকটক?

আর তা কেন আমাদের নিপীড়িতের উছিলায় মেনে নিতে হবে?

কথা উঠতে পারে, আমরা তাদের জন্য কী করেছি? ভাই, ইন্টারনেটে যখন লাইকি টিকটক করতে পারছে তখন ইউটিউবে ভাল কন্টেটগুলো কি খুঁজে বের করতে পারে না এরা? সবই পারে। একই ব্যক্তি তাপস পাল ‘রাজার মেয়ে পারুল’ও করেছে আবার ‘তিল থেকে তাল’-ও করেছে।

আপনাকে কি এখন সেটিও গিলিয়ে দিতে হবে? আর কেউ যদি শুধরাতে না চায়? তাহলে কী করা? এইতো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমণ্ডলে মাঝেমাঝে এত সুন্দর নাটক হয়, কজন যাই আমরা? কিংবা টিএসসিতে মাত্র ত্রিশ টাকার টিকেট দিয়ে যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে সংসদের ছেলে মেয়েরা?

প্রসঙ্গত, ড. মাহফুজুর রহমান বা সিনেজগতে জায়েদ খান, সায়মনরাও যথেষ্ট বিরক্তিকর। তারা যদি এমন মারামারি বা গ্যাং কালচার পুষতেন, তাহলে আমি নিজে তাদেরও শাস্তি দাবি করতাম।

আর সে নোয়াখাইল্লা বলেই যে এতটা ঘৃণার স্বীকার হচ্ছে তাও মনে হয় না। একটা ভাল মানুষ গিয়ে সে জায়গায় যদি বলে ‘আমি নোয়াখাইল্লা। আন্নেগোর হবরদবর কিয়া? চলের নি ভালা?’ – তাহলে তো কেউ মারতে আসে না। উত্তরা সেক্টর ৮-এ চলুন একটা পরীক্ষা হয়ে যাক।

ফেসবুকীয় এসব বিতর্ক দেখে মোদ্দা কথায় আমার যা মনে হচ্ছে, অপু ভাই, মামুন ভাই এতদিন বাইরেই ছিল। আজ এত কথা বলা প্রগতিশীলদের কেউ তাদের কাছে যায় নাই। কে জানে হয়তো নিজেরাই হাসছে। এই ফাঁকে আমাদের মত প্রতিক্রিয়াশীলরা তার কাছে পৌছে গেছে আর যা প্রতিক্রিয়াশীলতার ধর্ম, ধর তক্তা মার পেরেক, তাই করে দিছে। এখন অ্যাজ ইউজুয়াল শুরু হয়ে গেছে একটা জ্ঞানগর্ভ হাউকাউ৷ যার আসলে কোন কার্যকর ফলাফল নেই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।