ওপেনিংয়ের মধুর সমস্যা বনাম বাস্তবতা

প্রাথমিক উচ্ছ্বাসে আপত্তি নেই। সাফল্য উদযাপন করা জরুরী। তবে উচ্ছ্বাসের জোয়ার বয়ে গেলে বা তাতে ভেসে গেলে সর্বনাশ। দিনশেষে, প্রতিপক্ষ ছিল জিম্বাবুয়ে। বোলিং আক্রমণ ছিল একদমই নখদন্তহীন।

রান এসেছে, সেঞ্চুরি হয়েছে, রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলা চলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের টপ অর্ডার নিয়ে স্বস্তি ফিরেছে। তবে উচ্ছ্বাসটুকু পাশে সরিয়ে ভাবনার গভীরে যদি যাই, আমি দেখি, এই স্বস্তি সাময়িক। ইমরুল, লিটন ও সৌম্যর সত্যিকার পরীক্ষা সামনের দিনগুলোতে। প্রতিপক্ষ যখন আরও কঠিন, চ্যালেঞ্জ থাকবে আরও শক্ত, চাপ হবে প্রবলতর। সামনের সময়টুকু নিয়ে আমার কৌতুহল আছে, রোমাঞ্চ আছে। উৎকণ্ঠাও কিছু আছে।

অবশ্যই এই সিরিজে ইমরুলদের সাফল্যকে খাটো করছি না। বড় ইনিংস খেলা, ধারাবাহিকভাবে রান করা, এসব অভ্যাসের ব্যাপার। অভ্যাসটা গড়া জরুরি। আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সামর্থ্যের সীমানা বাড়ে এসবে। ইমরুল, লিটন, সৌম্যদের টেকনিক্যাল সামর্থ্যের পরীক্ষা নেওয়ার মতো বোলার জিম্বাবুয়ের ছিল না। তবে আমার ব্যক্তিগত দারুণ লেগেছে ইমরুলের ফিজিক্যাল ও মেন্টাল সামর্থ্যের উন্নতি। ভালো লেগেছে শরীরী ভাষা।

পরীক্ষাটা বেশি ছিল নিজেদের সঙ্গে। ইমরুল তাতে প্রায় শতভাগ নম্বর পাচ্ছেন। সৌম্য পাচ্ছেন। লিটনের বড় সুযোগ ছিল দু-একটি সেঞ্চুরি বাড়নোর। পারেননি। শুরুর নড়বড়ে ভাবটা কাটাতে হবে তার। অনেক কিংবদন্তি ওপেনারই শুরুতে নার্ভাস থাকতেন। এমনকি আমাদের তামিমও নার্ভাস থাকে ১২-১৫ বল, প্রতিবারই। নিজেই বলেছেন অনেকবার। কিন্তু তামিমরা সেটা ফুঠে উঠতে দেন না ব্যাটিংয়ে বা শরীরী ভাষায়। সেই টেম্পোরামেন্ট লিটনকে আয়ত্ত করতে হবে।

ফ্লিক তার প্রিয় শট, খেলেন দারুণ। কিন্তু কখন ফ্লিক করব আর কখন সোজা ব্যাটে কিংবা অন ড্রাইভ, বুঝতে হবে। আমাদের চেয়ে তিনি ভালো বুঝবেন অবশ্যই। যাহোক, টিকে গেলে কতটা নান্দনিক হতে পারেন, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে আবার দেখিয়েছেন। সিরিজ খুব ভালো না কাটলেও ওই ইনিংস নিশ্চিত করেছে, লড়াই থেকে দূরে ছিটকে যাননি লিটন।

তবে যেটা বললাম, মূল পরীক্ষা ছিল নিজেদের সঙ্গে। কারণ, প্রতিপক্ষের সেই পরীক্ষা নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। কাইল জার্ভিস ছাড়া কোয়ালিটি বোলার নেই আর একজনও। প্রতি ওভারেই বাজে বল এসেছে। এত বেশি ‘রুম’ দিয়েছে ওদের বোলাররা, প্রেসবক্সে আমরা মজা করে বলছিলাম যে জিম্বাবুয়েতে আর কোনো রুম বাকি নেই। সব দিয়ে দিয়েছে আমাদের ব্যাটসম্যানদের। স্পিন আক্রমণও ভালো ছিল না। এত বাজে বল হলে চাপ থাকে না। চাপ না থাকলে ব্যাটসম্যাদের পরীক্ষা হয় না।

চট্টগ্রামের দুই ম্যাচে তদের অবস্থা আরও করুণ হয়েছে পরে বোলিং পাওয়ায়। এত বেশি শিশির পড়ে, এই সময়টায় চট্টগ্রামের দুই ইনিংস আসলে দুই রকম। পরে বোলিং করা দলের প্রতি খুব আনফেয়ার হয়ে যায়। এমনিতেই স্কিল নেই তাদের, আরও জেরবার অবস্থা শিশিরে। ইমরুল-সৌম্যদের খুব কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়নি।

আমি কৌতুহল নিয়ে সামনে তাকিয়ে এই কারণেই। সামনের পরীক্ষা হবে কঠিনতর। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আমরা তাদের মাটিতে হারিয়ে এসেছি কিছুদিন আগে। এই কন্ডিশনের জন্য ওদের বোলিং আক্রমণও খুব ধারাল নয়। তবে তার পরও আলজারি জোসেফের গতি আছে, কেমার রোচের গতি-স্কিল দুটোই আছে, জেসন হোল্ডার খুবই স্কিলফুল, আন্ডার লাইটস স্কিডি। দেবেন্দ্র বিশু, অ্যাশলি নার্সরা ভয়ঙ্কর ওয়ানডে স্পিনার নয় অবশ্যই, তবে যথেষ্টই কার্যকর নিজেদের দিনে। জিম্বাবুয়ের চেয়ে পরীক্ষা তাই অনেক অনেক কঠিন হবে।

এরপর আছে নিউ জিল্যান্ড সিরিজ। ইংল্যান্ডের মতো অতটা ব্যাটিং স্বর্গ না হলেও ওয়ানডেতে নিউ জিল্যান্ডেও বেশ ভালো ব্যাটিং উইকেট থাকে সাধারণত। কন্ডিশন ইংল্যান্ডের চেয়ে কঠিন। বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের একটি ভালো প্রস্তুতি হতে পারে সেই সিরিজ। টিম সাউদি, ট্রেন্ট বোল্ট ফণা তুলে থাকবেন ছোবল দিতে। পরীক্ষা হবে সেখানে আরও কঠিন। সেই পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত কে টিকে থাকতে পারেন, কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষায় থাকব সেটির।

লড়াইটা যেভাবে জমে উঠেছে, আমার রোমাঞ্চ সেটি ঘিরেই। চ্যালেঞ্জ অবশ্যই সামনে কঠিন। তবে ইমরুল, লিটন, সৌম্যর এই উপলব্ধি হয়ে ওঠার কথা, টিকতে হলে পারতে হবে। এছাড়া উপায় নেই। ইমরুল যে উন্নতি ছাপ রেখেছেন, সেখান থেকে আরও উন্নতি করতে চাইবেন। লিটন-সৌম্যরা আশা করি বিনা নির্বাচক, টিম ম্যানেজমেন্টের কাজ কঠিন করে তুলবেন ইতিবাচকভাবে। তিনজনের প্রত্যেকের আলাদা শক্তির জায়গা আছে। সেসব আরও কতটা শাণিত করতে পারেন, আরও কত কিছু যোগ করতে পারেন, রোমাঞ্চ সেসব নিয়েই।

আর উৎকণ্ঠা আসলে একটি শঙ্কা থেকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের শুরু থেকেই তামিম থাকবেন সব ঠিক থাকলে। তার সঙ্গী হিসেবে এখন সম্ভাব্য তিনজন বিকল্প আছে। একজন বেছে নেওয়ায় যথেষ্ট প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, সাহসিকতার প্রশান দিতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। তার পর যাকে বেছে নেওয়া হবে, তাকে সাপোর্ট দেওয়ায় দেখাতে হবে গাটস।

ধরুন, ইমরুলকে বেছে নেওয়া হলো তামিমের পার্টনার হিসেবে। দুটি ম্যাচে ব্যর্থ হলেই চারদিকে কথার ঢেউ ছড়াবে, ‘জিম্বাবুয়ে বলেই পেরেছে, আসলে চলে না।’ কিংবা সৌম্যকে খেলানো হলো। ব্যর্থ হলে একই কথা হবে, ‘জিম্বাবুয়ের লোপ্পা বোলার পেয়েই মেরেছিল। আসলে যে লাউ সেই কদু।’ কিংবা লিটন খেললেন, এক-দুই মাচ ব্যর্থ হলেই ঝড় উঠবে, ইমরুল-সৌম্যকে বসিয়ে রেখে লিটন কেন?

বাইরের আলোচনা যতোই তীব্র থাকুক, সমস্যা নেই। তবে টিম ম্যানেজমেন্ট যদি সেই তীব্রতা দুলে যায়, তাহলেই বিপদ। আবার পুরোনো চক্করে পড়ে যাবে দল। তাতে আম-ছালা, লিটন-সৌম্য-ইমরুল, সব চলে যেতে পারে। টিম ম্যানেজমেন্টের প্রজ্ঞা আর গাটসের কথা বলছিলাম সেখানেই। একজনকে বেছে নেওয়ায় তাদের স্পট অন হতে হবে। যাকে বেছে নেওয়া হবে, তাকে দুই-তিন ম্যাচের ব্যর্থতায় ছুঁড়ে না ফেলার সাহস দেখাতে হবে। নিউ জিল্যান্ড সফর শেষ নাগাদ যেন তামিমের বিশ্বকাপ সঙ্গী নিশ্চিত হয়ে যায়।

জিম্বাবুয়ে সিরিজে টপ অর্ডারের সাফল্যটায় আসলে মিশে আছে সিদ্ধান্তের শুরু। শেষ নয়। তামিমের সঙ্গী পাওয়া ইঙ্গিত, সমাধান নয়। লড়াই এখন সারভাইবাল অফ দা ফিটেস্ট। সেই লড়াইয়ের জন্য ওদের তিনজনকে যেমন প্রস্তুত হতে হবে স্কিল দিয়ে, টিম ম্যানেজমেন্টেরও প্রস্তুত থাকতে হবে, ভাবনার গভীরতা নিয়ে।

সাকিব ফিরলে তিনে খেলবেন ধরে নিয়েই ওদের তিনজনকে শুধু ওপেনিংয়ের লড়াইয়ে রেখেছি। সৌম্যর জন্য সাত একটা অপশন হতে পারে বটে, তবে আমি খুব একটা নিশ্চিত নই ওই পজিশনে ওর ব্যাটিংয়ের সম্ভাব্য কার্যকারিতা নিয়ে। সেই আলোচনাও ভিন্ন। আপাতত তামিমের সঙ্গীতেই থাকছি।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।