মাশরাফির কাছে খোলা চিঠি

প্রিয় কৌশিক,

তোমার সাথে প্রথম পরিচয় সেই ২০০১ সালের নভেম্বরের এক বিকেলে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টের প্রথম দিন। সেই বিকেলে যা হলো তা আমাদের ক্রিকেট রূপকথার এক অংশ। ওই সময় বয়স খুব কম ছিলো আমার এমন অনেক ছোট ভাইকেই ওই বিকেলের গল্প আমি বলেছি অনেক বার।

তবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ওই বিকেলে যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম ঠিক সেইরকম স্বপ্ন পূরণ তোমাকে নিয়ে হতে দেয়নি পরবর্তীতে তোমার একের পর এক ইনজুরি। ভেবেছিলাম যে, টেস্টে তুমি হবে দুর্দান্ত এক আতংক প্রতিপক্ষের কাছে। কিন্তু ইনজুরি তোমার টেস্ট ক্যারিয়ারই শেষ করে দিয়েছে এক দশক আগে।

এরপরেও আমাদের অন্য আশা পূরণ করে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পেসার তুমি। আজ এই মুহূর্তে তুমি অদ্ভূত এক সমস্যায়। আর এক ম্যাচের ব্যবধানে দেখে ফেলেছো বাঙালির চিরকালীন অকৃতজ্ঞ চেহারা। ফর্মটা খারাপ যাচ্ছে দুই ম্যাচে। অসংখ্য মানুষ দাবি করছে তোমাকে দল থেকে বাদ দেয়ার। চ্যাম্পিয়ন হতে চাওয়া এই দলে তুমি নাকি বেমানান!

অথচ সবাই ভুলে গেলো কি সহজে যে,আজ এই যে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা ভাবছে,এই স্বপ্নের মূল কারিগর তুমি। শ্রীলংকার ক্রিকেট পালটে দেয়ার কৃতিত্ব যেমন ছিলো অর্জুনা রানাতুঙ্গার, ভারতের ক্রিকেটের খোলনলচা যেমন পালটে দিয়েছিলো সৌরভ গাঙ্গুলি, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ইমরান খান – তেমনি আমাদের ক্ষেত্রে সেই কৃতিত্ব তোমার মাশরাফি।

আজ এই মুহূর্তে তোমার বোলার হিসেবে পারফরমেন্স খারাপ বলে মানুষ দল থেকে তোমার বাদ পড়া দেখতে চাইছে, কিছু উর্বর মস্তিষ্কের মানুষ এক ধাপ এগিয়ে এক হারে তোমার অধিনায়কত্বেরও সমালোচনা করতে ছাড়ছে না। আমি জানি যে, বোলার হিসেবে প্রতিপক্ষের বারোটা বাজিয়ে দেয়া পারফরমেন্স বের হবেই তোমার সামনের কোন এক ম্যাচেই।

যেরকম ভাবে এই মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে তাদের ব্যাটিং লাইন ধসিয়ে দিয়েছিলে। পরপর দুই ম্যাচে একই ভাবে ৪০ ওভারের দিকে শাই হোপ ও জ্যাসন হোল্ডারকে আউট করে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছিলে বাংলাদেশকে। দুই ম্যাচেই পেয়েছিলে ফাউন্ডার অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কার, আমি হলে ম্যান অব দ্য ম্যাচই দিতাম দুই ম্যাচেই।

এরপরে যখন অবশেষে তোমার অধিনায়কত্বে বাংলাদেশকে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দিলে,তখন সবখানে তোমার জয়ধ্বনি। অথচ এর পরে হওয়া আর মাত্র দুটো ম্যাচের পরেই এক শ্রেণি চাইছে তুমি বাদ পড়ো। এই দুই ম্যাচেরও প্রথমটায় জয়ের কারণে তোমার অধিনায়কত্বের প্রশংসা করেছে নেপালের মানুষও। বহুদিন থেকে অবিশ্বাস্য সংগ্রাম করে খেলা চালিয়ে যাওয়া তোমার কাছে ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে বিশ্বকাপে খেলার জন্য ছোট ইনজুরি তুচ্ছ ব্যাপার।

তাই সামান্য ইনজুরি নিয়েই সম্ভবত তুমি খেলা চালিয়ে যাচ্ছো। আমি জানি না,আগামী কালের ম্যাচে বোলিং এ তুমি সফল হবে কি না। কিন্তু একটু পিছে ফিরে তাকালে তো তোমার অনুপ্রেরণা পাওয়া উচিত।কারণ ইংল্যান্ড তো তোমার খুব প্রিয় প্রতিপক্ষ, এদের বিপক্ষে দারুণ সব সাফল্য আছে তোমার। সেই ২০১০ সালের জুলাইতে ইংল্যান্ডেরই মাটিতে যখন আমরা প্রথমবারের মত হারালাম ইংল্যান্ডকে, বিশ্বকাপ ফুটবলের মাঝে যে দুর্দান্ত জয়ে অনেক দিন পরে তোমরা আমাদেরকে বাধ্য করেছিলে ক্রিকেট দেখতে।

সেই জয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ তো তুমিই ছিলে। দুর্দান্ত বোলিং করে ২ উইকেট, শেষের দিকে খুবই প্রয়োজনীয় ২৫-এর ওপর রান আর দারুণ অধিনায়কত্বের কারণে ম্যান অব দ্য ম্যাচ পুরস্কার তো তোমাকেই দেয়া হয়েছিলো। এরপরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবারো প্রায় একই রকম অবদান রেখে ম্যার সেরা হয়েছিলে ২০১৬ সালে দেশের মাটিতে সিরিজে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে।

এবার অনেক দিন পরে মারমুখী ব্যাটিং করে ৪৫ এর মত রান, ৪ উইকেট আর সাথে অনবদ্য অধিনায়কত্ব তো আছেই। আর তুমি ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ না হলেও শ্রেষ্ঠ স্মৃতি নিশ্চয়ই গত বিশ্বকাপের সেই ইংলিশ বধের স্মৃতি। যেখানে পায়ের খারাপ অবস্থা নিয়ে বল করেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ২ উইকেট তুলে নিয়েছিলে।

এক সাংবাদিক লিখেছিলো যে, ম্যাচ শেষে তার সাথে দেখা হওয়া এক অস্ট্রেলিয়ান নারী তোমার প্রশংসা করে বলেছিলো, ‘ওহ ইওর ক্যাপ্টেন উইথ ব্যাড লেগস, হি রিয়েলি ডিড মিরাকল!’ আসলেই তাই, যার কারণে রুবেল শেষে অ্যন্ডারসনকে বোল্ড করে জয় নিশ্চিত করার পরের সেই বিখ্যাত দৃশ্য যে দৃশ্য এদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে – আনন্দের ক্লান্তিতে তোমার মাঠেই শুয়ে পড়া আর তোমার ওপরে দলের বাকি সব খেলোয়াড়ের ঝাপিয়ে পড়া।

এবারো যদি এরকম কোন দৃশ্য দেখতে চাই আমরা তাহলে যে তোমার নেতৃত্বই দরকার, এটাই দুঃখজনকভাবে বুঝতে পারছে না অসংখ্য মানুষ। কালকের ম্যাচে না হলেও ফর্মে তুমি সামনে ফিরছোই এটা আমি নিশ্চিত। কালকের ম্যাচের জন্য ইংলিশদের সাথে তোমার দারুণ এসব স্মৃতি থেকেই অনুপ্রেরণা নাও ম্যাশ।

ভবিষ্যতে আমি ও আমার মত আরো অনেকেই আমাদের সন্তানদেরকে জীবনে অনুপ্রেরণার জন্য তোমার জীবন সংগ্রামের, দেশের হয়ে খেলতে গিয়ে তোমার আত্মনিবেদনের, তোমার আরো অনেক কিছুর গল্প শোনাবো। আমি খুব করে চাইছি যে,সেই গল্পের একটা অধ্যায় হোক আগামী কাল ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচটা। না হলেও সমস্যা নেই। কিন্তু মন যে খুব চাইছে তোমার বিখ্যাত হাটুর আরেকটা জয়গাথা লেখা হোক কাল।

ইতি

– তোমার সব সময়ের ভক্ত

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।