অদ্বিতীয় দিতি

‘ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়, তোমায় নিয়ে হাজার বছর বাঁচতে বড় ইচ্ছে হয়’ – সত্যিই মানুষের জীবন অনেক ছোট, অকাল প্রয়ানে হারিয়ে যায় অনেক প্রাণ। নিজের সিনেমার এই গানের কথাগুলো যেন ফলে গিয়েছিল তাঁর বেলায়। জীবনের মায়া ত্যাগ করে তাড়াতাড়িই চলে গিয়েছিলেন পরপারে। তিনি হলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনড্রিয় নায়িকা দিতি।

‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, সে কথা তুমি যদি জানতে – ‘উসিলা’ সিনেমায় চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবালের অত্যন্ত এই জনপ্রিয় গানে নবীন নায়িকার উদয় হল। তিনিই হলেন দিতি। মিষ্টি হাসি, আর গালে তিল – অল্প ক’দিনের মধ্যে এই স্বপ্নকন্যা ঠাই পেয়ে যান হাজারো ভক্তের হৃদয়ে।

দিতি প্রথমদিকে বিটিভিতে আল মনসুরের ‘লাইলি মজনু’-সহ একাধিক নাটকে অভিনয় করেন। তবে চলচ্চিত্রের শুরুটা ১৯৮৪ সালে এফডিসির নতুন মুখের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। অকাল প্রয়াত নায়ক মান্না, সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে তিনিও সেই কার্যক্রমে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

প্রথম সিনেমা উদয়ন চৌধুরী পরিচালিত ‘ডাক দিয়ে যাই’। অনুদানের এই ছবিটি যদিও আজো মুক্তি পায়নি। প্রেক্ষাগৃহে প্রথম মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা ‘আমিই ওস্তাদ’। ‘উসিলা’ সিনেমায় প্রধান ভূমিকায় শাবানা থাকলেও গানের জনপ্রিয়তা ও নিজের সৌন্দর্যের কারণে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন।

‘এই সুখের নেই কোনো সীমানা, বসন্তের এই আমন্ত্রণে জড়িয়ে গেলাম আলিঙ্গনে’ -১৯৮৭ সালে সুভাষ দত্তের ‘স্বামী স্ত্রী’ সিনেমায় সিনেমার মধ্যভাগ পার হবার এক অন্ধ মেয়ের চরিত্রে আবির্ভূত হন তিনি। সিনেমাটি মূলত কিংবদন্তিতুল্য চিত্রনায়িকা শাবানার। সঙ্গে ছিল দুই বাঘা অভিনেতা রাজ্জাক ও আলমগীর। এদের মাঝেই নিজেকে সমুজ্জ্বল করেছিলেন। আর অভিনয় গুণে নবীন থাকাকালীনই পেয়ে গিয়েছিলেন সেরা সহ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

‘আমি একদিন তোমায় না দেখিলে, তোমার মুখের কথা না শুনিলে’ – আব্দুল্লাহ আল মামুনের যুগান্তকারী ও জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা ১৯৮৮ সালের ‘দুই জীবন’। প্রধান ভূমিকায় বুলবুল আহমেদ ও কবরী। তবে তারুণ্যনির্ভর দর্শকদের কাছে অতি প্রিয় হয়ে উঠেছিল আফজাল-দিতি জুটি। টেলিভিশন নাটকে তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা আফজাল হোসেন। তাঁর সঙ্গে দিতির রসায়নে দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছিলেন। শুধু যে সৌন্দর্যতায় মুগ্ধ করেছিলেন তা নয়, স্টাইলের দিক থেকেও তিনি ছিলেন অনন্যা।

ববিতার পর তাঁকেই সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি স্টাইলিশ নায়িকা বলা হতো। দুই জীবন সিনেমার ‘তুমি আজ কথা দিয়েছো’ গানটিও বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছিল। একই বছর আমজাদ হোসেনের ‘হীরামতি’ ছিল ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য সিনেমার একটি, দারুন প্রশংসিত হয়েছিল।

সোহেল চৌধুরীর সাথে জুটি বেঁধে এটাই ছিল তাঁর প্রথম ছবি। এরপর ‘আজকের হাঙ্গামা’-সহ বেশ কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন এই জনপ্রিয় জুটি। তারকাবহুল সুপারহিট ছবি ‘ভাই বন্ধু’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন।

‘কাল সারা রাত ছিল স্বপনেরই রাত’ – আশা ভোঁসলের এই বিখ্যাত গানটি দিতিরই ‘প্রেমের প্রতিদান’ সিনেমার গান এটি। ভালোবাসার এই সিনেমার ‘আমার মনের আকাশে আজ জ্বলে শুকতারা’ গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই ছবিতে দিতির নায়ক ছিলেন দু’জন – ইলিয়াস কাঞ্চন ও সোহেল চৌধুরী। এই দু’জনের সাথে গড়ে উঠেছিল তাঁর জনপ্রিয় জুটি। দু’জনেই কাছের মানুষ হয়ে এসেছিলেন ব্যক্তিজীবনে, দুটোই রুপ নিয়েছিল বিচ্ছেদে।

‘পড়েছি কপালে টিপ, চোখে কাজল’ – পাকিজা প্রিন্ট শাড়ীর সেই জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনে মডেল হয়ে এসেছিলেন, এখানেও বাজিমাৎ। ইত্যাদিতে তপন চৌধুরীর গানে মডেল হয়েছিলেন, গানের জগতেও সুনাম আছে তাঁর। বিটিভিতে আগমন গানের সুবাদেই। অ্যালব্যামও বেরিয়েছিল।

‘চিঠি কেন আসে না, আর দেরি সহে না’ – চিঠি নিয়ে বাংলা সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় গান। ‘প্রিয় শত্রু’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছিল এই গানটি। একই বছর মুক্তি পায় পারিবারিক সিনেমা ‘হিংসার আগুণ’। সিনেমা দুটি বেশ উপভোগ্য, অভিনয়ও খুব ভালো করেছিলেন দিতি।

কিন্তু, দূর্ভাগ্যক্রমে ছবি গুলো সাফল্য পায়নি। ‘দুই জীবন’ তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা। তবে ব্যবসায়িক ভাবে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পাওয়া সিনেমা ‘আজকের হাঙ্গামা’।

অ্যাকশন ধারার এই ছবি দারুণ সাফল্যের পর এই ধারার ছবিতে নিয়মিত হতে থাকেন, সেই সুবাদে অভিনয় করেন ‘লেডি ইন্সপেক্টর’-এর মত আরেক হিট ছবিতে। খুব সম্ভবত বাংলা সিনেমার নায়িকাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

‘আজ বড় সুখে দুটি চোখে জল এসে যায়’ – ‘বেঈমানি’ সিনেমার শ্রুতিমধুর গান। ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে জুটি বেঁধে বহু দর্শকপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়েছেন এর মধ্যে অন্যতম হল ‘বেনাম বাদশাহ’, ‘চরম আঘাত’, ‘অজানা শত্রু’, ‘ভয়ংকর সাতদিন’, ‘আসামী গ্রেফতার’ ও ‘বেপোরোয়া।

এছাড়া নায়ক রাজ রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক থেকে আফজাল হোসেন, মান্না, রুবেল-সহ ওপার বাংলার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সবার সাথেই অভিনয় করেছিলেন। মান্নার প্রথম প্রযোজিত সিনেমা ‘লুটতরাজ’-এ নায়িকা হয়েছিলেন দিতি। এই সিনেমার ‘তুমি নাই কিছু নাই’ গানটি বেশ শ্রোতাপ্রিয়। শাবানা, ববিতা থেকে চম্পা, মৌসুমী সবার সাথেই স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করে গেছেন।

কিশোরী দিতি

সাহিত্যধর্মী বা ভিন্নধর্মী সিনেমায় সেভাবে অভিনয়ের সুযোগ পাননি। দুই প্রজন্মের মাঝখানে পড়ে বেশ ভালোই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছিল। বাণিজ্যিক ছবিতেই নিজের অভিনয় গুণ দেখিয়েছিলেন বেশ সংখ্যক ছবিতে। দ্বৈত চরিত্রে ‘অমর সঙ্গী’ বা ‘সুখের ঘরে দু:খের আগুণ’ সিনেমায় দারুণ অভিনয় করেছিলেন।

তবে বিশেষ করে বলতে হয় ‘শেষ প্রতীক্ষা’ সিনেমাটির কথা। ছবিটিতে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু জাতীয় পুরস্কারে ভাগ্য সহায় হয়নি, অথচ সেই বছর এই বিভাগে কাউকেই জাতীয় পুরস্কারই দেয়া হয়নি।

মূলত নব্বই দশকের মাঝামাঝির পর থেকেই জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। সিনেমাগুলো ফ্লপ হতে থাকে। ব্যক্তিজীবনের চড়াই উৎরাইয়ে সিনেমা থেকে দূরে সরে যান, চলচ্চিত্রেও অশ্লীলতা ঝেঁকে বসে। নিজের প্রিয় নায়করাও হয়তো তাকে এড়িয়ে গেছেন।

বেশ বিরতির পর বান্ধবী নারগিস আক্তারের ‘চার সতীনের ঘর’ সিনেমায় সহ অভিনেত্রী হয়ে আবার প্রত্যাবর্তন করেন।

প্রথম স্বামী সোহেল চৌধুরী ও পরিবারের সাথে দিতি

এরপর অভিনয় করতে থাকেন ‘কাল সকালে’, ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘নয় নম্বর মহা বিপদ সংকেত’, ‘মেঘের কোলে রোদ’, ‘মাটির ঠিকানা’, ‘মুক্তি’, ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনী’, ‘আইসক্রিম’ ‘সুইটহার্ট’-সহ বেশ সংখ্যক সিনেমায়। দিতি অভিনীত শেষ সিনেমা ‘যে গল্পে ভালবাসা নেই’। ছবিটি তাঁর মৃত্যুর পর ২০১৭ সালে মুক্তি পায়।

নিজের জীবিকার তাগিদেই হয়তো শাকিব খান, অনন্ত, জয়াদের মা হয়ে অভিনয় করে গেছেন। তবে এটাও ঠিক তিনি বেঁচে থাকলে মায়ের চরিত্রের জন্য অভিনেত্রী সংকট হতো না। তাঁর মানের অভিনেত্রী তো এই ইন্ডাস্ট্রিতে নেই বললেই চলে। এই সময়ে বহু নাটকে অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে ‘গুলশান এভিনিউ’, ‘মা’, ‘সোনার ময়না পাখি’, ‘অনলাইন ডট কম’, ‘ভবের হাট’, ‘বউ শ্বাশুড়ি নট আউট’ অন্যতম।

তাঁর পুরো নাম পারভীন সুলতানা দিতি। তার জন্ম ১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ, নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ে। ব্যক্তিজীবনে দুই সন্তানের জননী তিনি। শেষ জীবনটা ভালোই কেটে যাচ্ছিল জীবন।

কিন্তু দু:স্বপ্ন হয়ে আসে মস্তিষ্কের ক্যান্সার্। ভারতে চিকিৎসা করিয়েও ভালো ফল আসেনি। অবশেষে ঢাকাতেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুর সময়ে বয়স ছিল মাত্র ৫১ বছর।

অদেখা ভুবনে ভালো থাকবেন প্রিয় নায়িকা!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।