কুয়েন্টিন টারান্টিনো ও ৭০ দশকের হলিউড

কুয়েন্টিন টারান্টিনো ‘পাল্প ফিকশন’-এর জন্য অনেকের কাছেই পরিচিত। তাঁর সিনেমার ক্রিটিকদের মতে তিনি সিনেমায় ভায়োলেন্স ‘গ্ল্যামারাইজ’ করেছেন। সে কারণে অনেকেই আবার তাঁর সিনেমা অপছন্দ করেন।

কিন্তু তাকে আপনি পছন্দ-অপছন্দ যাই করুন না কেন, তাঁকে এই পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা পরিচালকদের একজন হিসাবে অস্বীকার করতে পারবেন না কোনভাবেই। তাই গেলাম তাঁর নতুন ছবি ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড’ দেখতে। ফিরে তাই নিয়েই লিখতে বসলাম। কিছু স্পয়লারও থাকছে লেখায়।

সিনেমাটার প্রেক্ষাপট ৭০-এর দশকের হলিউড, লস অ্যাঞ্জেলস। টারান্টিনো নিজে সেই সময় বড় হয়েছেন লস এঞ্জেলেস-এই। তাই সিনেমাটা তার নিজের সেই সময়কার স্মৃতিচারণাও বটে। সেই সময় আমেরিকায় হিপিদের উত্থান। আবার আমেরিকান সিনেমার ‘স্বর্ণযুগ’ চলছে। একই সময় চার্লস ম্যানসন নামে এক কুখ্যাত ‘কাল্ট’ নেতারও উত্থান। এসব কিছুই উঠে এসেছে এই সিনেমায় যেটাতে অনেকগুলি প্যারালাল কাহিনী চলে (‘পাল্প ফিকশন’-এর মতই)।

তবে সিনেমার কাহিনী আগায় রিক ডাল্টন (লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিও) নামে এক টিভি অভিনেতাকে নিয়ে। তার ‘স্টান্ট ডাবল’-এর ভূমিকায় আছেন ক্লিফ বুথ (ব্র্যাড পিট)। ঘটনা হচ্ছে রিক এখন তার ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে। তাই অভিনেতা হিসাবে তাঁর অজস্র অন্তরদহন আর সংগ্রাম সিনেমার মূল কাহিনী।

কিন্তু, একইসাথে ক্লিফের ভিন্ন জীবনও উঠে আসে সিনেমায়। সে সামান্য একজন স্টান্টম্যান। রিকের তুলনায় তাঁর বলতে গেলে কিছুই নেই। না অর্থ, না সম্মান, না কোন কিছু। কিন্তু রিকের সে বহু বছরের বন্ধু। রিককে সে আপন ভাই মানে। এই দু’জনের দু’রকম সংগ্রামও উঠে আসে সিনেমায়।

আবার দেখা যায় রিকের পাশের বাড়িতেই থাকে বিখ্যাত পরিচালক রোমান পোলান্সকি। ‘রোজমেরিস বেবি’-এর কারণে তিনি তখন বিখ্যাত। তাঁর স্ত্রী শারন টেট (মারগট রবি)।

তার চরিত্র সিনেমায় কিছুটা ‘সাইড অ্যাট্রাকশন’ জাতীয়। সিনেমায় তার ভুমিকা তেমন নেই। তিনি ছোটখাটো অভিনেত্রী, হলিউডের কিছু সিনেমায় তিনি ছোট ছোট পার্শ্বচরিত্র করেন। পুরা সিনেমাটায় মারগট রবিকে আমার কিছুটা অনর্থক মনে হয়েছে। হয়ত সব চরিত্র যাতে একরকম না হয়ে যায় আর দর্শকের চোখের বিনোদন হয় তাই এক আকর্ষক নারীকে রাখা হয়েছে।

সিনেমাটা অত্যন্ত পুরুষকেন্দ্রিক। তবে টারান্টিনো এর আগে ‘কিল বিল’ জাতীয় নারীকেন্দ্রিক সিনেমাও করেছেন। তবে, নিন্দুকেরা বলবেন তাঁর সেই সময়ের গার্লফ্রেন্ড উমা থারমানের জন্যই তিনি এই মুভি বানিয়েছিলেন।

এরকম আরও একটা সাইড রোল অথবা ‘ক্যামিও’ করেছেন আল পাচিনো। তিনি এক হলিউড প্রযোজকের ভুমিকায় আছেন। তিনিও তার স্বভাবসুলভ এনার্জি দিয়ে স্ক্রিনে তার সময়টা রাঙিয়ে তুলেছেন। বলা যায়, হলিউডের সব হেভিওয়েট অভিনেতা চলে এসেছেন এই সিনেমায় টারান্টিনোর ডাকে।

তবে ছবির প্রথমভাগ খুবই ধীরগতির। মূলত টারান্টিনো এই সময়ে ৭০-এর দশকের লস অ্যাঞ্জেলসের দৃশ্য এঁকেছেন ক্যামেরার ফ্রেমে। সিনেমাটোগ্রাফি চমৎকার। সেট ডিজাইন একেবারে নিখুঁত ওই সময়ের ছবি। এমনকি প্রতিটা গাড়িও ওই সময়কার। টারান্টিনো দক্ষ হাতে ওই সময়ে আপনাকে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তার সিনেমার মূল বিষয় যেই ভায়োলেন্স সেটা একেবারে শেষের দিকে পাবেন, তার আগে না। তার আগে মূলত ক্যারেক্টার বিল্ডিং, তাই কিছুটা স্লো।

লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিও তার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তিনি এই সিনেমায় নিজেই একজন অভিনেতা। তাই অভিনয়ের ভিতরেও তিনি অভিনয় করেছেন বারবার (ইন্সেপশন?)। কখনো কখনো তিনি রিকের চরিত্রে খারাপ অভিনয় করেছেন, কখনো হাস্যকর। আবার কখনো কখনো নিজের রুমে তিনি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে আবেগে ভেঙ্গে পড়েছেন। পুরা ছবিটার আসল হাইলাইট তিনিই। আমি একেবারে মুগ্ধ!

ওদিকে ব্র্যাড পিট তাঁর স্বভাব-সুলভ ‘কুল গাই’ ঘরানার অভিনয় করেছেন। তাঁর মুখের এক্সপ্রেশন ২০ বছর আগে যা ছিল, এখনো তাই। সকল মুভিতে তার অভিনয় ওরকমই লাগে আমার। এখানেও তিনি তাই করেছেন। তবে হলিউড অত্যন্ত বর্ণবিদ্বেষী এবং নারীবিদ্বেষী জায়গা হিসাবে সুপরিচিত। তাই একজন সাদা চামড়ার অভিনেতার আর কিছু করার দরকার নাই এটাও সত্যি। যাই হোক, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। সেই বিষয়ে কথা না বাড়াই এখানে।

ছবির শেষের দিকের সিনগুলি টারান্টিনোর সিনেমার অন্যান্য অ্যাকশন সিনের মতই এবং অত্যন্ত রোমহর্ষক। কিন্তু একইসাথে ক্যাপ্রিও ওই সিনগুলিকে হাস্যরসাত্মকও করে তুলেছেন। তাকে আরেকটা অস্কারের জন্য মনোনয়ন দিলে অবাক হব না একেবারেই। আর ছোট্ট একটা মেয়ে আছে, তার অভিনয়ও ভোলার মত না।

চার্লস ম্যানসন সম্বন্ধে যদি না জানেন, তবে সিনেমা দেখার আগে একটু অনলাইনে পড়ে নেবেন। না হলে মুভির গতিপ্রকৃতি বুঝতে একটু কষ্ট হবে।

তবে শেষ পর্যন্ত বলতেই হবে টারান্টিনো তার নিজের মান রেখেছেন। মুভিতে প্রচুর সাসপেন্সও আছে। ব্রাড পিট চার্লস ম্যানসনের র‍্যাঞ্চ-এ দৈবক্রমে ঘুরতে গেলে এরকম একটি সাস্পেন্সফুল সিন দেখা যায়, সেটা চমৎকার সিকোয়েন্স ছিল। সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং সব কিছুই টপ ক্লাস। এক কথায় বলতে গেলে মুভিটা নিয়ে খারাপ কিছু বলা যায় না।

শেষ করি টারান্টিনোর একটি উক্তি দিয়ে – ‘দেখার জন্য সহিংসতাই সবচেয়ে ব্যাপারগুলোর একটি!’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।