সাদাকালো দিনের চিরসবুজ ভৌতিক থ্রিলার

ছোটবেলায় আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি রাতের বেলায় কুপি বাতির টিমটিমে আলোতে কিংবা যারা শহরে বেড়ে উঠেছি লোডশেডিং হলে মা, নানি-দাদিদের কাছে শুয়ে বসে ভুতের গল্প শুনতাম আর শিহরিত হতাম। আর বাইরে যদি ঝড় বৃষ্টি হত কিংবা কনকনে কুয়াশা ঘেরা শীতে সেই শিহরণের মাত্রা যেন আরেক ধাপ বেড়ে যেত।

তেমনি ভূতের গল্প শোনা, বই পড়ার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের বিষয়টাও একসময় এসে পড়ে। চলচ্চিত্রের পরিমণ্ডলে ভূত কিংবা প্যারানরমাল এন্টিটি একটি বিশাল ফ্যাক্ট। বাস্তবে এইসবের অস্তিত্ব থাক বা না থাক, মানুষ বিশ্বাস করুক বা নাই করুক, ভৌতিক সিনেমা পছন্দ করে এমন দর্শক সারা পৃথিবীতে ব্যাপক পরিমানে ছিল, আছে, থাকবে।

বাংলাদেশ তথা বাংলা সাহিত্যের বিশাল একটা অংশ জুড়ে রয়েছে ভূতের বিচরণ। সে রবীন্দ্রনাথ হোক কিংবা হুমায়ুন আহমেদ, ভূত সবাইকে তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সারা পৃথিবীতে ভূত বা ভৌতিক ঘটনা নিয়ে অজস্র ছবি হলেও বাংলা চলচ্চিত্রে হরর মুভি খুবই কম। ওপার বাংলায় যা ও কিছু হয়েছে, এপার বাংলায় নাই বলতে গেলে।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বহু ফোক ফ্যান্টাসি মুভি নির্মিত হয়েছে, যেগুলোতে ডাইনি, দৈত্য দানব, জীন পরী, নাগ নাগিনী দেখানো হয়েছে, এমনকি রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত মুভিতে নায়ক বুলবুলকে শ্মশানের ভুতের কবলে পড়তে দেখা গেলেও এগুলোকে ভুতের কিংবা হরর ছবি বলা যাবে না। কারন এগুলোতে ভূত প্রেত ছিল সামান্য গুরুত্বহীন অংশ মাত্র।

হরর মুভি কেন এদেশে কম হয়? –  এ ব্যাপারে আমাদের দেশের একজন প্রবীণ নির্মাতাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ভুতের সিনেমা বানিয়ে লাভ কি? যে দেশে জীবিত মানুষের ছবি চলে না, সে দেশে মরা ভূতের ছবি কে দেখবে?’

যাই হোক এখন শীত ঋতু চলছে, রাতের বেলায় লেপ গায়ে দিয়ে অনেকে ভৌতিক মুভি দেখতে পছন্দ করেন। এখন দুই বাংলার পুরনো কিছু সাদা কালো ক্ল্যাসিক হরর, আদিভৌতিক, রহস্য, থ্রিলার নির্ভর কিছু মুভির নাম উল্লেখ করছি। যারা ভিন্টেজ ক্ল্যাসিক মুভি দেখেন, তাদের আশাকরি ভালো লাগবে।

  • কঙ্কাল (১৯৫০)

নরেশ মিত্র পরিচালিত এই সিনেমাটিকে মনে করা হয় স্বাধীন ভারতের প্রথম সফলভাবে ভয় দেখাতে পারা এক বাংলা সিনেমা। টানটান চিত্রনাট্য। পরতে পরতে সাসপেন্স। না দেখা থাকলে দেখে ফেলুন। অভিনয়ে আছেন কেতকী দত্ত, শিশিবর বট্টব্যাল, পরেশ ব্যানার্জি-র মত অভিনেতারা।

  • হানাবাড়ি (১৯৫২ সালে মুক্তি)

প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা এবং প্রযোজনায় এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৫২ সালে। অভিনয়ে ছিলেন ধীরাজ ভট্টাচার্য, নবদ্বীপ হালদার প্রমুখ। একটি বাড়িতে অদ্ভুত লোমশ একটি প্রাণীর উপদ্রব। তার হাতে মানুষ খুন। একসময় বাড়িটি অভিশপ্ত হানাবাড়িতে পরিনত হয়। এটা আসলে প্রাণী না ভূত না কোন চক্রান্ত এই নিয়ে এগিয়ে গেছে ছবিটি। সবশেষে গল্পে অসাধারণ ট্যুইস্ট। সবমিলিয়ে এক গা ছমছমে সিনেমা।

  • ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০ সালে মুক্তি)

তপন সিনহা পরিচালিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনি অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমাটা সর্বকালের সেরাদের মধ্যে পড়ে। অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চেট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতি দেবী, ছবি বিশ্বাস এর মত নামী অভিনেতারা। নতুন চাকরির সুবাদে পুরনো এক রাজবাড়ীতে থাকতে আসে এক তরুন অফিসার। রহস্যে ভরপুর সে বাড়ীর প্রতিটি অংশ। সেই বাড়ীতে মিলেমিশে এক হয়ে যায় তরুনের অতীত এবং বর্তমান।

  • চুপি চুপি আসে (১৯৬০)

চুপি চুপি আসে হল একটি বাংলা সাদাকালো রহস্য চলচ্চিত্র যা ১৯৬০ সালে প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরিচালনায় প্রকাশিত হয়। এই চলচ্চিত্রটি বাংলা রহস্য চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। চুপি চুপি আসে সিনেমাটি আদতে আগাথা ক্রিস্টির লেখা বিখ্যাত গোয়েন্দা কাহিনী থ্রি ব্লাইন্ড মাইস (নাট্যরূপ ‘মাউসট্র্যাপ’) এর ছায়ায় গড়ে উঠেছে।

কাহিনী এরকম – কলকাতার গিরিমাঝি লেনের ভয়ানক হত্যাকাণ্ডের পরে পুলিশ সন্দেহ করে খুনী হানা দিতে পারে একটি হোটেলে পরবর্তী খুনের উদ্দেশ্যে। এই হোটেলটা আবার ভুতুড়ে হোটেল হিসেবে পরিচিত। রহস্যময় অনেক কিছু চলতে দেখা যায় এখানে রাতের বেলা। প্রবল বর্ষণ বন্যার ভেতরেও কিছু মানুষ এসেছেন এখানে যাদের চালচলন রহস্যজনক। অতিথিদের কয়েকজনের কোনো গুপ্ত অতীত রয়েছে যা একটি অনাথ আশ্রম সংক্রান্ত।

আর প্রত্যেকেই তাদের আসল নাম গোপন করে আছেন। সরকারী গোয়েন্দা ইনস্পেকটর ঘোষাল বন্যার জল অতিক্রম করে কোনোরকমে একটি ভেলায় চড়ে সেই হোটেলে আসেন যেখানে অবিলম্বেই কোনো হত্যাকান্ড ঘটবে এমন কিছু জানতে পেরে।

এভাবে থ্রিল, সাসপেন্স নিয়ে এগিয়ে গেছে মুভিটি। সেই সময়ে বাংলা মুভিতে যে এরকম থ্রিল থাকতে পারে তা না দেখলে বুঝতাম না। মাথা খারাপ করা টুইস্ট আছে মুভির শেষে। কে অপরাধী আর কে ত্রাতা আর কেনই বা রহস্যময় ভৌতিক ঘটনা ঘটছে তা শেষ পর্যন্ত না দেখলে বুঝবেন না।

অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস, জহর গাঙ্গুলি প্রমুখ। মূল গল্পের ডিটেকটিভ সার্জেন্ট ট্রটারের ভূমিকায় এ ছবিতে ছিলেন উত্তম কুমারের ছোট ভাই তরুণ কুমার (ইনস্পেকটর ঘোষাল)।

  • মণিহারা (১৯৬১ সালে মুক্তি)

তিন কন্যা সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র যা ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মুক্তি পায়। এটি প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোট গল্প থেকে করা তিনটি চলচ্চিত্রের সংকলন। রবি ঠাকুরের তিনটি গল্পের তিনটি প্রধান চরিত্রই নারী, এই তিন নারী চরিত্রকে বোঝানোর জন্য সিনেমার নাম দেয়া হয়েছে তিন কন্যা। এর মধ্যে দ্বিতীয় সিনেমা মণিহারা-তে কন্যা থাকে বিবাহিতা, ২০-২৫ তো হবেই। সেখানেই ভয় পাওয়ার এক কাহিনি দেখা গিয়েছিল।

লোভী স্ত্রী মণিমালিকা-র চরিত্রে কণিকা মজুমদার আর স্বামী ফণীভূষণ সাহা-র ভূমিকায় কালী বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অভিনয় ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। এই মুভির একে বারে শেষের দিকেও আছে একটি ভূতুড়ে চমক। সব থেকে শিহরণ ধরিয়েছে এর ব্যাকগ্রাউন্ড থিম সং। এই মিউজিকের কম্পোজারও ছিলেন সত্যজিৎ রায়। আমার মতে সব থেকে সেরা হরর থিম সঙ্গের ভেতর এটা একেবারে শীর্ষে।

  • কুহেলি (১৯৭১ সালে মুক্তি)

ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন তরুণ মজুমদার অভিমন্যু ছদ্মনামে। কাহিনী এরকম, পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা শহর নিঝুমগড়ে আসেন সেবা মিত্র। সেখানকার রায়কুঠির মালিক শঙ্কর রায়ের একমাত্র শিশুকন্যা রেণুর গভর্নেসের দায়িত্ব নিয়ে। গোটা রায়কুঠি বাড়িটা আলো আঁধারি রহস্যে ভরা। তিনি আস্তে আস্তে বুঝতে পারেন গুপ্ত অতীত লুকিয়ে আছে এই বাড়িতে। বহু আগে দুটি খুন হয়েছিল এই বাড়িতে।

এরপর থেকে বাড়িটি প্রায় ভুতুড়ে ও হানাবাড়ির কুখ্যাতি পেয়েছে স্থানীয় লোকের কাছে। শঙ্করের স্ত্রী অপর্নাকে রহস্যজনকভাবে হত্যা করা হয় এবং শঙ্কর নিজেও অভিযুক্ত হয়েছিল এই হত্যায়। একইদিনে তাদের ড্রাইভারকেও কে বা কারা গুলি করে খুন করে। পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে রোজ রাত্রে অপর্নার মতোই দেখতে এক মহিলা গান গেয়ে হেঁটে বেড়ান। আসছে সে আসছে. সিনেমাটায় এই গানটার সময় গায়ে কাঁটা দিয়ে দেয়। এই সিনেমা দেখে বাঙালী ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অভিনয় করেছেন বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জী, সন্ধ্যা রায়, রবি ঘোষ, উৎপল দত্ত, দেবশ্রী রায় (শিশুশিল্পী)।

  • নিশি তৃষ্ণা (১৯৮৯)

পরিমল পরিচালিত ‘নিশি তৃষ্ণা(১৯৮৯)’ বাংলা চলচিচত্রের প্রথম ভ্যাম্পায়ার সিনেমা। অভিনয় করেছেন বিশ্বজিৎ এর ছেলে প্রখ্যাত অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। এটা প্রসেনজিতের একেবারে শুরুর দিকের মুভি। তার বিপরিতে অভিনয় করেছেন তার থেকে ছয় বছরের বড় সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুন সেন।

  • রাজবাড়ি (১৯৮৪)

রাজবাড়ি নামক একটি অঞ্চলের একটি কলেজে যোগ দেন একজন তরুন প্রফেসর। কোন এক অজানা টানে পরিত্যক্ত ভূতুড়ে রাজবাড়িতে গিয়ে সে জানতে পারে এই রাজবাড়ির চার দেয়ালের মাঝে চাপা পড়ে আছে লম্পট রাজা কত্রিক অসংখ্য নির্যাতিত নারীর হাহাকার। তাদেরই একজন অতৃপ্ত আত্মার সাথে প্রফেসরের সখ্যতা গড়ে উঠে।

ওদিকে প্রফেসরের এক ছাত্রীর চেহারাও আবার সুন্দরী ঐ অতৃপ্ত আত্মার মত। এমনই গল্প নিয়ে কাজী হায়াত ১৯৮৪ সালে এই মুভিটি নির্মাণ করেন। প্রফেসরের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সোহেল রানা এবং আত্মা এবং ছাত্রীর দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন অঞ্জনা। এই ছবিটির থিমও নেয়া হয়েছে রবী ঠাকুরের ক্ষুধিত পাষাণ গল্প থেকে। তবে অপার বাংলার ক্ষুধিত পাষাণ মুভিটি থেকে এটি অনেকখানি ভিন্ন। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঘরানার আলোকে এটি নির্মিত। এটাই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ভৌতিক সিনেমা। এই ছবিটি এবং এর গানগুলো দর্শকদের মনে ইতিবাচক সারা ফেলতে সক্ষম হয়েছিল।

আমার জানামতে ওপার বাংলার সাতটি আর এই বাংলায় এই একটি হরর মুভি সাদা কালো যুগে নির্মিত হয়েছিল। এর বাইরে বাঞ্ছারামের বাগানে, সত্যজিৎ রায়ের গোপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমাতে ভুত থাকলেও সেখানে ভুতকে বা অশরীরী ক্ষমতাকে কমিক রূপে বা সামান্য ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেগুলোকে তাই হরর বা থ্রিলারের পর্যায়ে ফেলা যায় না। ৯০ এর দশকে এরপর কিছু রঙিন হরর ছবি হয়েছে ওপার বাংলায়। যেগুলো দর্শকে আকর্ষণ করতে পারে নাই। ইদানিং অবশ্য কিছু ভালো কাজ হয়েছে এমনকি রিমেকও হচ্ছে যেমন মনিহারা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।