পুরান ঢাকার আকাশে এক টুকরো কালো মেঘ

পুরান ঢাকা বলে কিন্তু আসলে কোন জায়গা নাই। আছে হাজারীবাগ, লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালী, সূত্রাপুর, ওয়ারী এবং গেন্ডারিয়া। কিন্তু পুরনো জিনিসের দাম নাই, অতীতকে আমরা ভুলে যেতে চাই। তাই আমরা যারা ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা, মিরপুরে থাকি, তারা ওইসব এলাকাকে বানিয়ে দিলাম পুরান ঢাকা। নাম পুরান ঢাকা বানিয়ে দিলেও নাস্তা, দুপুর কিংবা রাতের খাবার, ইফতারি কিংবা সেহরি, ঘোরার জায়গা, কিংবা পড়ার জায়গা, ব্যবসা কিংবা চাকরি, পুরান ঢাকা ছাড়া কারো চলে না।

স্টারের পরোটা, নান, লুচি, সুজি, হালুয়া, পায়া, লটপটি ছাড়া বাঙালির নাস্তা অসম্পূর্ণ। বিদেশ থেকে সাত দিনের জন্য দেশে গেলেও স্টারে কিংবা আল রাজ্জাকে খাইতে হবে। দুপুর হইলে হৈ হৈ করে যাইতে মন চায় কাজী আলাউদ্দিন রোডে হাজীর বিরিয়ানি, হানিফের বিরিয়ানি, নাজিমুদ্দিন রোডের মামুনের বিরিয়ানি খাইতে। মাঝে মাঝে রয়েল কিংবা নান্নার তেহারি অথবা লালবাগের চৌরাস্তার মোড়ে শাহী মুরগি পোলাও। রাত হইছে? সমস্যা নাই। হোটেল আল রাজ্জাকের কাচ্চি, হোটেল নিরবের ভর্তা ভাত, ঠাটারি বাজারে লেগ রোস্ট, বেচারাম দৌড়িতে মোরগ পোলাও কিংবা বিউটি বোর্ডিং এ ইলিশ মাছের ডিম ঝোল আর পাতুরি, সাথে ঘিয়ে ভাজা লুচি সবজি।

যেকোন খাবারের আগে কিংবা পরে – রয়েল হোটেলের লাবাং, জিঞ্জিরার বাকরখানি, নবাবপুরের সুতি কাবাব, রায়েরবাজারে বিউটির লাচ্ছি, উর্দু রোডের মাঠা, মদিনা মিষ্টান্ন ভান্ডারের জাফরান মিষ্টি, নবাব বাড়ির সাঁচি পান, মানিক সুইট মিটের দই চিড়া, কসাইটুলির পুড়ি, শমসের আলীর ভুনা খিচুড়ি, গ্রিন সুইটসের আমিত্তি, গেন্ডারিয়ার রহমানিয়ার কাবাব, দয়াল সুইটসের মিষ্টি, রাসেল হোটেলের নাস্তার জন্য, বছরে আল্লাহর এমন কোন দিন-ক্ষন নাই, যেদিন পরাণ পোড়ে না।

গুলশান বনানীতে কেএফসি, বার্গার কিং, ওয়েসটিনে আর কত ‘ঘুরতে’ যাবেন! দিনের শেষে ভরসা ওই পুরান ঢাকাই। বাহাদুর শাহ পার্ক, বলধা গার্ডেন, লালবাগের কেল্লা, জিনজিরা প্রাসাদ, আহসান মঞ্জিল, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, রূপলাল হাউজ, লালকুঠি, তারা মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনিয়ান গির্জা ছাড়া ঢাকায় যাওয়ার কোন জায়গা আছে যেখানে দুই দণ্ড শ্বাস নিতে পারবেন শান্তিতে?

একটু নৌকায় চড়বেন? বুড়িগঙ্গায় যাইতে হবে। জামাই খাওয়াবেন? ভোরে চলে যাইতে হবে ঢাকার সোয়ারিঘাটে। মাছ আর মাছ। কেনাকাটা করবেন? চলে যান বংগবাজার অথবা ইসলামপুরে। পাখির শখ? যাইতে হবে ঠাঠারিবাজার। মনে চাইলো একটু ঘোড়ার গাড়িতে চড়ি, টমটম পাবেন পুরানো ঢাকার অলিতে গলিতে। পাইকারি জিনিস কেনা দরকার? চকবাজার ছাড়া উপায় নাই। চামড়ার ব্যবসা? হাজারিবাগ, পোস্তো। হাসপাতালে যাবেন? মিডফোর্ড।

ছেলে মেয়ে বিদেশে পড়ে। বিদেশী বন্ধুদের ঢাকা ঘুরাইতে গেলেও নিয়ে যাইতে হবে পুরান ঢাকায়। কী ইদে, কী পুজা-পার্বনে পুরান ঢাকার জুড়ি নাই। ১৪ আর ১৫ জানুয়ারি সাকরাইন নামে পুরান ঢাকার ঘুড়ি উৎসবের খবর এখন সারা দুনিয়ার মানুষ জানে। সেই রাতে ঢাকায় যে আলোকসজ্জা হয়, ক্যানাডার নববর্ষে তার ১০ ভাগের ১ ভাগও হয় না। দশ মহররম শিয়াদের উৎসব মহররমে পুরা পুরান ঢাকা অন্য আমেজে মজে যায়। পোলাপাইনের পড়ালেখার ইতিহাস ভাবলেও সেই সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, কলেজিয়েট স্কুল, আরমানিটোলা সরকারি স্কুল।

বাংলাদেশকে চিনতে গেলে, বুঝতে গেলে, পুরান ঢাকা যাইতে হবে। হাজার বছরের যে বাংলার ইতিহাস তার গোড়াপত্তন ওই বুড়িগঙ্গার তীরে পুরান ঢাকায়। ঢাকার খাবারের স্বাদও পুরান ঢাকায়। পুরানো বাড়ি, ঐতিহ্য, পুরান কোর্ট ভবন, দর্শনীয় ভবন, ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি সবই পাবেন পুরান ঢাকায়।

আমার মনে হয় পুরান ঢাকার সাথে আমাদের শুধুই প্রেম, কোন ভালোবাসা নাই। তাই জীবনের সব রূপ, সব স্বাদ আমরা পুরান ঢাকা থেকে নিই, কিন্তু এই পুরান ঢাকা যখন পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তখন ছাড়া আর কখনই তার কথা আমাদের মনে থাকে না। তাকে আমরা বাসার ঘর মোছার পুরনো ন্যাকড়ার মতো ব্যবহারের পর একদিকে পা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে রাখি। প্রয়োজন ছাড়া ফিরেও তাকাই না।

পুরান ঢাকা তাই আমাদের কাছে মাঝে মাঝে পুরান আলমিরা খুলে নেড়ে-চেড়ে রেখে দেয়া প্রিয় স্মৃতি। বছরের পর বছর যাবে। পুরান ঢাকার বাড়িগুলো আরও জীর্ণ-শীর্ণ হবে। আমরা আরও আধুনিক হতে হতে, পুরান ঢাকার অলি-গলিতে সেলফি দিয়ে ক্যাপশন দিব ‘O-M-G’!

এই সত্তর জন মৃত-পোড়া মানুষের জন্য স্মৃতিসৌধ হবে না, তাদের পরিবারের সদস্যরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ, ফ্ল্যাট, সন্তানেরা বিদেশে পড়ার খরচ পাবে না, তাদের স্ত্রী কিংবা স্বামীদের রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা প্রতিবছর ডেকে স্বান্তনা দেবেন না, জাতীয় বীর উপাধিও পাবেন না এদের কেউই।

তবে আশেপাশের কিছু বাড়িঘরে পোড়া দাগ থেকে যাবে। বাতাসে বহু বছর ঘুরতে থাকবে অস্বস্তিকর একটা ভ্যাপসা গন্ধ। গলি-ঘুপচির ছোট ছোট ঘিঞ্জি দোকানের দোকানিরা বুড়ো হতে হতে ঝাপসা চোখে এই দিনটির গল্প করবেন সবার কাছে। নতুন ঢাকার মানুষেরা খাবারের সন্ধানে পুরান ঢাকায় যেয়ে আজ থেকে দশ বছর পরেও ওই দিনের গল্প শুনবে। চোখ আকাশে নিয়ে ‘holy cow’ বলে ‘Uncle আপনার সাথে একটা সেলফি তুলি’ করে ইন্সটাগ্রামে সরব হতে হতে আবার ভুলে যাবে সত্তরটি পোড়া লাশের গন্ধ।

কিন্তু আজ থেকে পুরান ঢাকার আকাশে এক টুকরো কালো মেঘ আজীবনের জন্য ঠিকই ভেসে থাকবে।

হয়ত কেউ দেখবে, আর কেউ দেখবে না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।