অহিউল্লাহ: বিস্মৃতির অতলে হারানো এক ভাষাশহীদ

২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে জলপাই রঙা পোশাকের পাকিস্তানি সৈন্যরা টহল দিচ্ছে। খোশমহল রেস্টুরেণ্টের সামনে বছর নয়-দশের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। যেন বুঝতে পারছেনা এই অচেনা লোকগুলো এখানে কী করছে!

আগেরদিন (২১ ফেব্রুয়ারি) ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছে ছাত্রসমাজ। মিছিলে গুলি চালিয়েছে মিলিটারি-পুলিশ। রফিক, জব্বার, বরকত শহীদ হয়েছেন। আব্দুস সালাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গোটা শহরে থমথমে পরিবেশ। সেনা টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।

নবাবপুর এলাকা সুনসান। লোকবসতি তেমন নেই। মাঝে মাঝে দু-চারটা গাড়ি যাচ্ছে। হঠাৎ এই সুনসান এলাকাটি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ছাত্রদের একটি মিছিল বের হয়েছে। মুহূর্মুহু স্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত।

বছর দশকের সেই ছেলেটি উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জলপাইরঙা পোশাকধারীদের দিকে। এরা কারা? আগে তো দেখেনি! ছেলেটির ছবি আঁকার হাত ভালো। বুকপকেট থেকে কাগজ বের করে সে এই সৈন্যদের ছবি আঁকার বিষয়ে ভাবছিলো।

এমন সময় মিছিলটি তার দৃষ্টিগোচর হলো। এত মানুষ একসাথে! এ ও তার কাছে এক নতুন ব্যাপার। সে খুশিমনে মিছিলটি দেখতে থাকল। একসময় কাগজটি মুখে পুরে চিবুতে চিবুতে মিছিলের মধ্যে চলে এলো। এসময় হঠাৎ জলপাইরঙা পোশাকের সৈন্যদের বন্দুক গর্জে উঠল। শহীদ হলেন শফিউর রহমান। এছাড়া আব্দুল আউয়াল নামে এক রিকশাচালকও শহীদ হলেন। কিন্তু সেই বছর দশেকের ছেলেটির কী হলো?

সেও রক্ষা পায়নি। ঘাতকের প্রচণ্ড বুলেট উড়িয়ে নিয়ে গেলো তার খুলি!

ঘাতকেরা শিশুটির লাশ নিয়ে যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। শিশুটির পরিচয় তখনও জানা যায়নি। ডা. মেজর (অব.) মাহফুজ হাসান ছিলেন লাশটির প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি প্রথমে বালকটির নাম জানতে পারেন শফিউল্লাহ।

কিন্তু পরে জানা যায় তার নাম অহিউল্লাহ।

পিতা রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমান। লাশের বুকপকেট থেকে ডা.হাসান কিছু কাগজ পান। সেখানে ছিল প্রজাপতি ও বিভিন্ন জীবজন্তুর আঁকিবুঁকি। মূলত এই কাগজটি দেখে লাশ শনাক্ত করেন অহিউল্লাহর পিতা।

তবে সৈন্যরা লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। তারা আজিমপুর গোরস্থানে নাম -পরিচয়হীনভাবে লাশটি কবর দেয়।

দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে অহিউল্লাহর মৃত্যু বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র ‘সৈনিক’-এ ১৯৫৪ সালের মার্চে ভাষাশহীদদের তালিকায় অহিউল্লাহর নাম ছিল।

এরপর সময় বয়ে যায়। ভাষাশহিদ হিসেবে রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর, সালামেরা আমাদের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে থাকলেও একজন অহিউল্লাহ-র কথা ভুলে যায় প্রায় সবাই৷ তবে পুরান ঢাকার বয়স্ক মানুষদের অনেকের স্মৃতিচারণে অহির কথা উঠে আসত।

২০০৬ সাল। ভাষা আন্দোলনের পর পেরিয়ে গেছে ৫৪ টি বছর। সে বছর ভাষা-গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের ট্রাস্টি এম আর মাহবুব এর নজরে পড়ে অহিউল্লাহ বিষয়ক বিভিন্ন লেখা। তিনি বিভিন্ন সোর্স থেকে এই বালক সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করেন। এক পর্যায়ে পেয়ে যান অহিউল্লাহর বাড়ির ঠিকানাও। ১৫২, লুৎফর রহমান লেন, নবাবপুর, ঢাকা।

মাহবুব সাহেব সেই বাড়ি গেলেন। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিস্ময়। জানতে পারলেন এই বাড়ির এক ছেলে শহিদ হয়েছিল ১৯৫২ এর ২২ শে ফেব্রুয়ারি। নামটিও নিশ্চিত হলেন। এরপর আর কোন সন্দেহ থাকেনা। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও অহির কোন ছবি জোগাড় করতে পারলেন না তিনি।

অহির কবরের সন্ধানে সিটি কর্পোরেশনে গেলেন তিনি।

নথি ঘেঁটে অহিউল্লাহ নাম পাওয়া গেলো। কিন্তু কবর কোথায় তা জানা গেলোনা। চিহ্নিত করাও সম্ভব হলোনা।

তবে কবর চিহ্নিত করতে না পারলেও অহির একটি ছবি থাকা দরকার বলে মনে করলেন তিনি। কারণ, ওর বাড়িতে ওর স্মৃতি বলতে কিছুই নেই। অবশেষে পরিবারের লোকজন, আত্মীয়দের কাছ থেকে বর্ণনা শুনে শুনে অহির ছবি আঁকার কাজ শুরু হলো। দায়িত্ব নিলেন চিত্রশিল্পী শ্যামল বিশ্বাস।

২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অহির ছবি আঁকার কাজ শেষ হয়। এর আগে এভাবে লোকমুখে শুনে শহিদ আব্দুস সালামের ছবি এঁকেছিলেন ভাস্কর রাশা।

শহিদ অহিউল্লাহর ছবিটি আঁকলেন শ্যামল বিশ্বাস। এটাই ভাষাশহিদ অহিউল্লাহর একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন।

ভাষাশহিদ হিসেবে রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, শফিউরদের পাশাপাশি অহিউল্লাহ, আউয়াল- এদেরও স্মরণ করতে হবে আমাদের। এই প্রজন্মের বালকেরা জানবে একদিন তাদের বয়সী একটি ছেলেও প্রাণ দিয়েছিল মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের দাবিতে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।