নিখাঁদ ও অদ্ভুত এক ভালবাসার গল্প

যান্ত্রিক জীবনে মানুষের ভালোবাসার মূল্য কমে গেছে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায়। বিশুদ্ধ ভালোবাসা বলতে আমরা যেটা বুঝি সেটা এখন অনেক কমই দেখা যায় এই প্রেম নিয়ে খেলার যুগে। এখনকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালোবাসা মানে ধোকা, ডাবল টাইমিং আর প্রতারণা। ভালবাসার ছবিগুলোতেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এসবই দেখানো হয়। এগুলো প্রেম হলেও ভালবাসা নয়।

এমন সময় স্বার্থহীন ভালবাসা দেখলে অন্যরকম ভাললাগা কাজ করে। ‘অক্টোবর’ যেন তেমনই এক নিখুঁত রোম্যান্টিক ভালবাসার গল্প। সেই ভালোবাসায় কোন চাওয়া-পাওয়া থাকেনা, থাকেনা কোন লোভ, প্রতারণা। এত নিখুত রোমান্টিক ট্র্যাজেডির গল্পের ছবি বলিউডের কাছে আসলে প্রত্যাশিতই ছিল না। গেল কয়েক বছরে বলিউডে হাওয়া বদলের ফসলই হল ‘অক্টোবর’।

ছবির গল্প ড্যান আর শিউলীর। দু’জন একটা ফাইভস্টার হোটেলে কাজ করে। কিন্ত তাদের মধ্যে খুব একটা কথাবার্তা হয়না। প্রথম ২৫ মিনিটে তাদের এক সাথে মাত্র দুই-একটা ডায়লগ আছে এক সাথে কিন্ত প্রেমতো দূরে থাক তারা যে ভালো বন্ধু সেটাও এই প্রথমভাগে বোঝার উপায় নাই। তবে, একটা দুর্ঘটনার পর সবকিছু পাল্টে যেতে শুরু করে। খুব সাধারণ একটা সংলাপের অবদান আছে এতে – ‘ড্যান কোথায়?’ গল্পটির লেখক জুহি চতুর্বেদী খুব দক্ষতার সাথে একদম শুণ্য থেকে একটা ভালবাসার গল্প নির্মা করেছে। পুরো ব্যাপারটাই ছিল অননুমেয়। ট্রেইলার দেখে দর্শক-বোদ্ধারা সিনেমাটির গল্প নিয়ে যা ভেবেছিল তাঁর ষোল আনাই বৃথা।

অনেকে হয়ত, এই ছবি দেখার আগে চিন্তাও করতে পারবেন না ভালোবাসা কত সুন্দর আর এক্সপেক্টেশনলেস হতে পারে মানুষের জীবনে। বিশেষকরে প্রত্যেক মেয়েই চাবে তার জীবনে ড্যানের মত কেউ থাকুক যে কি না কোনো বিনিময় ছাড়া অফুরন্তভাবে ভালোবাসুক। আপনি ছবিটার সাথে যত কানেক্টেড হবেন ততো বেশী ভালো লাগতে থাকবে আস্তে আস্তে।

তবে, শেষে আপনি যা চান তা হবে না। আর আপনি যদি নরম হৃদয়ের মানুষ হন ছবির শেষে চোখ থেকে অল্প হলেও নোনা অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়বে। ছবিটা শেষ হওয়ার পরেও কিছুসময় একটা ঘোরের মধ্যে থাকবেন কারণ এইরকম অদ্ভুত রকমের সুন্দর একটা ভালোবাসার গল্প বলিউডে ‘গুজারিশ’-এর পর খুব একটা আসেনি।

বরুণ ধাওয়ানের বিরেুদ্ধে অনেকে অভিযোগ করেন কমেডি ছাড়া তিনি কিছু পারেন না, যা সাফল্য পান সবই বাপের জোরে। ক্যারিয়ারে এখনো একটাও ফ্লপ না থাকার পরও নিজের প্রতিভার যে ভাগ্যকেই বেশি ‘দায়ী’ করা হয়। বরণ অক্টোবরে নিজের সমালোচকদের আক্ষরিক অর্থে চপেটাঘাতই করেছেন। এ ধরণের সিনেমায় যেমন এক্সপ্রেশন দেওয়া দরকার তাঁর সবটাই দিয়েছেন বরুণ।

এই ছবিটা অ্যাভারেজ ব্যবসা করেছে। সেই নিয়ে সম্ভবত আফসোস নেই বরুণের। ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে এমন কোনো একটা পারফরম্যান্স খুবই জরুরী ছিল বরুণের জন্য। আবার একই সাথে এটাও সত্যি যে, টিকে থাকতে হলে একের পর এক বানিজ্যিক সিনেমা বরুণকে করতেই হবে। যেমনটা সালমান খান, শাহরুখ খান কিংবা অক্ষয় কুমাররা করছেন। মানুন আর নাই মানুন বলিউডের ৯০ শতাংশ দর্শক চান নাচে গানে ভরপুর বানিজ্যিক ছবি।

এই যেমন অক্টোবর বরুণের ক্যারিয়ারের সেরা কাজ, সমালোচকরাই বলছে। অথচ, বক্স অফিসে এই সিনেমা একদম টেনেটুনে ফ্লপ ঠেকিয়েছে। বরুণকে যেটা করতে হবে, দু’ধরণের সিনেমার মধ্যে একটা ভারসাম্য আনতে হবে। যেটা শাহরুখ-সালমানরা করেছেন। রাজ কুমার রাওদের সাথে তিনিই তো বলিউডের ভবিষ্যৎ।

যাই হোক আবারো সিনেমায় ফিরি।বাণিতা সান্ধুর ছবিতে ডায়লগ আছে হাতেগোনা দুই কি তিনটা। কিন্ত ১৯ বছরের এই তরুণী তার এক্সপ্রেশন দিয়েই বাকি সব পুষিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি সিনেমায় হোটেল ম্যানেজারের চরিত্রটা খুব ভাল ছিল। এই পরিচালক সুজিত সরকারই আগে ‘পিকু’ ও ‘ভিকি ডোনার’-এর মত সিনেমা বানিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

গানগুলো মোটামুটি। অনুপম রায়ের সঙ্গীত আয়োজনে রাহাত ফাতে আলীর গাওয়া ‘তাব ভি তু’ গানটা সবাইরই ভালো লাগবে। তবে, অরিজিৎ সিং আর সুনিধি চৌহানের গানগুলো অ্যাভারেজের চেয়ে বেশি কিছু মনে হওয়ার কথা নয়।

ছবিটার স্ক্রিন প্লে একটু স্লো, তবে কখনোই দেখতে বিরক্ত লাগবে না, এটা গ্যারান্টেড। ছবির সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পারেন তাহলে এর চেয়ে ভাল সিনেমা বলিউডে এই মুহূর্তে নেই। আপনি যদি যেকেনো জেনারের সিনেমা দেখে থাকেন, তাহলে এটা আপনার জন্য মাস্ট ওয়াচ। ‘অক্টোবর’ – অদ্ভুত এই ভালোবাসার গল্প  আগে কেউ দেখেনি। বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ক্ল্যাসিকাল রোম্যান্টিক ছবি হিসেবে এটা  বেঁচে থাকবে সম্ভবত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।