ম্যাচ প্রিভিউ: বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ড

নিউজিল্যান্ড দলটাকে বিশেষ পছন্দ করি এদের ক্যাপ্টেনদের প্রতি ফ্যাসিনেশনের কারণে। স্টিফেন ফ্লেমিং, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, কেইন উইলিয়ামসন- প্রত্যেকেই ক্রিকেটারের চাইতে ক্যাপ্টেন পরিচয়ে বেশি মনোযোগ পায় আমার কাছে। গেম প্ল্যান, ম্যাচ রিড, এক্সিকিউশন, রিসোর্স ইউটিলাইজেশনে বর্তমান সময়ের সবচাইতে স্মার্ট ক্যাপ্টেন মনে করি কেইন উইলিয়ামসনকে।

২০০৩ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ছিল আইসিসি সহযোগী সদস্য কানাডার বিপক্ষে। ম্যাচটা শেষ হয়েছিল গভীর রাতে, পরদিন ঈদ; কানাডার স্বল্প রানে গুটিয়ে যাওয়া দেখে বাংলাদেশ জিতবে ধরে নিয়েই ঘুমুতে গিয়েছিলাম, ঈদগাহে শুনি কানাডা জিতে গেছে।

এবারও ম্যাচ পড়ছে ঈদের আগের রাতে, প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।

২০১০ এর পরে নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ ম্যাচগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠেছে, অনেকটা পাড়ায় এলে দাদাগিরি, অন্য পাড়ায় ভেড়াগিরি। বিগত নয় বছরে দুই দল একে অপরের বিপক্ষে ৪টি ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে হোম-এওয়ে ভিত্তিতে। যে যার হোমে পেয়েছে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করেছে।

তবে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে বাংলাদেশ কিছুটা এগিয়ে, এ জায়গায় ফলাফলটা ২-১, কাল সুযোগ আছে ৩-১ এ উঠে যাওয়ার।

নিউজিল্যান্ড দলের বৈশিষ্ট্য বিশ্ব ক্রিকেটের বাকি দলের চাইতে আলাদা। তাদের টিম ফর্মেশন ৫-৩-৩। ৫ জন জেনুইন ব্যাটসম্যান, তিন জন মিনি অলরাউন্ডার, তিন জন ফ্রন্টলাইন স্ট্রাইক বোলার।

এই বৈশিষ্ট্যের হওয়ার কারণে তাদের বেশিরভাগ ম্যাচের ভাগ্য প্রথম ১৫ ওভারে নির্ধারিত হয়ে যায়। এই ১৫ ওভারে তাদের ফ্রন্টলাইন তিন বোলার প্রতিপক্ষের টপ অর্ডার গুড়িয়ে দেয়, মিনি অলরাউন্ডাররা সেই প্রেসারটাকে ইউটিলাইজ করে মিডল অর্ডারকে চেপে রাখে, ফ্রন্টলাইন বোলাররা রোটেশনালি ফেরত এসে অলআউট করে দেয়।

অন্যদিকে ব্যাটিংয়ে নামলে টপ অর্ডার থেকে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে মোমেন্টাম নিয়ে নেয়, প্রথম ৫ এর কেউ একজন ক্যারি করে, মিনি অলরাউন্ডাররা সাপোর্টিভ রোল প্লে করে।

যেসব ম্যাচে প্রথম ১৫ ওভারে বোলিং বা ব্যাটিংয়ে তাদের প্ল্যান কাজ করে না, জিততে তাদের বেগ পেতে হয় উপযুক্ত ফিনিশারের অভাবে, কিংবা মাঝওভারে উইকেট টেকিং বোলার না থাকায়।

আমরা যদি বোলিংয়ের দিকে তাকাই- ম্যাট হেনরি, ট্রেন্ট বোল্ট, ফার্গুসন। ব্যাটিংয়ে গাপ্টিল, মুনরো, উইলিয়ামসন, টেলর, লাথাম। মিনি অলরাউন্ডারের কোটা পূরণ করবে নিশাম, স্যান্টনার, গ্র‍্যান্ডহোম।

নিউজিল্যান্ডের দৌড় সাধারণত সেমি পর্যন্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও এই মিনি অলরাউন্ডার আধিক্যকেই বড়ো কারণ মনে করি, কারণ প্রেসার ম্যাচে দলের উইকলিংককে আড়াল করে রাখাটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

আগামীকালের ম্যাচে দুই দলই জয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে খেলতে নামছে। ঈদের সময় হওয়ায় বাংলাদেশের কয়েকজন খেলোয়াড়, বিশেষত মুশফিক এর মনোসংযোগ কিছুটা বিঘ্নিত হয় কিনা এটা একটা চিন্তার বিষয় হতে পারে। যতোই প্রফেশনালিজমের কথা বলি, আমাদের কালচারেই প্রফেশনালিজমের সংজ্ঞাটা কাস্টমাইজড প্রকৃতির।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ সুনির্দিষ্ট দুই জন ক্রিকেটারের কাছে হেরে বসে৷ একজন টিম সাউদি, অপরজন গাপটিল। সাউদিকে কাল খেলাবে না সম্ভবত, তবে গত সিরিজে ম্যাট হেনরি তামিম আর লিটনকে যেভাবে বেকায়দায় ফেলেছে সে সাউদির ভূমিকাটা নিয়ে নেয় কিনা তা নির্ভর করবে সৌম্য তাকে কতটা শাসন করতে পারে সেই নিয়ামকের উপর। গত সিরিজে সৌম্য তাকে যেভাবে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলেছিল সেই পৌরুষদীপ্ত ১০ টা স্কোরিং শট করতে পারলেই ম্যাচ বাংলাদেশের ফেভারে চলে আসবে অনেকটা।

কেইন উইলিয়ামসন, রস টেলর তাদের ব্যাটিং স্তম্ভ হলেও বাংলাদেশের বিপক্ষে ইনিংসের শুরুতে তাদের প্রায়ই ক্যাচ উঠাতে দেখেছি। ফিল্ডিংয়ে আরো ক্ষিপ্র হলে তাদের ঠেকানো যাবে৷

কোহলি একটা দারুণ কথা বলেছিল একবার – ‘হাফ চান্স বলতে কিছু নেই; চান্স অথবা মিস৷ যার ফিটনেস ভালো সে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এডভান্টেজ নিয়ে ক্যাচ নিবে, অন্যজন পারবে না, যে কারণে ওটাকে হাফচান্স মনে হবে।’

ফিল্ডিংয়ে হাফ চান্স বিলাসিতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে উইলিয়ামসন, টেলরদের আটকানো যাবে। তবে টম ল্যাথাম টাইপ ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের বিপক্ষে রান পায়। কেন পায় এ নিয়ে ভাবি প্রায়ই। কয়েকটা হাইপোথিসিস আছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কনভিন্সিং কিছু না পাওয়ায় বিস্তারিত লিখছি না।

বাংলাদেশের নতুন কোচ কাজ শুরু করেছে এক বছরও হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ ( হোম-এওয়ে), এশিয়া কাপ, জিম্বাবুয়ে সিরিজ, নিউজিল্যান্ড সিরিজ, আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ – তাঁর কর্মকালে এখনো পর্যন্ত এটাই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সূচি। তার সাথে বিসিবির চুক্তি ২০২০ এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত। চুক্তি নবায়ন হবে কিনা নির্ভর করছে, আমার ধারণামতে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কয়টি ম্যাচ জিতলো সেই নিয়ামকের উপর।

প্রত্যেক কোচেরই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের খেলোয়াড় থাকে, এবং সেটা থেকে তার গেমপ্ল্যান বোঝা যায়। এখনো পর্যন্ত তার গেমপ্ল্যান পর্যবেক্ষণ করে যা বুঝেছি –

  • সে ধরেই নিয়েছে বাংলাদেশের বোলিং দিয়ে ইমপ্যাক্ট তৈরি করা যাবে না, জিততে হবে ব্যাটিং দিয়ে। আগে ব্যাট করে যতটা বেশি সম্ভব রান করো, যাতে চেইজ করতে গেলে প্রতিপক্ষ কিছুটা প্রেসারে থাকে, আঁটসাট বোলিং করে ব্যাটসম্যানকে অ্যাগ্রেসিভ শট খেলতে বাধ্য করো। অথবা আগে ফিল্ডিং করে ৩০০-৩১৫ এর মধ্যে আটকাও, তারপর সব ব্যাটসম্যান কিছু কিছু রান করে চেইজ করার চেষ্টা করো। ফলে বোলারদের উইকেট নেয়া তার কাছে যতটা গুরুত্ব বহন করে, সে কত রান খরচ করলো সেটার গুরুত্ব অনেক বেশি।
  • সে এক ম্যাচে দুই, আরেকটাতে ১০০, পরেরটায় ২৫ করা ব্যাটসম্যানের চাইতে প্রতি ম্যাচে ২২-২৩ করা ব্যাটসম্যানকে পছন্দ করে। যদিও সেই ব্যাটসম্যানের সামর্থ্য ওটুকুই, তবু মাসকাবারি চাকরির মতো নিশ্চিত ওই কয়টা রান তাকে অধিক আশ্বস্ত করে।

এই কৌশল দিয়ে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, জিম্বাবুইয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং সবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে। সুতরাং তার গেমপ্ল্যানে এখনো পর্যন্ত ফাটল চোখে পড়েনি। একজনমাত্র উইকেট টেকিং বোলার দিয়ে একাদশ সাজানো সত্ত্বেও যদি ম্যাচ জেতা যায়, কৌশল পরিবর্তনের প্রয়োজন কী!

সুতরাং নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও অপরিবর্তিত একাদশ নিয়ে নামবে দল, যদি দুর্ভাগ্যবশত কেউ ইনিজুরিতে না পড়ে।

ফলে কালকের ম্যাচের গেমচেঞ্জিং প্লেয়ার মূলত ২ জন- সৌম্য আর মুস্তাফিজ। এদের একজন যদি ১৩১+ স্ট্রাইকরেটে একটি ৪৩+ ইনিংস না খেলে এবং আরেকজন বোলিংয়ে ৩ উইকেটের কম পায়, ম্যাচ জয়ের আশা দেখি না।

তবে সৌম্য অনেকটাই তামিমনির্ভর প্লেয়ার। তামিম যদি সহজাত খেলা না খেলতে পারে সৌম্যের কুইক ফায়ারের সম্ভাবনা খুবই কম। ওদের ৩ ফ্রন্টলাইন বোলারের প্রথম ১৩ ওভার চালিয়ে খেলতে পারলে নিশাম, স্যান্টনার, গ্র‍্যান্ডহামকে খেলে বড়ো স্কোর গড়া একেবারেই অসম্ভব হবে না।

বিপরীতক্রমে মুস্তাফিজ যদি গাপ্টিলকে টপ এজড করতে পারে, এবং সাকিব উইলিয়ামসনকে টার্গেট করে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে নেয়া সহজ হয়ে যাবে।মাশরাফি নতুন বলে বোলিং না করলে মিড ওভারে রান বেশি দেয়। তার প্রথম ছয় ওভার এখনো ভাইটাল।

গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে মোসাদ্দেকের বোলিং খুবই ইফেক্টিভ হয়ে উঠেছিল। মোসাদ্দেকের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকার ক্ষেত্রেও দুটো ফ্যাক্টরের একটা হতে পারে এটা৷ (অন্যটা সাকিবের ইনজুরির ক্ষেত্রে ব্যাক আপ)। মোসাদ্দেকের পারফরম্যান্সও পার্থক্য এনে দিতে পারে

কোচকে নিয়ে এতো কথা লেখার কারণ, সে বাংলাদেশকে সম্ভবত নিউজিল্যান্ড স্টাইলের দল বানাতে চাচ্ছে। তার এই চাওয়ার প্রসেসে এখনো পর্যন্ত প্রধান যে ত্রুটিটি লক্ষ্য করেছি, নিউজিল্যান্ড আর বাংলাদেশের কন্ডিশন পুরোপুরিই আলাদা। তাছাড়া মিনি অলরাউন্ডারদের শেল্টার দিতে তাদের ২-৩ জন জেনুইন উইকেট টেকার থাকে সবসময়ই। আমাদের কই সেটা?

যে কোনো কোচ আসেই শর্ট টার্ম লক্ষ্য নিয়ে, তাঁর দুর্ভাগ্য – চাকরিকালে সে দু’টি বিশ্বকাপ পেয়ে গেছে, যে কারণে সমশক্তির দলের বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ জয় দিয়ে সমর্থকদের মন পাওয়া যাবে না, উলটো তাদের আরো প্রত্যাশা তৈরি হবে। মিনি অলরাউন্ডার খেলানোর চাইতে বাঁহাতি স্পিনার দিয়ে বোলিং ইউনিট ভরতি করার যে স্টাইল ছিল এককালে, সেটাও বেশি ইফেক্টিভ হবে।

কারণ, আমাদের মিনি অলরাউন্ডাররা ব্যাটিংয়ে ভরসা দিতে পারে না, বোলিংয়ে থ্রেট তৈরি করতে পারে না। সৌম্য, মুস্তাফিজ আর সিনিয়র পাঁচ জনের যে কোনো দু’জন যদি সার্ভিস দেয়া জারি রাখতে পারে উইকলিংক ঢেকে রাখা যাবে আশা করি। জয়ের আনন্দেই ঈদ হোক অনাবিল প্রশান্তিময়।

ম্যাচ প্রেডিকশন

  • প্রথম ১৩ ওভারে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ১উইকেট হারিয়েছে, বাংলাদেশ ৬৭, নিউজিল্যান্ড ৩৩
  • প্রথম ১১ ওভারের মধ্যে গাপ্টিল আর মুনরোকে মুস্তাফিজ আউট করেছে, বাংলাদেশ ৭৯, নিউজিল্যান্ড ২১
  • ম্যাট হেনরি প্রথম স্পেলেই সৌম্য আর তামিম/ সাকিবের একজনকে তুলে নিয়েছে, নিউজিল্যান্ড ৮৯, বাংলাদেশ ১১
  • গাপটিল আর মুনরোর কেউ একজন ১৩ ওভারের পরেও রয়ে গেছে, নিউজিল্যান্ড ৭১, বাংলাদেশ ২৯

পরিশেষে পরিতাপ

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়গুলোতে রুবেলের ভূমিকা ছিলো বরাবরই। কাল ঈদের দিনের ম্যাচে ড্রেসিংরুমে বসে কোচকে মিষ্টিমুখ করিয়ে ক্রাউন সিমেন্টের বিজ্ঞাপন দিয়ে সেও হয়তো বলবে – ‘ your building, my country cement, we are very proud sir!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।