নিজেদের গৌরবময় অতীতকে অপমান করবেন না!

সত্তর দশকের গোড়ায় ‘নতুন প্রভাত’ ছবিতে আগমন ঘটে এক নতুন নায়িকার। সুন্দরী, স্টাইলিশ, স্মার্ট সেই নায়িকার নাম নূতন। প্রথম ছবি মুক্তির পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক ছবি তাঁকে প্রথম সারির নায়িকার কাতারে নিয়ে আসে। সোশ্যাল ড্রামা, ফোক, ফোক ফ্যান্টাসি ছবি যেমন করেছেন তেমনি ভ্যাম্প কুইন হিসেবেও পর্দায় এসেছেন হরহামেশা। নেগেটিভ চরিত্রও করেছেন সাবলীলভাবে।

নূতন অনেক দিক থেকেই স্বতন্ত্র এক নাম বাংলা চলচ্চিত্রে। মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত প্রথম ছবি ‘ওরা ১১ জন’-এর অংশ হতে পেরেছিলেন নূতন যা তাঁর ক্যারিয়ারের অনেক বড় পাওয়া। নূতন বাংলাদেশে লাক্সের প্রথম মডেল। সুবর্ণা, শামীম আরা নীপা, শাকিলা জাফর, চম্পা, শমী,বিপাশা, মিমি,মৌসুমি সহ আরো অনেক শীর্ষতারকা লাক্সের মডেল হলেও ১৯৮৩ সালে নূতনই প্রথম মডেল হিসেবে উদ্বোধন করেছিলেন সেই দিগন্তের।

নূতন সাহসী অভিনেত্রী। আবেদনময়ী ও খোলামেলা সাজপোষাকে তিনি কখনোই জড়তা রাখেননি। চ্যালেঞ্জ নিতেও তিনি আত্নবিশ্বাসী ছিলেন। বাংলাদেশের কমেডি কিং দিলদার কে নায়ক করে নির্মিত ‘আব্দুল্লাহ’ সিনেমায় তাই তিনি নির্দ্বিধায় দিলদারের নায়িকা হয়েছিলেন। কয়েক শতাধিক ছবির মাঝে নূতনের মানসম্মত ছবির সংখ্যা নেহাত কম নয়। অনেক ভাল ও ব্যবসাসফল ছবি রয়েছে তাঁর ক্যারিয়ারে। সু-অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরুপ পেয়েছেন বাচসাস ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার।

রতনে যেমন রতন চিনে, তেমনি নায়করাজ রাজ্জাক নূতনকে চিনেছিলেন। শাবানা, ববিতা, কবরী, রোজিনাদের দাপট ও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে বেশিরভাগ পরিচালকই নূতনকে শক্তিশালী চরিত্র দেয়নি। অনেক ছবিতেই তাঁকে সেকেন্ড লিড করতে হয়েছে। তবে রাজ্জাক তাঁর পরিচালিত ও প্রযোজিত বেশিরভাগ ছবিতেই নূতনকে নিয়েছেন প্রধান নায়িকা হিসেবে।

বৈকুন্ঠের উইল অবলম্বনে যখন রাজ্জাক ‘সৎ ভাই’ ছবিতে তাঁর বিপরীতে নূতনকে কাস্ট করেন তখন অনেকে বলেছিলেন এটাতো শাবানার চরিত্র, শাবানা ছাড়া আর কাউকে মানাবেনা। কিন্তু রাজ্জাক নূতনে ভরসা রেখেছিলেন। ‘কাবিন’ ছবিটি রাজ্জাক-নূতন জুটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি।

বাংলাদেশে কমেডি কখনো তেমন ভাল হয়না। যে দু’চারটা ভাল কমেডি হয়েছে তার মাঝে ‘মি: মাওলা’ অগ্রগণ্য। এই ছবিতেও রাজ্জাকের সাথে নূতনের ছিল দাপুটে অভিনয়। প্রেমের ছবি ‘মালামতি’-তে রাজ্জাকের সাথে নূতনের দারুন অভিনয় এখনো চোখে লেগে আছে। ‘বদনাম’ ছবিটিও এ জুটির উল্লেখযোগ্য কাজ।

রাজ্জাক সর্বশেষ নূতনকে নিয়েছেন ‘কোটি টাকার ফকির’ ছবিতে। নৃত্যপটীয়সী নূতন অনেক ছবিতে দেখিয়েছেন তাঁর নাচের নৈপুণ্য। ক্যাবারে ডান্স, ভিলেনের ডেরায় উদ্দাম নাচ যেমন প্রচুর নেচেছেন তেমনি ‘পাগলা রাজা’ ছবির ‘সে সাজা আমায় দাও গো রাজা’ গানে ক্ল্যাসিক নাচেও তিনি অনন্য।

এতোসব গুণে মোহিনী নূতনকে দেখলে আজ সত্যিই কষ্ট হয়। কয়েকবছর ধরেই উনি যেসব চরিত্রে অভিনয় করছেন তা এক কথায় থার্ডক্লাস। নেগেটিভ চরিত্র করা বেশ কঠিন তবে নেগেটিভ চরিত্র করলেই যে চুলে এমন অদ্ভুত রং মেখে, স্লীভলেস ব্লাউজ পরে, সারা গায়ে ১০/১২ কেজি ওজনের গয়না পরতে হয় তা নূতনকে না দেখলে বোঝা যেতোনা। একজন খ্যাতিমান প্রবীণ অভিনেত্রীর এমন মতিভ্রম মেনে নেয়া যায়না।

সিনেমার বাইরেও তিনি উদ্ভট সাজপোষাক পরেন তবে সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু সিনেমায় এইসব ভাঁড়ামো করলে তার সমালোচনা করার অধিকার দর্শকের আছে। সর্বশেষ যে তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞাপনচিত্রে অংশ নিয়েছেন তাঁর কথা না বললেই না!

একজন নন্দিত অভিনেত্রী নিজের নির্বুদ্ধিতা ও ব্যক্তিত্বহীনতার কারণে নিন্দিত হয়ে পড়েছেন। পরিচালকেরা যদি ভাল চরিত্র না দিতে পারে তবে সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি অনুরোধ, দয়া করে সিনেমা করবেন না। নায়ক-নায়িকার মা-বাবা হিসেবে পর্দায় ১০ মিনিট চেহারা দেখিয়ে নিজেদের গৌরবময় অতীতকে অপমান করবেন না। আশা করি, নূতনের সুমতি ফিরবে, তিনি আবার নন্দিত হয়ে উঠবেন এটাই প্রত্যাশা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।