সাহিত্যের পাতা থেকে রুপালি পর্দায়

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বাংলা সাহিত্য বরাবরেই বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ ও ছিল সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত এই ৬০ বছরে বেশ সংখ্যক সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সিনেমাগুলোও হয়েছে দর্শকনন্দিত ও পুরস্কৃত। সেই সুবাদে চলচ্চিত্রাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যিকরা পেয়েছেন বিশেষ মর্যাদা। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা বারোজন সাহিত্যিকদের বারোটি বিশেষ সাহিত্যসৃষ্টির চলচ্চিত্ররুপ নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন।

  • তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)

প্রখ্যাত উপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মনের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অবলম্বনে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন ঋত্বিক ঘটক। এটি হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র। দর্শকপ্রিয় ও সমালোচকদের কাছে এই প্রশংসিত ছবিটি ব্রিটিশ ফ্লিম ইনস্টিউটের জরিপে শীর্ষস্থান অর্জন করেছিল। ওস্তাদ বাহাদুর খানের সঙ্গীত ও বেবী ইসলামের অসামান্য চিত্রগ্রহন এই ছবিটিকে অন্যরকম পূর্ণতা দিয়েছিল। তিতাস নদীর পাড়ে ববসবাসরত জেলে পাড়ার মানুষদের জীবনযাত্রা নিয়ে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রোজি আফসারী, গোলাম মুস্তফা, প্রবীর মিত্র, রানী সরকার,রওশন জামিল,কবরী সহ আরো অনেকে।

  • বসুন্ধরা (১৯৭৭)

স্বনামধন্য সাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ অবলম্বনে সুভাষ দত্ত নির্মান করেন ‘বসুন্ধরা’। মুক্তিযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্ট নিবেদিত দর্শক ও সমালোচক প্রিয় এই ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র সহ মোট ছয়টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। সাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ সেরা কাহিনীকারের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। সত্য সাহার সঙ্গীতে এক তরুন চিত্রকরের চিত্র প্রদর্শনীতে এক অপূর্ব চিত্র নিয়ে আলোচিত হওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ববিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন, নূতন, সৈয়দ হাসান ইমামসহ আরো অনেকে।

  • সারেং বউ (১৯৭৮)

শহীদ বুদ্ধিজীবী ও উপন্যাসিক শহিদুল্লাহ কায়সারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘সারেং বউ’ অবলম্বনে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। সেরা অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এই ছবিটি দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে বাংলা চলচ্চিত্রে কালজয়ী ছবি হিসেবে স্থান পেয়েছে। আলম খানের সঙ্গীতে বাংলার কোন এক গ্রামে সারেং বউ নবিতনের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠা নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন কবরী, ফারুক, আরিফুল হকসহ আরো অনেকে।

  • সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯)

বিশিষ্ট উপন্যাসিক আবু ইসহাকের বিখ্যাত উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ অবলম্বনে একই শিরোনামে সিনেমাটি যৌথভাবে নির্মান করেন মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। এটি বাংলাদেশের প্রথম সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। দর্শক ও সমালোচক মহলে ব্যাপক প্রশংসিত এই ছবিটি কালজয়ী ছবির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পাবার পাশাপাশি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট সাতটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। সাহিত্যিক আবু ইসহাক ও অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের জাতীয় পুরস্কার। জয়গুন নামের এক গ্রাম্য মায়ের সন্তানসহ জীবন সংগ্রাম সাথে কিছু গ্রাম্য কুসংস্কার ফুটে উঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, ইলোরা গওহর, এটিএম শামসুজ্জামানসহ আরো অনেকে।

  • রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত (১৯৮৭)

অমর কথাশিল্পী শর‍ৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘শ্রীকান্ত’ অবলম্বনে বুলবুল আহমেদ নির্মান করেন ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’। দর্শক ও সমালোচক প্রিয় এই ছবিটি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট তিনটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। এক সাধারণ যুবক আর এক বাঈজীর প্রেম, বিচ্ছেদ, সামাজিক অবস্থা ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন শাবানা, বুলবুল আহমেদ, নূতন, প্রবীর মিত্রসহ আরো অনেকে।

  • শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯২)

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ অবলম্বনে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রযোজিত এই ছবিটি বেশ দর্শক ও সমালোচক প্রিয়।আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পাবার পাশাপাশি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট চারটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের জাতীয় পুরস্কার। এক মধ্যবিত্ত সাধারন পরিবারের সুখ, দু:খ, জীবনযাত্রা অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, চম্পা, সুবর্ণা মুস্তফা, নাজমা আনোয়ার, মমতাজউদ্দিন আহমেদসহ আরো অনেকে।

  • পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯৩)

বিখ্যাত উপন্যাসিক মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন গৌতম ঘোষ। ছবিটি দুই দেশেই বেশ দর্শক ও সমালোচক প্রিয়তা পায়। ভারতের জাতীয় পুরস্কারে সেরা বাংলা ছবির পুরস্কার পাবার পাশাপাশি বাংলাদেশে সেরা চলচ্চিত্র সহ মোট পাঁচটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। পদ্মাপাড়ের জেলেদের জীবনযাত্রা ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, চম্পা, রুপা গাঙ্গুলী, উৎপল দত্তসহ আরো অনেকে।

  • দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬)

জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালের জনপ্রিয় কিশোর উপন্যাস ‘দীপু নাম্বার টু’ অবলম্বনে সরকারী অনুদানে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন মোরশেদুল ইসলাম। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র। দর্শক ও সমালোচক প্রিয় এই ছবিটি দু’টি বিভাগে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। কিশোর বয়সের সম্পর্কের টানাপোড়ন, বন্ধুত্ব, কৌতুহল সবকিছুই অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, অরুণ সাহাসহ আরো অনেকে।

  • হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭)

স্বনামধন্য নারী কথাশিল্পী সেলিনা হোসেনের বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ অবলম্বনে সরকারী অনুদানে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। দর্শক ও সমালোচক প্রিয় এই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। ছবিটি সেরা অভিনেত্রীসহ মোট তিনটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনও অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের জাতীয় পুরস্কার। একজন সাধারণ গ্রাম্য মায়ের চোখে সন্তান, দেশ, স্বাধীনতা অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন সুচরিতা, সোহেল রানা, অরুনা বিশ্বাস, রাজিবসহ আরো অনেকে।

  • লালসালু (২০০১)

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত উপন্যস ‘লালসালু’ অবলম্বনে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন তানভীর মোকাম্মেল। দর্শক ও সমালোচক প্রশংসিত এই ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র সহ মোট নয়টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও অর্জন করেন সেরা কাহিনীকারের জাতীয় পুরস্কার। গ্রাম্য সমাজে ধর্মীয় কুসংস্কার উপজীব্য করে ফুটে ওঠা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, মুনিরা ইউসুফ মেমী, চাঁদনী, তৌকির আহমেদসহ আরো অনেকে।

  • হাজার বছর ধরে (২০০৫)

প্রখ্যাত উপন্যাসিক জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ অবলম্বনে সরকারী অনুদানে একই শিরোনামে সিনেমাটি নির্মান করেন কৌহিনূর আক্তার সুচন্দা। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ছবিটি সমালোচকদের কাছেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়। আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি ছবিটি সেরা চলচ্চিত্রসহ মোট সাতটি শাখায় জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। সেরা কাহিনীকার হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন সাহিত্যিক জহির রায়হান। গ্রাম বাংলার আবহমান জীবনধারা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক, কুসংস্কার নিয়ে নির্মিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন রিয়াজ, শশী, এটিএম শামসুজ্জামানসহ আরো অনেকে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।