বিশ্বকাপ নয়, এলিটকাপ!

বিশ্বকাপ বলতে আমরা বুঝি যেখানে বিশ্বের সব দলেরই অংশগ্রহণ থাকে, অধিকার থাকে। দক্ষতার লড়াই, জয়পরাজয়ের হিসাব ছাপিয়ে বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে সার্বজনীন উত্তেজনার অংশ।

‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হয় ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে।

একটি সুনির্দিষ্ট পন্থায় বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজনে, ফলে অনেক পিছনের দলও চমক দেখিয়ে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়। প্রতিযোগী বেশী, তাই সব দলই উন্মুখ হয়ে থাকে এ আসরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে।

এতগুলো দলের অংশগ্রহণ ফুটবল বিশ্বকাপে দারুণ উত্তেজনা আবহ সৃষ্টি করে। এ উত্তেজনাই তাকে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ সম্মান এনে দিয়েছে।

ফিফা বিশ্বকাপের মত এতগুলো দেশ খেলানো ক্রিকেটে এই মুহূর্তে সম্ভব না কারণ ক্রিকেটের বেসিক স্কিলটাই বেশিরভাগ দেশের এখনো শুরু হয়না বা ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা অনেক দেশেই কম কারণ তারা ক্রিকেটকে শুধু গরম দেশের খেলা মনে করে। ফুটবলে দুর্বল দলও আক্রমণাত্মক মেজাজ দিয়ে খেলা জমিয়ে দিতে পারে, এক গোলে সেকেন্ডেই বদলে দিতে পারে খেলা। কিন্তু ক্রিকেট অপেক্ষাকৃত জটিল। এখানে অনেকগুলো জিনিসে স্কিল দেখাতে পারলে তবেই মেলে সাফল্য। সে ধরণের স্কিল অর্জন করতে প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

সারাবিশ্বের গুটিকয়েক জায়গা থেকে আইসিসি বিশ্বকাপে অংশ নেবে দলগুলো।

তাই বাছাইপর্বের মাধ্যমে উঠিয়ে আনা হয় দলগুলোকে। কিন্তু তবুও নিয়মিত ক্রিকেট খেলা দলের সংখ্যা নেহাত কম না। এখন অব্দি ১৮টি দেশ খেলেছে বিশ্বকাপ – অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলংকা, কানাডা, নেদারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জিম্বাবুয়ে, বাংলাদেশ, স্কটল্যান্ড, নামিবিয়া, কেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, বারমুডা, আফগানিস্তান।

যার ভেতর আইসিসির পূর্ণ সদস্য ১০টি দল, বাকিরা সহযোগী সদস্য। এছাড়াও নেপাল, হংকং বেশ সাড়া জাগিয়েছে। ক্রিকেটে আগ্রহী হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ব্রাজিলের মত দেশ।

সেক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট খেলার পরিধি সম্প্রসারণে বিশ্বকাপে দলের অংশগ্রহণ যেখানে বৃদ্ধি পাবার কথা, সেখানে কমিয়ে দেয়া হচ্ছে প্রতিযোগী সংখ্যা। এতে হয়তো মান ভালো থাকছে কিন্তু বিশ্বকাপের আসল উদ্দেশ্য বজায় থাকছে না। সবার সুযোগতো দূরে থাক, যোগ্য দলগুলোই পাচ্ছেনা সুযোগ।

এবারের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বতে বাদ পড়লো জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ড। এই নীতির জন্য প্রথম সহযোগী দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে যাওয়া কেনিয়া আজ হারিয়ে গেছে। আর আজ একসময়ের প্রতাপশালী দল জিম্বাবুয়ে আজ হারানোর পথে। ঋণগ্রস্ত দেশটি এই বিশ্বকাপকেই ধরেছিল তুরুপের তাস।

দুই টেস্ট খেলুড়ে দেশকে এবার দেখা যাবে না বিশ্বকাপে

কিন্তু ভাগ্যের বিড়ম্বনায় বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখতে পারল না। আরেক টেস্ট খেলুড়ে দেশ আয়ারল্যান্ডের না থাকা আরেক হতাশার ব্যাপার যেখানে তারা গত তিনটি বিশ্বকাপেই বড় দলকে হারিয়ে দেখিয়েছে চমক। এ বিশ্বকাপে তাদের অনুপস্থিতি হয়তো বড়দলগুলোর আপসেট এড়ানোর স্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে!

এই দলগুলোকে বাদ দিয়ে শুধু পূর্ণ সদস্যদের নিয়ে কি করে হতে পারে বিশ্বকাপ? বড় দলগুলোকে নিয়ে করা চ্যাম্পিয়নস ট্রফিই কি যথেষ্ট নয়? বিশ্বকাপের মূল লড়াইয়ে অন্তত ১৬টি দেশ অংশগ্রহণ করলে সেটি দৃষ্টিনন্দনযোগ্য হবে।

প্রত্যেকটি খেলোয়াড় চায় একবার হলেও নিজেকে বিশ্বের মঞ্চে প্রমাণ করতে, নিজের দেশকে প্রমাণ করার সুযোগ পেতে। যোগ্যতা থাকা সত্বেও যখন সে সুযোগ মেলে না তখন খেলার ইচ্ছে অনেকটাই নষ্ট হয়, এবং অভিজ্ঞ ও দক্ষ বড়দলগুলোর সাথে খেলার সুযোগ না পেলে ক্রিকেটে উন্নতি করা অসম্ভব। সেক্ষেত্রে ক্রিকেটখেলুড়ে দেশ কমতে থাকবে কখনোই বাড়বে না, এ চিন্তাটি মাথায় না এনে শুধুমাত্র দর্শক বাড়ানোর চিন্তা করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশ্বকাপে দল বাড়লে দর্শক এমনিতেই বাড়বে। সবাইই চাইবে নিজের দেশের খেলা দেখতে।

এভাবে কিছু এলিট দল নিয়ে খেলা টুর্নামেন্ট কখনোই বিশ্বকাপ হতে পারেনা, তা এলিট কাপ হয়েই থাকবে। এবারে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশ নেওয়া দলগুলো মধ্যে পার্থক্যও ছিল ১৯-২০।  ক্রিকেট কর্তাব্যক্তিদের হুশ না ফিরলে ক্রিকেট বিশ্বকাপ আর ছোটদেশগুলোকে উদ্বোলিত করবে না, তা পোর্টারফিল্ড, রাজাদের মত হতভাগ্যদের স্বপ্নভঙ্গের বোবাকান্না হিসেবেই থেকে যাবে।

আইসিসি বরাবরই বলে এসেছে যে, তারা ক্রিকেট বিশ্বায়নের পক্ষে। ক্রিকেটকে তারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চায়। যদিও, হঠাৎ করে বিশ্বকাপের দল সংখ্যা কমিয়ে ফেলাটা তাদের নীতির পক্ষে রায় দেয় না। অথচ, ২০২৬ সাল থেকে ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিবে ৪৮ টি দল। এমনকি আগামী বছর থেকে বাস্কেটবল বিশ্বকাপেও দল সংখ্যা ২৪ থেকে বেড় ৩২ হবে। তাহলে, ক্রিকেটকে পিছিয়ে রাখার যুক্তি কি?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।