যেখানে পায়ের খেলাতেও যুদ্ধ

১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপের প্রথম আসর। এরপর আরো ১৯ বার দেখা হয়েছে ফুটবলের মহা আসর। এই ২০ আসরে মোট ম্যাচ হয়েছে ৮৩৬ টি। এই ম্যাচগুলোর মধ্যে কিছু বিশেষ ম্যাচ আছে যেগুলো গুরুত্ব, ম্যাচের ফলাফল এবং মাঠে দু’দলের অসাধারণ ফুটবলের জন্য এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে ক্লাসিক ফুটবলের সম্মান পেয়েছে এগুলো। আপনাদের সামনে তুলে ধরবো এমন কিছু অমর ম্যাচের গল্প।

বিশ্বকাপ ক্ল্যাসিক ম্যাচ( ১৯৯৮): আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড

ফকল্যান্ডের যুদ্ধ কিংবা ৮৬ বিশ্বকাপের ঘটনা – ম্যাচের আগে যথাক্রমে একজন আর্জেন্টাইন এবং ইংল্যান্ড দর্শকের মনে হয়তো এই দুটা ঘটনায় মনে পড়ছিল। ম্যাচটা শেষ হয় পেনাল্টি শ্যূট আউটে, আবার শুরুও হয় পেনাল্টি দিয়ে। ১২০ মিনিটের স্নায়ুর যুদ্ধে শেষ হাসি হাসে একটি দল। ব্যাক্তিগত ফুটবল শৈলির প্রদর্শনী, দলিয় নৈপুণ্য, বিতর্কিত রেফারির সিদ্ধান্ত, পেনাল্টি, লালকার্ড – কোনটা বাদ রাখবে ম্যাচটাকে মনে রাখার জন্য?

ম্যাচে দুই দলই পেনাল্টি পায়। প্রথমে পিছনে পড়েও লিড নেয় ইংল্যান্ড, পরে আবার লিড হারায়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠে ডেভিড বেকহ্যামের লালকার্ডের ঘটনা যেটা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় আরো চার বছর। নাটকে পরিপূর্ণ এই ম্যাচটি নিঃসন্দেহে ফুটবলের ক্ল্যাসিক ম্যাচগুলোর একটি।

  • পেছনের গল্প

বিশ্বকাপে এর আগে দেখা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ -র জন্য বিখ্যাত সেই ম্যাচের স্মৃতি ভোলার মতো না। ম্যাচ শুরুর আগে উত্তাপটা টের পাওয়া যাচ্ছিল। খোদ আর্জেন্টিনা অধিনায়ক ডিয়েগো সিমিওনে বলে বসলেন, ‘রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যাপারটা আলাদা করলেও, পুরো জাতির আকাঙখা একটাই – ইংল্যান্ডকে হারানো ।’ হবেই না বা কেন, বিশ্বকাপ নকাউট ম্যাচ বলে কথা।

এদিকে ইংলিশ ম্যাগাজিন ‘ফোর-ফোর-টু’ এর মতে ম্যাচের দিন অর্থাৎ ৩০ জুন ১৯৯৮ তারিখ সকালে অ্যাডিডাস একটি বিজ্ঞাপন ছাপে ডেভিড বেকহ্যামের ছবি দিয়ে। ছবির উপর ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘আজ রাতের পর ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচটা মানুষ মনে রাখবে খেলোয়াড়রা পা দিয়ে কি করতে পারে।’ নিশ্চিতভাবে ম্যারাডোনার হ্যান্ডবল গোলকে উদ্দেশ্য করে বলা।

এখানেই শেষ না। ইয়র্কের আর্কবিশপ ডেভিড হোপ ম্যারাডোনাকে উদ্দেশ্য করে আরেকটি বোমা ছুড়লেন, ‘আশা করি এবার ঈশ্বরের হাত না বরং ইংলিশ ফুটবলারের পা পার্থক্য গড়ে দেবে।’ অবশ্য এডিডাস কিংবা হোপ এর আশা একেবারে অপূর্ণ রাখেনি এই ম্যাচ – তবে তারা যেভাবে চেয়েছিল ঠিক সেভাবে পূরণ হয়নি তাদের প্রত্যাশা।

  • ম্যাচের গল্প

দুই ফুটবল জাতির সব আশা প্রত্যাশা মিলিত হয়েছে সেন্ট এটিয়েনে। উদ্দেশ্য মার্শেইতে ন্যাদারল্যান্ডের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে মিলিত হওয়া। তারকা ঠাসা দুইদলের খেলার শুরুতেই থাকে নাটক।

.

ইংল্যান্ড ভালভাবে শুরু করলেও আর্জেন্টিনাই প্রথম আঘাত দিতে সক্ষম হয়। একটি পরিকল্পিত আক্রমনের একমুহুর্তে নাম্বার টেন ওর্তেগা ডিবক্সমুখি সিমিওনিকে বল বাড়ান, মার্কারকে হারিয়ে সিমিওনি বলে টাচ লাগানোর আগে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক সিম্যান সেটা আটকাতে যান। চতুর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক সেখানে পেনল্টি আদায় করে নেন। ম্যাচের তখনো পাঁচ মিনিটও যায়নি, কিন্তু ওর মধ্যেই বাতিস্তুতার গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

.

মাইকেল ওয়েনের বয়স মাত্র আঠারো, কিন্তু বড় মঞ্চে লিভারপুলের বিস্ময়বালক এই বয়সেও ছিলেন অসাধারণ। গোলের পর ইংল্যান্ড ঘাবড়ে যায়নি, উলটো যেন তারাই চেপে বসে প্রতিপক্ষের উপর। পউল স্কোলসের বুদ্ধিদীপ্ত হেড থেকে বল নিজের দখলে নিতে ওয়েনে বক্সে ঢুকে গেলে সেখানে আয়ালা বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। চেষ্টা থেকে হয়তো একেবারেই সামান্য ছোঁয়া লাগে ওয়েনের গায়ে, কিন্তু সেটাই যথেষ্ট ছিল ওয়েনের জন্য। নিজেকে ছুড়ে দিলেন শুন্যে। আগের গোলের চার মিনিট যেতে না যেতেই আবারো পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।

রেফারির সীদ্ধান্তটা বিতর্কিত, অনেকের মতেই এটি পেনাল্টি না। রেফারি হয়ত ভুল ছিলেন কিন্তু ইংলিশ ফুটবলের সেরা স্ট্রাইকার এলেন শিয়েরার পেনাল্টিকে গোলে পরিণত করতে ভুল করলেননা। এর আগে আট ম্যাচ কোন গোল হজম করেনি আর্জেন্টিনা, কিন্তু এই গোলে তাদের ক্লিনশিট স্ট্রিক ভাঙার পাশাপাশি ম্যাচে সমতাও ফিরল ।

সেদিন যেই শিশুটা তার প্রথম তার প্রিয় দলের খেলা দেখতে বসেছিল সেও ইতিমধ্যে ফুটবলের উত্তেজনায় ডুবে গিয়েছে নিশ্চিত। কিন্তু সেই ম্যাচের সেরা মুহূর্ত আসে একটু পরেই।

.

উজ্জীবিত ইংল্যান্ড একাদশ যেন চড়াও হতে থাকে। আগের গোলে ওয়েনের পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু ম্যাচের ষোলতম মিনিটে সেই মাইকেল ওয়েনই উপহার দেন বিস্ময়কর এক গোল।

ব্যাকহামের একটা অসাধারণ লফটেড পাস খোঁজে নেয় ছুটে চলে ওয়েনকে। আর তাকে থামায় কে? প্রায় চল্লিশ গজ বলকে ড্রিবল করার পথে পিছনে ফেললেন হোসে চ্যামট এবং রবার্তো আয়ালাকে। এরপর সেকেন্ড বারে ঘেসে করলেন দলের দ্বিতীয় গোল। ইংল্যান্ড এগিয়ে গেল ২-১ এ। আর্জেন্টিনার দুঃস্বপ্ন যেন আরো দীর্ঘতর হলো। এরপর স্কোলস সুযোগ পেয়েছিলেন স্কোরলাইনকে ৩-১ করার কিন্তু সুযোগ নষ্ট করেন। কিন্তু সেটা যে ইংল্যান্ডের জন্য ব্যায়বহুল ছিল তা বোঝা যায় ম্যাচের পর।

.

প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে আর্জেন্টিনা বক্সের কাছেই একটি ফ্রি-কিক পায়। ইংল্যান্ড দেয়াল তৈরি করলো, ফ্রিকিক নিতে এলেন বাতিস্তুতা, পাশে দাড়ালেন সিমিওনে, একটু দূরে ভেরন। বাতিস্তুতা কিক নেয়ার জন্য দৌড়ে এলেন কিন্তু ইংল্যান্ড রক্ষন দেয়ালকে বোকা বানিয়ে বল ছেড়ে দেন। তার পিছন থেকেই ভেরন এসে ফ্রি-কিক থেকে বল বাড়িয়ে দেন সামনে – জটলা থেকে জানেত্তি বল রিসিভ করে বাঁ পায়ে দুর্দান্ত ফিনিশে সমতা আনেন ম্যাচে। ৪৫ মিনিট শেষে চার গোল হলেও কোন দলকেই আলাদা করা সম্ভব হয়নি।

.

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দশজনের দলে পরিণত হয় ইংল্যান্ড। সিমিওনে পিছন থেকে ফাউল করেন বেকহ্যামকে। মাটিতে পড়ে যান ইংলিশ তারকা, কিন্তু ‘বাচ্চাসূলভ’ আচরণ করে সিমিওনে পা দিয়ে ‘গুঁতো’ মারেন বেকহাম। তার দুর্ভাগ্য ঘটনাটা পরিষ্কার দেখেছেন রেফারি। তৈরি হলো উত্তেজনা, খেলোয়াড়দের জটলা।

রেফারি হলুদ কার্ড দেখালেন সিমিওনিকে ফাউলের জন্য, আর লাল কার্ড দেখান বেকহ্যামকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ফাউল করার জন্য। গ্যালারির দিকে হাটা ধরলেন বেকহ্যাম। অথচ সকালেই তার ছবি সম্বলিত পোস্টার ছেপেছিল এডিডাস। অবশ্য সেখানে ভুল কিছু লেখা ছিলনা – বেকহ্যাম পা দিয়ে খেলেই তার লাল কার্ডের বন্দোবস্ত করেন। এরপর দশজনের ইংল্যান্ড কতদুর ম্যাচ টানতে পারে সেটাই ছিল দেখার বিষয়।

.

ওই কার্ডের পরেই বোধয় ইংল্যান্ডের আরেকটি রূপ দেখতে পায় সেই ম্যাচ। পরের ৪৫ মিনিট ইংল্যান্ডের দশজন আর্জেন্টাইন ছন্দময় ফুটবলের সামনে দাঁড়িয়ে যান চীনের প্রাচীর হয়ে। প্রচণ্ড দৃঢ়তা, একাগ্রতা আর মনোবলে ইংল্যান্ড শুধু ৯০ মিনিটের খেলাতেই না, পুরো অতিরিক্ত সময়েও আর্জেন্টিনাকে হতাশ করে। সেই ম্যাচে নিজেদের উজাড় করে দেয় ইংল্যান্ড। এর ভিতরেও বিতর্ক থেমে থাকেনি, ৯০ মিনিটের খেলাতেই ক্যাম্পবেল এর একটি গোল বাতিল হয়ে যায়, কারণ জালে জড়ানোর আগে শিয়েরার ফাউল করেন রোয়াকে। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও দুইদলকে আলাদা করা যায়নি, ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।

টাইব্রেকারে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক সিম্যান প্রথম সেইভ করলেও সেটার সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যার্থ হন পাউল ইনসে। আয়ালার শটে ৪-৩ এ এগিয়ে থাকে আর্জেন্টিনা, এরপির ডেভিড বেটির শট সেইভ করলে আর্জেন্টিনা পেয়ে যায় কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেট।

  • প্রতিক্রিয়া

ইংল্যান্ড খারাপ খেলেনি, দশজনের দলে পরিণত হয়েও তাদের ছাপিয়ে যেতে পারেনি আর্জেন্টিনা – কিন্তু ইংল্যান্ড সেই বিশ্বকাপে আর এগোতে পারেনি। ম্যাচশেষে বেকহ্যামকে ড্রেসিংরুমে দেখা যায় ক্রন্দনরত অবস্থায়।

‘আমি আমার ছেলেকে জয়টা উৎসর্গ করতে চাই। ইংল্যান্ড তাদের ফুটবল দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল, তারা আমাদের বেশ কয়েকবার সমস্যায় ফেলেছে। এটা এমন একটা ম্যাচ যেখানে দুইদল খেলেছে হৃদয় দিয়ে, খেলায় দুইদলই সময়তায় ফিরেছে। খেলোয়াড়রা তাঁদের খেলাকে তুলে ধরেছে। একটা ম্যাচ এর চেয়ে বেশি উত্তজনাপূর্ণ হতে পারেনা। ইংল্যান্ডকে বিদায় করাটা ছিল অসাধারণ।’

– আর্জেন্টিনা কোচ পাসারেলে। উল্লেখ্য বিশ্বকাপের আঁগে তার ১৮ বছরের পূত্র সন্তান সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।

‘আমিই প্রথম ড্রেসিংরুমে যাই, দেখি বেকহ্যাম কাঁদছে। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম – ইডিয়ট, তোর জন্যই ম্যাচটা হেরেছি, আমি বিশ্বকাপে ভাল খেলার সুযোগ পাবনা আর! সে আমার দিকে তাকিয়ে দেখলো আসলে আমি মজা করে কথাগুলো বলছিলাম, কিন্তু সেটা তার হতাশা একটু হলেও কমাতে সাহায্য করেছিল।’

– ম্যাচে দুর্দান্ত খেলা ইংলিশ ডিফেন্ডার টনি অ্যাডামস।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।