নস্টালজিক নব্বই ও ব্যান্ড বনাম ক্লাসিকাল যুদ্ধের স্মৃতিচারণা

ইউটিউব ঘাঁটতে ঘাঁটতে বিটিভির অনেক পুরোনো এক ক্লাসিক গানের অনুষ্ঠানে খোঁজ পেলাম। দুই যুগ আগে ‘জলসা’ নামের এই অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছিলো। উপস্থাপনা করেছিলেন প্রয়াত আনিসুল হক। অনুষ্ঠানটিতে এসেছিলেন দুই প্রজন্মের, দুই ধারার শিল্পীরা। ক্লাসিকাল, নজরুল, রবীন্দ্র সঙ্গীতের শিল্পীরা এসেছিলেন, এসেছিলেন ব্যান্ড মিউজিকের শিল্পীরা।

ব্যান্ড মিউজিসিয়ানরা গেয়েছিলেন ক্লাসিকাল, রবীন্দ্র সঙ্গীত, আর অন্যরা গেয়েছিলেন ব্যান্ডের গান। এদিকে এসেছিলেন ফিডব্যাক, মাইলস, সোলস, রেনেসাঁর সদস্যরা, আর ওদিকে নিলুফার ইয়াসমিন, শাকিলা জাফর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যারা। গান ছাড়াও হয়েছিলো আড্ডা ও তর্ক,। তাতে অংশ নেন মুস্তফা মনোয়ার, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, কলিম শরাফি সহ আরো বিশিষ্ট জনেরা। গানে-আড্ডায় খুব জমেছিলো অনুষ্ঠানটা।

অনুষ্ঠানটা সৌহার্দ্য আর আন্তরিকতায় ভরপুর ছিলো, এবং অনুষ্ঠান শেষে সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করা শুরু করেছিলো, কিন্তু এর মধ্যেই দেখা গেছে আমাদের রক লিজেন্ডদের সেই সময়ের সংগ্রাম! সেই সময় বলা হতো ব্যান্ডের গান করে ধনীর বখে যাওয়া ছেলেরা, যাদের আর অন্য ভালো কাজ নেই। আর কালচারাল পুলিসিং তো ছিলোই!

কেন জোরে গান গায়, কেন এত বাজনা থাকে, কেন এত রাগ ওদের, কেন চুল বড় রাখে, কেন নাচানাচি করে! সেই সময় আমরা যারা ব্যান্ডের গান শুনতাম, তাদের নানারকম বক্রোক্তির সম্মুখীন হতে হতো। একটা ক্যাসেট কেনার টাকা বের করতে কত যে ঝক্কি পোহাতে হতো!

অনুষ্ঠানটিতে বিতর্কের বেশে সেই সময়ের বুদ্ধিজীবীদের অনেকের গোঁড়া মানসিকতা উঠে এসেছে। শাফিন আহমেদকে প্রশ্ন করা হলো, তার গানে ‘ওহ নো বেবি’ ইংরেজি বাক্য কেন এসেছে। মাকসুদকে প্রশ্ন করা হলো মেলায় যাইরে গানে বাসন্তী রঙ শাড়ি পরে ললনাদের হেঁটে যাওয়ার কথা এসেছে, গ্রামে তো বাসন্তী রঙ শাড়ি পরে ললনারা হাঁটে না বৈশাখী মেলায়, তাহলে এই গান কাদের জন্যে?

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, মুস্তফা মনোয়াররা জানালেন, ব্যান্ডের গান তাদের কাছে যতটা না শোনার, তার চেয়ে বেশি দেখার মনে হয়। তারা আন্তরিক অবজ্ঞায় বললেন যে গান পঞ্চাশ বা পাঁচশ বছর টিকে থাকে, সেটাই প্রকৃত গান। প্রকারান্তরে তারা বুঝিয়ে দিলেন, ব্যান্ডের গান টিকবে না।

স্রোতের প্রতিকূলে, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা খান আতাউর রহমান অবশ্য অনেক শক্তভাবে সমর্থন দিয়েছেন। মাকসুদ, হামিন, শাফিনের চেয়ে তার যুক্তিগুলোই বরং বেশি জোরালো ছিলো।

আজ ২৪ বছর পর সময় বদলেছে। এখন আর ব্যান্ডের গান শোনার কারণে কোন কিশোরকে কটু কথা শুনতে হয় না। এখন ব্যান্ডের গান-আধুনিক গান এইসব বিভাজন নেই। এখন রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীতে নানারকম ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করলে তেড়ে আসার মানুষ বলতে গেলে নেই।

আর আমাদের ব্যান্ডগুলি ১০০ বছর টিকে রাখার মত গান উপহার দিতে পেরেছে কি না, ক্লাসিক উপহার দিতে পেরেছে কি না, এই প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে গান বাছাই করতে মধুর সমস্যায় পড়ে যেতে হয়। সোলসের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ চল্লিশ বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। এলআরবির ‘চলো বদলে যাই’ এর মত গান আর কোনোদিন আসবে কি না জানি না।

আপনাদের ধন্যবাদ সময়ের মহানায়কেরা, আপনারা জন্মেছিলেন সেই যুগে এ কথা অহংকার করে বলতে পেরেছেন, তাই আমরা পথ হেঁটে যাই, হেঁটে হেঁটে বহুদূর যেতে চাই!

__________

সেই অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় ১৯৯৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। দুর্লভ ভিডিওটি দর্শক-পাঠকদের জন্য এখানে আবার দেওয়া হল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।