অঞ্জু ঘোষ ও বসন্ত মালতী

আমার ক্লাসমেট রমজানের বড়ভাই নূপুর সিনেমার অপারেটর। রমজান আমাকে বললো – আকবর আমার বড়ভাই বললো আজ নূপুর সিনেমায় অঞ্জু আসবে।

– সত্যি?

– সত্যি।

– বিদ্যা বল।

– বিদ্যা…….. কসম করে বলছি আজ অঞ্জু আসবে।

– কখন আসবে?

– তিনটায় শো-তে অঞ্জু দর্শকদের শুভেচ্ছা জানাবেন।

আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। লুকিয়ে লুকিয়ে সিনেমা দেখতাম। কারণ আমার মা যেমন আমাকে ভালোবাসতেন তেমনি আমাকে কড়া শাসন করতেন। ছোটদের সিনেমা দেখা ছিলো আমার মা’য়ের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ।

সিনেমা দেখার অভ্যাস হওয়ার পিছনে, আমার আরেক ক্লাসমেট নুরুল ইসলাম দায়ী। সে খুব সিনেমা দেখতো এবং সঙ্গদোষে আমিও সিনেমা পাগল হই।

অঞ্জু ছিলো তখন আমার খুব প্রিয় নায়িকা ও নারী। আমি তাঁর ভিউ কার্ড কিনে জমাতাম। তখন একটি ভিউ কার্ড এক টাকা।

স্কুল থেকে আসলাম দুপুর দুইটায়। এসে গোছল করে ভালো পোশাক পড়তাম। অন্য সময়ে সিনেমা দেখতে গেলে খেলার পোশাক পড়ে যেতাম। আমি স্কুলের ফুটবল দলের গোলকিপার ছিলাম। মা মনে করতো প্র্যাকটিস করতে যাচ্ছি। কিন্তু সেদিন ভালো পোশাক পড়ে গেলাম।

বাসা থেকে কোয়াটার মাইল দূরে নূপুর সিনেমা। আমি পৌনে তিনটায় কাউন্টার থেকে পাঁচ টাকা দিয়ে ফ্রন্ট ক্লাসের টিকেট নিলাম। আমি সবসময় ফ্রন্ট ক্লাসের টিকেট নিতাম, কারণ আমার ভাইয়েরা ফ্রন্ট ক্লাসের নিতো না। তাই ধরা পড়ার চান্স নাই। দ্বিতীয় কারণ হলো অর্থ।

আমি টিকেট নিয়ে ফ্রন্ট ক্লাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি সবসময় ভিতরের আলো নিভানো হলে প্রবেশ করতাম যাতে হলে পরিচিত কেউ থাকলে না চিনে। আমি বাতি নিভানোর অপেক্ষায় ছিলাম। হঠাৎ আমার পিছনে এসে দাড়িয়েছে আমার বড় ভাই (পরে জেনেছিলাম তিনি নায়িকা আসবে জেনেই ফ্রন্ট ক্লাসের টিকেট নিয়েছেন)।

আমাকে দেখে বললো – আকবর তুই?

আমি ভয়ে কাঁপতে শুরু করি। তিনি বললো – টিকেট নিয়েছিস?

– জ্বি।

– কতো দিয়ে?

– পাঁচ টাকা।

আমি চলে যেতে পিছনে ফিরলাম। তিনি বললো – কই যাস?

– বাসায়।

– না যাওয়ার দরকার নাই, ভিতরে ঢুক।

আমি ঢুকলাম। আমি সবার সামনে সিট পেয়েছি। আমি সিটে বসে ভয়ে কাঁপছি। কারণ আমি মহাবিপদে। বড় ভাই যদি মা-কে বলে তাহলে আমার রক্ষা নাই। মা জানে বড় ভাই সিনেমা দেখে, কারণ তিনি বড়। তিনি মা-কে বলবে এতে কোন সন্দেহ নাই আর তিনিও পছন্দ করেন না ছোটদের সিনেমা দেখা।

আমার সামনে একহাত দূরে ছোট্ট একটি মঞ্চ তৈরী ছিলো। ছবি শুরু হওয়ার আগে সেই মঞ্চে এলেন চিত্রনায়িকা অঞ্জু ও চিত্রনায়ক জাভেদ। তাঁরা ছবিতে বসন্ত মালতী (ছবির নাম ‘বসন্ত মালতী’)। আরো এলেন ছবির পরিচালক সেই সময়ের জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক ইবনে মিজান।

তাঁরা সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। অঞ্জুকে এতো কাছে পেয়েও তাঁর প্রতি আমার মন নাই। আমি আছি প্রচণ্ড ভয়ে।

তবুও যতটুকু অঞ্জুকে দেখলাম, এক কথায় ডানাকাটা পরী বলা চলে। পর্দায়ও এতো সুন্দর লাগতো না, যত সুন্দর বাস্তবে লেগেছিলো। আমার মন ভালো থাকলে হয়তো আরো সুন্দর লাগতো।

আর জাভেদ ছিলো অসম্ভব ফর্সা। এতো ফর্সা পুরুষ আর দেখি নি।

বাসায় সাড়ে ছয়টায় আসলাম। বড়ভাই আসবে রাত দশটায়। তিনি সব সময় রাত দশটায় আসতেন। আমি বিপদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।

রাতে আর ভাত খাই নি। শরীর জ্বরে পুঁড়ে যাচ্ছিলো। আমি যখনি কোন প্রকার ভয় পেতাম সাথে সাথে আমার জ্বর আসতো। এখনো আমার জ্বর আসে ভয় পেলে।

তিনি রাত দশটায় বাসায় এলেন কিন্তু কাউকে কিছু বললেন না। কি করে কি হয়ে গেল বুঝে উঠলাম না।

আমি যখন তারুণ্য প্রবেশ করি।তখন আমার জন্য সিনেমা দেখার অনুমতি ছিলো। এরপর যখন স্বাধীনভাবে সিনেমা দেখতাম,কিন্তু আগের মতো অ্যাডভেঞ্চার অনুভব করতাম না।

সেইসব দিনগুলো জীবন থেকে হারিয়ে গেছে, তবে স্মৃতি হয়ে আছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।