ডালাসে নোবেলের কনসার্ট ও আমাদের অদ্ভুত সাইকোলজি!

টেলিভিশন প্রোগ্রাম দেখা হয়না আজকে বহুযুগ হয়ে গেছে। সময় হয়ে উঠেনা। হয় রেকর্ডিং দেখি, নাহয় ইউটিউব, নেটফ্লিক্স ইত্যাদিতে যদি দেখা হয় কিছু, তাহলে দেখা। সিনেমা দেখা হয়। আর হ্যাঁ, মাঝে মাঝে লাইভ ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচ দেখা হয়, এই যা।

তা মাঝে বাংলাদেশে এক ছেলেকে নিয়ে খুব হৈচৈ উঠলো। সে ইন্ডিয়ার এক সংগীত প্রতিযোগিতায় গিয়ে ফাটিয়ে দিয়েছে। শ্রীকান্ত আচার্য্যি যে প্রোগ্রামের বিচারক, সেই প্রোগ্রামে ইন্ডিয়ান শিল্পীদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছে। তাঁর নাম নোবেল, সবাই ভালবেসে নাম দিয়েছে নোবেলম্যান।

তারপরেও শোনা হয়নি তাঁর গান।

বাঙালি কাউকে মাথায় তুলতে সময় নেয়না। ভাবলাম তেমনই কেউ হবে।

একদিন আমাদের ফরহাদ ভাই বললেন, ‘নোবেলকে ডালাসে আনবো!’

যারা চিনেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে, ফরহাদ ভাই একজন নাট্যকার। প্রবাসে বসে বাংলা টিভি চ্যানেলের জন্য নাটক নির্মাণের পাগলামি করেন। আমরাও তাঁর পাগলামিতে যোগ দেই। বহুদিন হয়ে গেছে ঠিক মতন পাগলামি করা হয়না। তাই আমি এবং আমার বৌ – দু’জনই প্রথমে ভেবেছি কিংবদন্তি মডেল নোবেলের কথা বলছেন। হয়তো কোন টিভি নাটক বানাবেন। জ্বি, আমরা এতটাই খ্যাৎ!

নোবেলের গান প্রথম শুনি যখন লোকজন তাঁর নামে বদনাম করতে শুরু করে।

‘ও গানের গ-ও জানেনা।’

‘ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চালবাজি, বেকুব বাঙালি বুঝে না। বাংলাদেশী দর্শক পেতে ইচ্ছা করে ওকে ধরে রেখেছে। নাহলে অনেক আগেই ফেলে দিত।’

কিছু মানুষতো ইতরামির সীমা ছাড়িয়ে তাঁর চেহারা নিয়ে কথা বলেছে।

‘ছাগলের মতন দাড়ি!’

‘দেখতেই ছাগলের মতন লাগে।’

যে এমন কথা বলছে, সে কী হৃ রোশন? ঐশ্বরিয়া রায়? না। সে নিজে আবুল আর জরিনা। কিন্তু কার চেহারা কেমন সেই বিষয়ে মতামত দিয়ে বেড়াচ্ছে।

তা এতটাই গুনগান এই যুবকের নামে, একবার শোনাই যাক না।

খুঁজতে কষ্ট হলো না। ফেসবুকে সবার টাইম লাইনেই তাঁর ভিডিও শেয়ার হচ্ছে। শুনলাম।

আমি বলবো না সংগীতে আমার ব্যাচেলর্স, মাস্টার্স, ডক্টরেট ডিগ্রি আছে। আমি মিঞা তানসেন। কিন্তু সুর তাল লয় সম্পর্কে বেসিক জ্ঞানতো আছেই। স্কুল জীবনে আমিও স্টেজে গান গাইতাম, এবং জন্ম থেকেই শ্রোতা। সুর বেসুরের পার্থক্য এই কান ঠিকই ধরতে পারে।

শ্রোতা হিসেবে নোবেলের কণ্ঠস্বর আমার খারাপ লাগেনি।

একদল বলে বেড়ালেন ওসব সাউন্ড মিক্সিংয়ের কারসাজি। যেমনটা আতিফ আসলামের নামে গায়ক অভিজিৎ বলে বেড়ান। ‘বেসুরো শিল্পী।’ তা অভিজিৎ নিজেও একজন দারুন কণ্ঠশিল্পী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রে নোবেলের সমালোচকদের একেকজনের গলার ছিরি ভয়াবহ। আমি মনে মনে বলি, বেসুরো গলা নিয়ে ছেলেটা একটি বিদেশী প্রতিযোগিতায় নিজের প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে ফেলেছে। এদিকে তুমি সুরসাগরে অবগাহন করেও এতদিনে ঘোড়ার আন্ডাটাও পাড়তে পারলে না! আহারে!

তারপরেও ধরলাম, ঠিক আছে। হতেই পারে টেকনোলজির কারসাজি। মেকাপের সাহায্যে বহু আগে থেকেই অনেক অসুন্দরী মেয়েকেও বিশ্ব সুন্দরী বানানো হচ্ছে। ‘অ্যাভাটার’ সিনেমা বানানো হয়ে গেছে এক যুগ আগে। সামান্য কণ্ঠস্বর বদল করা যাবেনা?

কালকে তাঁকে লাইভ শুনলাম। আমাদের শহর ডালাসেই। এবং তাঁর কট্টর সমালোচকদের জবাব দিতেই উপরওয়ালা এমন ব্যবস্থা করলেন যে সাউন্ড সিস্টেমে দুর্যোগ দেখা দিল। সে সাধারণত ট্র্যাকে গায়, কোন অবস্থাতেই ট্র্যাকের সাউন্ড শোনা যাচ্ছিল না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, একোস্টিক কনসার্ট হবে। এইখানে কোন ফাঁকিবাজি সম্ভব না। গিটার বাজবে, আর শিল্পী গাইবে। কোন ড্রামস, কীবোর্ড কিচ্ছু নেই। ঘরোয়া প্রোগ্রামের মতন ব্যাপার।

এবং নোবেল গাইলো।

আমার যা সবচেয়ে ভাল লেগেছে তা হচ্ছে তাঁর সরলতা। নির্দ্বিধায় সত্য কথা বলছে। যে গানের লিরিক পারেনা, অকপটে বলে দিচ্ছে। যে গান পারেনা, সেটাও বলে দিচ্ছে। গীটারে যে গান তোলা হয়নি, সেটা স্বীকার করছে। খুব অল্প সময়েই মানুষ বুঝে ফেলেছে ছেলেটার মধ্যে প্যাঁচঘোচ কম। খুব দ্রুতই ছেলেটিকে সবাই আপন করে নিয়েছে।

সে শুরু করলো আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণ করে ‘সেই তুমি’।

দুনিয়ায় এমন কোন বাংলাদেশি পাওয়া যাবেনা যে গানটি জীবনে একবারও শোনেনি। এই গানে সুরের এদিক সেদিক হলে পাবলিক ক্ষেপে যেত। সেটা হয়নি। অতি নিপুণতার সাথে সে গানটি গেয়েছে। প্রথম গানেই বাজিমাৎ।

এরপরে একে একে সে গেয়ে শোনালো বাংলা সংগীতের ইতিহাসের কিংবদন্তিদের গাওয়া বিখ্যাত সব গান। ছেলের কলিজা অনেক বড়। কাউকেই বাদ দেয়নি। সবার গানেই হাত দিয়েছে। মান্না দে, কুমার বিশ্বজিৎ, নচিকেতা, জেমস এমনকি কিশোর কুমারের পাগলাটে গান ‘শিং নয় তবু নাম তার সিংহ’। এইসব গান গাইতে হলে হয় আপনাকে নির্বোধ হতে হবে, নাহলে পরম সাহসী। কারণ এসব গানে ভুলের কোনই সুযোগ নেই। লক্ষকোটিবার করে শোনা, গানের প্রতিটা শব্দ মানুষের মুখস্ত। সুর কোথায় ওঠানামা করে, সব শ্রোতাদের কানে একদম খোদাই করা আছে। ছেলেটি নির্দ্বিধায় এসব গানে অবাধে বিচরণ করলো। বিশ্বাস জন্মালো, ছেলের সাহস আছে।

সমালোচকেরা এখনই তুলনা করছে কিশোর কুমার, হেমন্ত, জেমস, আইয়ুব বাচ্চুদের সাথে, এবং প্রমান করছে সে কতটা ঠুনকো, ফ্যালনা। ওদের মাথায় সামান্য বুদ্ধি থাকলেও বুঝতো কিশোর কুমার, হেমন্ত, জেমস, আইয়ুব বাচ্চুদের ক্যারিয়ার কত দীর্ঘ। কত স্ট্রাগল, কত পরিশ্রম করে তাঁরা এই স্থানে পৌঁছেছেন। কেউই ওভারনাইট সুপারস্টার ছিলেন না। এই বয়সে এই ছেলেটা এত ভাল গাইছেন, এই একই বয়সে এই কিংবদন্তিগণ কেমন গাইতেন সেটার সাথে তুলনা করতে হবে। এতটুকু বুদ্ধি মাথায় না থাকলে কারোর বিরুদ্ধে মুখ না খোলাই নিজের জন্য ভাল।

হ্যা, ছেলেটিকে অনেকদূর যেতে হবে। অনেক পরিশ্রম করতে হবে। খ্যাতি, ক্ষমতা, টাকা সব বয়সী মানুষেরই মাথা নষ্ট করে দেয়। ছেলেটির বয়সও কম। তাঁকে পা মাটিতে রাখতে হবে। যতদিন সে মাটির সাথে, নিজের শেকড়ের সাথে যুক্ত থাকবে, ওর কোন ভয় নেই। সেজন্য তাঁকে সময় তো দিতে হবে!

আমি পুরো কনসার্টে শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম, কেমন মানসিক অসুস্থ রোগী এই ছেলেকে বেসুরো বলে? যে বলে, সে ছিদ্রান্বেষী ছাড়া কিছুই নয়। যেখানে ইন্ডিয়ার লোকজন পর্যন্ত ছেলেটার প্রশংসা করেছে, আমার সাথে দেখা হওয়া কিছু পরিচিত অপরিচিত ইন্ডিয়ান বাঙালি নিজের মুখে বলেছে ‘তোমাদের নোবেল কিন্তু দারুণ গায়, আমি ফ্যান!’

সেখানে নিজের দেশের মানুষেরা এমন কেন? কেউ নাম কামালেই আমরা পুরো জাতি পেছনে লেগে যাই তাঁর ছিদ্রান্বেষনে। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দেই সে ছিল বৌদি প্রেমী, হুমায়ূন আহমেদের পরিচয় শেষ বয়সে শাওনকে বিয়ে, ইদানিং নোবেল বিজয়ী ইকোনমিস্ট মিস্টার ব্যানার্জির প্রথম বিবিকে তালাক দিয়ে বিদেশিনীকে বিয়ের কেচ্ছা অপপ্রচার করা হচ্ছে। লোকের ভাল দিকটা আমরা সহ্যই করতে পারিনা, তাই নজরেই আসেনা। অদ্ভুত আমাদের সাইকোলজি!

আপনার নিজের যদি এই স্বভাব থাকে, তাহলে গেট ওয়েল সুন ভাই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।