নোবেলের তৃতীয় স্থান: জি বাংলার টিআরপি বনাম আমাদের হীনমন্যতা

বিগত কয়েকমাস যাবৎ শনি-রবিবার রাত দশটা বাংলাদেশের মানুষ খুবই আগ্রহ নিয়ে একটা টেলিভিশন চ্যানেল দেখত, নাম তার জি বাংলা। এমনকি ঘোর জি বাংলা বিরোধী মানুষকেও আমি দেখেছি, ‘এই জি বাংলার চ্যানেল কততে জানি!’ জিজ্ঞেস করতে।

কারণ একটাই বাংলাদেশী ছেলে নোবেলের গান।

দেশের ছেলে নোবেল এপার বাংলা যেমন মাতিয়ে রেখেছিল ওপার বাংলাতেও ছিল তার জনপ্রিয়তা। প্রমান মিলে অনুষ্ঠান শেষে জি বাংলার অফিশিয়াল ফেসবুক চ্যানেলে নোবেলের গানের ভিডিও পোস্টে।

নোবেলের গান আপ দেয়ার মুহূর্তের মধ্যে লাখখানেক ভিউ, হাজার কমেন্ট।

জেমসের গানে মাত করা নোবেল আইয়ুব বাচ্চু, মাইলস, অনুপম, নচিকেতা, এ আর রহমান, নজ্রুল, রবীন্দ্র সকল ধারাতেই সে বাজিমাত করে। নোবেলের পারফর্মেন্স মানেই স্ট্যান্ডিং অভিয়েশন, বিচারকদের কাছ হতে একের পর এক গোন্ডেন গিটার।

অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়েই নোবেল সেখানকার এই সময়ের সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক সৃজিতের ছবি এবং অনুপম রয়ের সঙ্গীতে চলচ্চিত্রে গান গায়। সামনে আরও বেশকিছু বড় প্রজেক্ট অপেক্ষা করছে।

গেল শনিবার কলকাতায় সারেগামাপা’র ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বিচারক শ্রীকান্ত আচার্য, শান্তনু মৈত্র, মোনালি ঠাকুরের ‘বিস্ময় বালক’ নোবেলকে তৃতীয় ঘোষণা করা হয়।

আগামী আঠাশ জুলাই ধারণকৃত অনুষ্ঠানটি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হবে। ইতোমধ্যে রেজাল্ট সংবাদ মাধ্যমে চলে এসেছে এবং সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। প্রচারের পর যা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে সন্দেহ।

নোবেলের সাথে ইনজাস্টিস হয়েছে? নোবেল কি জি বাংলার টিআরপি বিজনেস বাড়িয়েছে?

প্রশ্ন দুটো জড়িত। প্রথমেই আসি জি বাংলার টিআরপি বৃদ্ধি। হ্যাঁ, জি বাংলা সারেগামাপা দিয়ে ভালো ব্যবসা করেছে।

এই কথা অনস্বীকার্য, এ যাবৎকালে কলকাতা ভিত্তিক রিয়েলিটি শো’র ভিতর এবারের সারেগামাপা দু’বাংলা মিলিয়ে সবচাইতে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, যার অনেকটাই ক্রেডিট নোবেলের প্রাপ্তি।

কিন্তু তাই বলে কি তৃতীয় স্থান অধিকার করায় নোবেলের সাথে ইনজাস্টিস হয়েছে? না। হয়নি।

যে নোবেল এতো বছর দেশীয় মিডিয়ায় কদর পায়নি, সারেগামাপা সেই নোবেলকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে, আপনাকে মানতেই হবে, জি বাংলার কল্যাণেই নোবেলকে আজ আপনি চিনেন, বাংলাদেশি মিডিয়া তার একটা সাক্ষাৎকার পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নোবেলকে তাঁরা সুযোগ দিয়েছে, বেড়ে উঠতে সাহায্য করেছে, বিজনেস তারা করবে না তো আপনি করবেন?

নোবেলের তৃতীয় স্থান অধিকার করলেও মোস্ট ভিউয়ার চয়েসে নোবেল বিজয়ী, আর তাকে বিজয়ী করেছে লক্ষ কোটি সঙ্গীত শ্রোতা, এপাড় বাংলা, ওপাড় বাংলা। উভয়ই।

নোবেলের ভিডিও-এর কমেন্ট বক্সে গিয়ে দেখুন, বাংলাদেশীদের ভালোবাসা সে যেমনটা পেয়েছে ঠিক ততটাই পেয়েছে পশ্চিম বাংলার মানুষের ভালোবাসা।

ইনজ্যাস্টিস যদি হয়ে থাকে তবে হচ্ছে আমাদের এখানে, আমাদের মেধার প্রতি ইনজ্যাস্টিস হচ্ছে। করছি আমরা।

আমরা আমাদের মেধাকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারি না, এই দায় আমাদের নিজেদের, এই দায় আমাদের মোড়ল মিডিয়া ইন্ড্রাস্ট্রির।

আমাদের মিডিয়া ইন্ড্রাস্ট্রিতে আছে দলাদলি, কোন্দল, ভাঙন, বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, আর শেষ বয়সে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাত পাতা।

এতগুলো বছর জয়া আহসান ছিল, খোঁজ হয়নি, যেই সে কলকাতায় গিয়ে সফল হল আজ জয়া সবার ‘জানু’, অথচ জয়ার অভিনয় দক্ষতাকে বাংলাদেশের সিনেমা পাড়া আজ পর্যন্ত ঠিকমতো ব্যবহারই করতে পারল না।

প্রায় চল্লিশে দেশ ছেড়েছিল বলেই সাতচল্লিশ বছর বয়সে এসে জয়া আজ ‘বাংলার ক্রাশ জয়া আহসান’। যতদিন নিজেদের মেধাকে আমরা নিজেরা মূল্যায়ন করতে শিখবো না, ততদিন ‘চুট্টামি কইরা আমগর পোলাডারে হারাইয়া দিছে’ বলে ন্যাকি কান্নাই কেঁদে যেতে হবে।

নোবেল আর জয়ারা সকল বাঁধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাক, মেধার মূল্যায়ন হোক। রত্ন খুঁজতে শিখো হে বাংলাদেশ!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।