নো স্মোকিং: ভুল সময়ে, ভুল জায়গার ছবি

মনে করুন আপনি চরমভাবে ধূমপানে আসক্ত একজন মানুষ। আপনার আসক্তি এমন পর্যায়ে যে আপনার ওয়াশরুমের কমোডের পাশেই সিগারেটের ছাইদানী থাকে। এই চরম আসক্তি আপনার দাম্পত্য জীবনে এমন প্রভাব ফেলেছে যে আপনার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীও আপনাকে ডিভোর্স দিতে পারলে বাঁচে।

অত:পর আপনি নিজের আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে একটি পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে উদ্যোগী হলেন। এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুরর দেয়া একটি ঠিকানা অনুযায়ী কোনোদিন কোনো রকম বাজে নেশা করেনি এমন এক ব্যক্তির নেতৃত্বের গোপন সংগঠনে যুক্ত হলেন। তারপর আপনার জীবনে ঘটতে থাকলো একের পর এক বিপত্তি আর অভূতপূর্ব-অভাবনীয় মানসিক উথাল-পাতাল ঘটনা।

২০০৭ সালে এরকমই আজব প্লটের ততোধিক অবাক করা গল্পের এক বলিউড সিনেমা ‘নো স্মোকিং’। এটি এমনি একটা শীতল বলিউডি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভি যার শেষে পুরোপুরি আপনার মাথা ‘ওলট-পালট’ হয়ে যাবে।

মুভির মেকিং কিংবা স্টোরিলাইন দেখলে হলিউডি মুভির ফ্লেভার মনে চলে আসবে। নিও-নয়্যার ঘরানার এই মুভিটি আমার মতে একটা মাস্ট ওয়াচ মুভি। অনুরাগ ক্যাশপ নামের একজন আন্ডাররেটেড ভারতীয় তরুণ প্রতিভার তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কিভাবে বলিউডেই এমন একটা মুভি তৈরী করলেন যা আসলে না দেখলে আপনারা ভাবতেও পারবেন না।

যারা মেমেন্টো, ইনসেপশান, ফাইট ক্লাব, শাটার আইল্যান্ড ইত্যাদি জাতীয় হলিউডি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভি দেখে অভ্যস্থ তারা ক্যাশপের এই বলিউডি প্রচেষ্টাকে অ্যাপ্রিশেয়েট করতে পারবেন অবলীলায়। অন্যদের জন্য এটি হজম অনুপোযোগীই থেকে যাবে।

মুভিটির চিত্রনাট্ট্য ও সিনেমাটোগ্রাফি এক কথায় সর্বোত্তম বলা যায়। গল্পের সাথে তাল মিলিয়ে এর দৃশ্যায়ন, সেটের কাজ আর ভিজুয়াল এফেক্টের ব্যবহার ছিলো দূর্দান্ত। গল্পের সাথে মিনিংফুল, বাহুল্যহীন সংলাপ মুভিটির আরেকটি বিশেষ দিক।

জন আব্রাহাম সম্ভবত মুভির নায়ক ‘কে’ চরিত্রে তার জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন। আর রহস্যময় ‘বাবা বাঙালি’ চরিত্রে পরেশ রাওয়ালের অভিনয়কে কি বলা যায়? ‘অসাধারণ’ বললেও কম বলা হয়ে যাবে!

স্টিফেন কিংয়ের ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত জনপ্রিয় উপন্যাস ‘Quitters, Inc.’ অবলম্বনে নির্মিত এই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভিটি রিলিজের ভারতে তেমন সাড়া পায়নি। কিন্তু সিনেমা বোদ্ধাদের ব্যাপক প্রশংসা পায়। বিশেষ করে ভারতের বাইরের দর্শক ও সিনেমা বোদ্ধাদের কাছে। খুবই কমপ্লিকেটেড স্টোরির এই মুভিটি অনেক ক্রিটিকসের মতে বলিউডের সেরা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মুভি।

ভাবতে খারাপই লাগে যে ভারতের সাধারণ দর্শকরাও বাংলাদেশের সাধারণ দর্শকদের মতই গৎবাঁধা অ্যাকশন, কমেডি আর রোমান্টিকতার বাইরে যেতে পারেন না। তা না হলে ‘নো স্মোকিং’-এর মতো দারুণ মুভিও ব্যবসায়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে? অথচ এই মুভিটি হতে পারতো ধারে-ভারে বলিউডের একটি অনন্য মাষ্টারপিস মুভি।

আসলে ভাবনার চাইতে দর্শনধারী উত্তম এই মানসিকতার ভারতীয় দর্শকদের জন্য ক্যাশপের এই প্রচেষ্টা মূল্য পায়নি। এ ছাড়া মুভিটিতে ক্যাশপ তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে থেকে নির্মান ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাই ‘নো স্মোকিং’ সিনেমাটিকে বলা যায় ভুল সময়ে, ভুল জায়গায় নির্মিত এক অনবদ্য প্রচেষ্টা হিসেবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।