নো ওয়ান কিলড জেসিকা: জীবনের চেয়ে মদের মূল্য যখন বেশি!

‘এটা দিল্লী। এখানে কোন ঝামেলা পাকলে শুরুটা হয় – ‘আমি কে জানিস?’ দিয়ে। এখানে সবাই অনেককিছু, আবার কেউই কিছু না! এখানে বড় লোকদের ক্ষমতা আর অর্থের কাছে সব নতজানু। আমজনতারও ক্ষমতা আছে, তা হল – নীরবে সব সহ্য করার অভ্যাস। জন্ম, বেড়ে ওঠা এখানে হলেও দিল্লিকে আজো চিনতে পারিনি…’

– সাংবাদিক মিরার ব্যাকগ্রাউন্ড সংলাপ আর চমৎকার বিজিএমে শুরু হয় সিনেমা। ঠিক যেন কোন রেস্তোরোয় বুফে খেতে গিয়ে অ্যাপিটাইজারেই কুপোকাত হয়ে যাওয়া!

১৯৯৯ সাল। ব্যস্ততম শহর দিল্লী। বিশ্বের অন্যতম বড় দেশ ভারতের রাজধানী। রাজধানীতে রাজরানীর মতো বাঁচার শখ না থাকলেও না হলেও সাধারণভাবেই দিনযাপন করছিল জেসিকা লাল নামের এক উঠতি মডেল। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, ইভটিজারদের নিজেই শিক্ষা দেওয়া জেসিকার জীবনের ঘড়ি থেমে যায় এক পার্টিতে গিয়ে!

মাঝরাতে কল আসে ওর বোন সাবরিনার কাছ। বোন মডেল, পার্টি করা রোজকার ব্যাপার। মাঝেমাঝেই ছোটখাটো ইনজুরির শিকার হয়। বোনের বয়ফ্রেন্ড যখন রাত দুইটায় কল দিয়ে বলে, জেসিকা ইনজুরড। সাবরিনা পাত্তা দেয় না। যখন শোনে, তাকে গুলি করা হয়েছে, সাবরিনার চিৎকার দেওয়া অভিব্যক্তিতে আপনি থমকে যাবেন। হা হয়ে যাবে মুখ!

সেই শুরু, শেষের আগ অব্দি গোটা সিনেমায় আপনার মুখ হা হয়েই থাকবে। বোন মডেল, হত্যাকারীও মন্ত্রীর ছেলে। হাইপ্রোফাইল কেসের সাক্ষী হাই সোসাইটির শ-তিনেক মানুষ! তবুও সাত বছর ধরে চলে মামলা। ১৯৯৯-২০০৬! বদলেছে অনেক কিছু। বয়স বেড়েছে সাবরিনার, একা একা লড়ে হাঁপিয়ে উঠেছে।

বেলাশেষে উপঢৌকন হিসেবে ২০০৬ সালে গ্রীষ্মের কোন এক সকালে পেয়েছে নিউজপেপারের গা শিউরে ওঠা শিরোনাম – ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা!’ হ্যাঁ, এটাই ছবির নাম। বলিউডে ছবিটি মুক্তি পায় ২০১১ সালে।

সাবরিনা সয়ে নিলেও জন্মদাত্রী মা পারেননি অপমান সইতে। অধিক শোকে পাথর হয়েই নিথরভাবে চোখ বুজেন। অসুস্থ বাবার ঠিকানা হয় হাসপাতালের বিছানা!

যে খবরে মশলা বেশি সে খবরকে খাবার হিসেবে নেওয়া মিডিয়ার লোকেদের ধর্ম। বিচক্ষণ সাংবাদিক ভবিষ্যৎ পড়তে পারে। তবে চমৎকার বিচক্ষণ হয়েও এনডিটিভির দুর্ধর্ষ সাংবাদিক মীরা এড়িয়ো জেসিকা মার্ডার কেস। সাত বছর পর শীত নিদ্রা ভাঙে তার! শুরু হয় লড়াই। ন্যায়ের জন্য, জেসিকার জন্য। ৩০০ সাক্ষীর মধ্যে সাতজন প্রথমে খুনীর বিরুদ্ধে বয়ান দিলেও ভোজবাজির মতো নিজেদের দেওয়া সাক্ষ্যের বিপরীত স্রোতে ভাসেন।

সেই সাতজন থেকেই আরম্ভ করেন মিরা। শেষ থেকে শুরু যাকে বলে। সেই সাতজন কেন বদলে গেল? কেউ না মারলে জেসিকাকে মারল কে? সব রহস্যের জট খুলবে কি? বোনকে কথা দিয়েছিল সাবরিনা, খুনিদের সাজা না দেওয়ানো পর্যন্ত কাঁদবে না সে। বোনের জন্য দুইফোঁটা চোখের জল ফেলার সুযোগটুকু কি পাইয়ে দিতে পারে মিরা?

১৯৯৯ সালে ভারতীয় মডেল জেসিকা লালের হত্যা রহস্যের সত্য ঘটনা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন রাণী মুখার্জি, বিদ্যা বালান। সাবরিনা আর মীরা চরিত্রে যথাক্রমে বিদ্যা এবং রাণীর অভিনয় ছিল অনবদ্য। পুলিশ অফিসার চরিত্রে কলকাতার রাজেশ শর্মা বরাবরের মতোই দারুণ।

জেসিকার চরিত্র রদপায়ন করেছেন মায়রা সেন। নিজের প্রথম ছবিতে অল্প যে কতক্ষণ ছিলেন সাবলীল অভিনয় করেছেন। পরিচালনায় ছিলেন রাজকুমার গুপ্তা। থ্রিলার ড্রামাটিক ঘরানার সিনেমাটি দর্শককে ভালো একটা সময় ঘোরে ডুবিয়ে রাখতে সার্থক।

২০১১ সালের সাত জানুয়ারি মুক্তির পায় নো ওয়ান কিলড জেসিকা। আইএমডিবিতে ৭.২, টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ৪/৫ রেটিং প্রমাণ করে এর দর্শকপ্রিয়তা। আর ৯ কোটি রূপির সিনেমার বক্সঅফিস কালেকশন ৫৮ কোটি দেখলেই বুঝা যায় এর সাফল্য কতখানি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।