‘৯০ দশক’ মিথ

দুটো বক্তব্য যত্রতত্র লেখায় ব্যবহৃত হয় –

১.

৯০-এর দশক শিল্প-সাহিত্য-বিনোদন- সামাজিকতার সর্বোৎকৃষ্ট সময়। স্বর্ণযুগ বলতে যা বোঝায় ৯০ এর দশক ছিল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

২.

২০১০-এর দশক হলো চরম বন্ধ্যাত্বের সময়। কোনো শিল্প-সাহিত্য-বিনোদন-সামাজিকতা সর্বত্র বিরাজ করছে অনুর্বরতা এবং বিচ্ছিন্নতা। প্রযুক্তি ব্যতীত কোথাও কোনো উৎকর্ষ নেই।

দুটো বক্তব্যই অন্তঃসারশূন্য এবং প্রবল পক্ষপাতদুষ্ট। ২০৬০ বা ২০৭০ সালের কোনো গবেষক যদি ৯০ এর দশক আর ২০১০ এর দশক নিয়ে গবেষণা করে, এবং বিভিন্ন নিয়ামক, সোস্যাল ডাইনামিক্স প্রভৃতি তুলনামূলক পর্যালোচনা করে কোরিলেশনের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত বা অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছায়, একমাত্র তখনই উক্ত বক্তব্য দুটির মেরিট যাচাইযোগ্য হয়।

তাহলে মানুষজন হঠাৎ এমন দূরদর্শী কীভাবে হয়ে পড়লো যে, ৪০-৫০ বছর আগেই ভবিষ্যত নিয়ে মতামত দিতে সমর্থ হচ্ছে, যেখানে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে অদূরদর্শীতাই পরিলক্ষিত হয়; গ্যাপটা কোথায়?

একটি সমাজ বা যুগব্যবস্থার চিন্তাপ্রক্রিয়াকে যদি কাঠামোবদ্ধ করতে চাই, চারটি শ্রেণি পাবো।

  • শ্রেণি ১ -পাইপলাইন

অনুর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীরা এই শ্রেণিভুক্ত। এরা সমাজের চিন্তাকাঠামোতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় না, কিন্তু যাবতীয় কনটেন্ট তৈরি করা হয় এদের বিবেচনায় রেখেই, কারণ এরাই সমাজকাঠামোর ভবিষ্যত। এদের কীভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে সেই শর্তের উপর নির্ভর করেই পরবর্তী ৩ দশকে সমাজের অগ্রগতি নির্ধারিত হয়।

  • শ্রেণি ২ – টাস্কফোর্স

১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা। এরাই মূলত সমাজের প্রাণশক্তি। তাদের মেধা-মনন এর উদ্যম-উদ্দীপনাতেই সমাজের চিন্তাধারা তৈরি হয়, এবং সেই তৈরিকৃত চিন্তাধারাকে তারাই ধারণ, বহন আর সঞ্চারণে প্রত্যক্ষ অবদান রাখে। যে সমাজের টাস্কফোর্স যত হতোদ্যম আর নিরাশায় ভোগে, সেটি ইনভেনশন-ইনোভেশনে তত বেশি দেউলিয়া।

  • শ্রেণি ৩ – কন্ট্রিবিউটর

৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সীরা। চিন্তাধারা এবং রুচি-মনন গঠনে এরা প্রত্যক্ষ অবদান রাখে। তাদের চওড়া কাঁধেই বয়ে নিয়ে চলে সামাজিক বোধ আর ধ্যানধারণার যাবতীয় কাঁচামাল।

  • শ্রেণি ৪ – ডিটারমাইনার

৫০-ঊর্ধ্ব মানুষেরা। এরা মূলত চিন্তাধারা এবং রুচির অনুমোদন দেয়। কন্ট্রিবিউটররা তাদের অনুসরণ অথবা চ্যালেঞ্জ জানায়। পাইপলাইন এবং টাস্কফোর্সের মনোজগতে তাদের প্রভাব বিপুল, সেই সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ডায়নামিক্সও নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে।

২০০০-২০১০ সময়কালকে যদি শূন্যদশক ধরি, এই সময়টাকে বলা যেতে পারে সন্ধিদশক। ৯০ এর দশকের ক্ষেত্রে ৮০ এর দশক যে ভূমিকা পালন করে, ২০১০ এর ক্ষেত্রে শূন্য দশকের অবস্থান অনেকটাই অভিন্ন।

৯০ এর দশককে মহিমাণ্বিত করার মেকানিজমটা বোঝার চেষ্টা করা যাক ( মেকানিজম শব্দটা এক্ষেত্রে ভুল প্রয়োগ। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো কিছু ঘটানোকে মেকানিজম বলা যেতে পারে। যা অবচেতনে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে যায় তাকে মেকানিজমের চাইতে কেমিস্ট্রি বলাটা যৌক্তিক হবে)।

২০১৯ এ যে ব্যক্তির বয়স ৪৯, ১৯৯৫ তে তার বয়স কত ছিল? ২৫, তাহলে ১৯৯০ তে ২০, আর ১৯৯৯ তে ২৯। অনুরূপ ২০১৯ এ ৩২ বছর বয়সী ব্যক্তিটি ১৯৯৫ তে ৮ বছরের শিশু।

ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, বর্তমান সময়ে যারা কন্ট্রিবিউটর শ্রেণিতে বিলং করছে তারা প্রত্যেকেই ৯০ এর দশকে পাইপলাইন অথবা টাস্কফোর্স শ্রেণিতে বিলং করতো। তাদের চিন্তাকাঠামোর পুরোটাই গড়ে উঠেছে ৯০ দশকজুড়ে, যে কারণে একে ঘিরে রোমান্টিসিজম কাজ করে।

২০১০ এর দশকে এসে তারা যখন কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করতে যায়, দুই দশকের মধ্যেকার বিপুল পার্থক্যকে তারা মেলাতে পারে না বা চায় না। বর্তমানের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে বর্তমানকে দোষারোপ করতে থাকে। পরিবর্তনের প্রতি মানুষের যে চিরন্তন ভীতি এবং বিকর্ষণ, ৯০ এর দশককে মহিমাণ্বিত করতে চাওয়া প্রতিটি মানুষ আদতে সেই ভীতির বাই প্রোডাক্ট।

পক্ষান্তরে বর্তমান দশকে যারা ডিটারমাইনার শ্রেণিতে উঠে গেছে ৯০ এর দশকে তারা টাস্কফোর্স অথবা কন্ট্রিবিউটর শ্রেণিতে ছিল। নিজেদের সৃজনশীলতা আর মননশীলতার সেরাটা তারা সেই সময়ে দিয়ে ফেলেছেন, ২০১০ এ এসে এই সময়ের সংকটগুলো তারা বুঝে উঠতে পারছেন না, ২০০৪ এ জন্ম নেয়া বর্তমানে ১৫ বছরের ছেলে বা মেয়েটির মনোজগতের আলোড়ন বা ভাষা তারা উপলব্ধি করতে পারছেন না, তাদের বিচার করতে গিয়ে নিজের দেখা ৯০ দশকের কিশোর বা কিশোরীটিকে ভাবনায় নিয়ে আসছেন, তৈরি হচ্ছে মিসম্যাচ।

২০৪০ এর দশকে ২০১০ এ পাইপলাইন আর টাস্কফোর্সে থাকা মানুষগুলো কন্ট্রিবিউটর শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে, তারা তখন ২০১০ দশককে মহিমাণ্বিত করতে থাকবে, সেটা হবে আরেকটা ৯০ দশক। প্রতি ২৫ বা ৩০ বছর পরপর একটি করে দশককে ঘিরে এরকম স্মৃতিচারণা চলতে থাকবে, ফ্যান্টাসি রচিত হবে। এটাই মানুষের চিন্তাপ্রক্রিয়ার ম্যাথমেটিকাল মডেল, বলা যায়।অথচ ৯০ দশক যখন চলছিল, তখন নিশ্চিতভাবেই অনুভব করা যায়নি এটা একসময় গর্বের বস্তু হয়ে উঠবে; যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ এর প্রতিবিম্ব হবে।

কিন্তু ২০৬০ বা ৭০ এ যারা কন্ট্রিবিউটর শ্রেণিতে অবস্থান করবে তাদের জন্ম ২০১৯ এর পরে, ৯০ দশক আর ২০১০ দশকের প্রতি নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে সমর্থ হবে। তবুও যাচাই-বিশ্লেষণ থেকে কতটা ইনসাইট পাওয়া যাবে তা নিয়ে ঘোরতর সংশয় থেকেই যায়। ৫০ এর দশক আর ৭০ এর দশকের মধ্যে জীবনযাপনে খুব বড়োরকম পার্থক্য যদি না থাকে সেটা আগ্রহ জাগাবে না।

৯০ আর ২০১০ দশক নিয়ে এতো আলোচনার মূল কারণ এই ২০ বছরে পৃথিবীর খোলনলচে পুরোপুরি পাল্টে গেছে, তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও।

৯০ এর দশকের বড়ো ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর চিন্তাপ্রক্রিয়া এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তনের ঢেউ লাগে। শিল্প-সংস্কৃতিতে তারই প্রতিফলন ঘটে মূলত। বাম থেকে ডানের দিকে শিফটিং শুরু হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পরবর্তীতে বিএনপি এবং আওয়ামিলীগ একবার করে ৫ বছর মেয়াদী শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

১৯৯৯ তে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭০ লক্ষ; মধ্যবর্তী ২০ বছরে জমির পরিমাণ বাড়েনি, ২০১৯ এ জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৮০ লক্ষ, তার মানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ কোটি ১০ লক্ষ। এই বিপুল জনসংখ্যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি এড়ানো যাবে?

তবে দুই দশকের মধ্যে প্রধান পার্থক্যসূচক ফ্যাক্টর আদতে ৩টি- ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, ক্যাবল নেটওয়ার্ক।

এর সাথে যুক্ত হবে শূন্য দশকের নাইন এলেভেনের ঘটনা, আফগানিস্তান-ইরাক হামলা, গুগল-ইউটিউব-ফেসবুকের উত্থান, আর্টফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রসার।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জঙ্গিবাদের প্রাদুর্ভাব, ওয়ান এলেভেন, এবং টানা ৩ বার একই সরকারের ক্ষমতায় আসা। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ ৫ বছর মেয়াদী শাসনব্যবস্থার সাথে অভ্যস্ত, একটানা ১০ বছরের রাজত্ব শাসক এবং সাধারণ মানুষ দুই শ্রেণিকেই নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়েছে। ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখা, প্রয়োজনে সমূলে উৎপাটিত করা এবং নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাশালীদের সাথে লিয়াজোঁ গড়ে তোলা, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ফুলে-ফেঁপে উঠার বিপরীতে বাকি সকল শ্রেণির নিষ্পেশিত হওয়া – এটাই সোস্যাল ডায়নামিক্স হয়ে উঠেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে চিন্তাকাঠামো এবং লাইফস্টাইলে।

৯০ এর দশকে কতজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল দেশে? ১৯৯৯ এর পরিসংখ্যান বলছে মোট জনসংখ্যার ০.০%, হয়তোবা দশমিকের পরে তৃতীয় বা চতুর্থ ঘরে গিয়ে ডিজিট বসবে। ২০০৫ এ মোট জনসংখ্যার ০.০২%, এবং সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯৫.১০২ মিলিয়ন।

৯০ এর দশকে কতজন মানুষের ঘরে ক্যাবল সংযোগ ছিল? অথচ ২০১৯ এ এসে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলও ক্যাবল নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত।

৯০ এর দশকে কতজন মানুষ মোবাইল ব্যবহার করতো ইন্টারনেটে সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। সেসময় টেলিফোন থাকতো খুবই সীমিত সংখ্যক মানুষের বাড়িতে, টেলিফোন থাকাটা সামাজিক স্ট্যাটাসে একটি উল্লেখযোগ্য নিয়ামক ছিল। BTRC এর পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে বাংলাদেইশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫৯.৭০২ মিলিয়ন!

৯০ এর দশককে বলা চলে অনেকটাই কনজারভেটিভ প্রকৃতির। মাকসুদুল হক রবীন্দ্র সঙ্গীতের এলবাম করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। পরের দশকগুলোতে একই কাজ অনেকেই করেছে, কিন্তু সেসব নিয়ে তেমন কেউ সোচ্চারই হয়নি। মাইলসের ফিরিয়ে দাও, আইয়ুব বাচ্চুর সেই তুমি, জেমসের দুঃখিনী দুঃখ করো না গানগুলো বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে, এখনকার সময়ে তারা এর চাইতে সুন্দর কম্পোজিশন আর বৈচিত্র‍্যময় লিরিকের গান করেও সেই মাত্রার জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবেন না, নিশ্চিন্তে বলা যায়।

কিংবা ৯০ এর দশকে চ্যানেল বলতে ছিল শুধু বিটিভি। স্টুডিওর ভেতরে শুটিং করা নাটক দেখেও মানুষ মুগ্ধ হতো, কারণ তাদের বসবাস ছিল মাইক্রো রিয়েলিটিতে, তুলনা করার উপকরণ ছিল সীমিত। কোথাও কেউ নেই নাটকে তারা বুঁদ হয়েছে, কারণ একই সময়ে আরো ১৫ টা চ্যানেলে ১৫ টা নাটক দেখার সুযোগ ছিল না। থাকলে তখন দর্শক বিভাজিত হয়ে পড়তো।

২০০৪ সালে জন্ম নেয়া ছেলেটি বা মেয়েটি জন্মের থেকেই প্রতিবেশের মানুষের কাছে কোথাও কেউ নেই সম্বন্ধে এতো বেশি হাই রেটিং পেয়েছে যে, সে ইউটিউবে নাটকটি দেখার পূর্বেই একটি পজিটিভ ইমপ্রেসন নিয়ে বসবে, নাটকের স্টোরিলাইনের সাথে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করবে। যদি হতে না পারে মুখ ফুটে বলতে পারবে না কোথাও কেউ নেই তেমন আহামরি কোনো নাটক নয়। অন্যদিকে আমরা যারা ৯০ দশকের পাইপলাইন অথবা টাস্কফোর্স, তারা বাঁচি মূলত নস্টালজিয়ার চর্চা করে। আমরা শৈশব-কৈশোরের সেই ভালো লাগা থেকে এখনো বিমুখ হতে পারি না।

মোদ্দাকথা হলো, ৯০ এর দশকে মানুষের হাতে অপশনের অপ্রতুলতার বিপরীতে অবসরের প্রাচুর্য ছিল। সেই সাথে টাকার মূল্যমান একটি বিষয়। ৯৫ সালে ৫টাকা রিকশা ভাড়ায় বেউথা থেকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে যেতে পারতাম, এখন একই দূরত্বে যেতে ৩০ টাকা ভাড়ার কথা বলারই প্রয়োজন পড়ে না। মূল্যমানে ৬ গুণ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই।

নির্মোহ, ৯০ এর দশকে মানুষকে ব্যস্ত থাকার জন্য নানাবিধ উপায় খুঁজতে হতো। যে কারণে সাংস্কৃতিক চর্চা, সাংগঠনিক কার্যক্রম, সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার উপর জোরারোপ হয়েছে। সেসময় এসএসসি পরীক্ষায় নৈর্ব্যক্তিক অংশ ছিল না, পুরোপুরি ১০০ নম্বরই লিখে অর্জন করে নিতে হতো। আমরা পেলাম নৈর্ব্যক্তিক, তারপর এলো সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি। এর ইমপ্যাক্ট যাচাই করতে হবে না?

৯০ বা তার পূর্ববর্তী দশকগুলোতে সামাজিক ফ্যাক্টরগুলো প্রবৃদ্ধ হয়েছে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে, ২০১০ এর দশকে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উচ্চতায়।

এখন অবসর কম, কিন্তু অপশন অসংখ্য। ব্যস্ত থাকার জন্য উপায় খুঁজতে হয় না, চিন্তার প্যাটার্নে পরিবর্তন আসায় নিজ থেকেই ব্যস্তানুভূতি কাজ করে। এর মধ্যে যদি ফেসবুকে লগ ইন করা হয়, বা বসা হয় ইউটিউবের সামনে— সময় কোথা দিয়ে চলে গেছে টেরই পাওয়া যাবে না।

সামষ্টিকতার ধারণাকে হটিয়ে সেখানে স্থান নিয়েছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র এবং বিচ্ছিন্নতা বোধ; যৌথ পরিবারপ্রথা বিলুপ্তপ্রায়, ৯০ এর দশকে আমরা যারা শিশু ছিলাম, গড় ছিল ৩ ভাই-বোন; এই দশকে সেটা নেমে এসেছে ১ সন্তানে। ৩ ভাই-বোনের শেয়ারিং-কেয়ারিং মানদসিকতায় বেড়ে উঠা মানুষের পক্ষে একা বড়ো হওয়া বাচ্চার মনচিত্র বোঝাটা দুরূহ।

মানুষের মধ্যে দ্বৈতসত্তা সহজাত, কিন্তু চর্চার অভাবে কিছুক্ষেত্রে তা অবদমিত দশায় থাকে। ২০১০ দশক ভারচুয়াল রিয়েলিটিসূত্রে একজন মানুষকে অসংখ্য সত্তা ধারণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যা প্রভাবিত করছে ব্যক্তিসম্পর্ক এবং প্রবণতা। ৯০ এর দশকে পরিচিতি পাওয়ার জন্য যতটা সংগ্রাম করতে হতো, এখনকার সময়ে কোনোভাবে ভাইরাল হতে পারলেই পরিচিতি জুটে যায়। পরিচিতির স্থায়িত্ব সাময়িক হলেও সেটা জীবনে মাত্রাগত পরিবর্তন আনছে।

দুই দশকে জীবনচিন্তায় যে বিশাল তারতম্য, তার ইমপ্যাক্ট পরিমাপ করার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো ৪টি দশক। আপনি ২০১৯ এ এসে যদি ২০১১ কে বুঝতে চান সেটা হবে নিজেই পরীক্ষার্থী, পরিদর্শক আর পরীক্ষকের ভূমিকা পালন করা।

বুঝতে পারছেন তো ব্যাপারটা কেমন ছেলেমি হয়ে যায়?

পরিবর্তনের মেকানিক্সটা উপলব্ধি করার চেষ্টা না করে তোতাপাখির মতো ৯০ এর গুণকীর্তন করা, আর ঢালাওভাবে ২০১০ দশককে তীরবিদ্ধ করা কূপমণ্ডুকতার শামিল। মানুষ সম্ভবত জন্মগত কূপমণ্ডুক প্রাণী। কেউ কুয়োকেই কুয়াকাটা ভেবে নেয়, কেউ কুয়া ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে চায় কুমিল্লা, কাশ্মীর, কুয়েত থেকে কাজাকিস্তান কিংবা হাঙ্গেরিতে।

মানুষের মধ্যে হাঙরিনেস না থাকলে সে কূপমণ্ডুক হবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী হলো!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।