নিলয় দাস: বিস্মৃতির অতলে হারানো গিটারের কিংবদন্তি

বাংলাদেশে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে যাঁরা বিশেষ অবদান রেখেছেন, সুধীন দাশ তাদের মধ্যে একজন। বলতেই হয়, বাংলা গানকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে তার অবদান অবিস্মরণীয়। আজীবন সঙ্গীতের সাধনা ও গবেষণায় নিয়োজিত থেকে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন সুধীন দাশ। তার ছেলের নাম নিলয় দাস।

আপনি নিলয় দাসকে চেনেন? কোনোদিন নাম শুনেছেন তাঁর? অন্যান্য ব্যান্ড শিল্পীরা (আজম খান-হ্যাপি আখান্দ-আইউব বাচ্চু) যেভাবে আমাদের কাছে পরিচিত, নিলয় দাস সেভাবে নয়। গানের জগতের মানুষ ছাড়া আমি আজ অব্দি নিলয় দাস সম্পর্কে কাউকে কথা বলতে দেখিনি। দেখি না। বরং আমি নিজে থেকে তার কথা তুললে তাদের প্রায়শ মাথা চুলকাতে দেখি।

নিলয় দাস একজন সঙ্গীতশিল্পী। বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসের কিংবদন্তী গিটারিস্ট। তুখোড় গিটার বাজাতেন। গান গাইতেন। আজকাল মানুষের মধ্যে গিটার শেখার যে প্রবল আগ্রহ, তার অনেকটাই এসেছিল নিলয় দাসের হাত ধরে। তার কাছেই গিটারের হাতেখড়ি হয়েছিল ‘বেজ বাবা’ সুমন, ওয়ারফেইজের সাবেক সদস্য কমল, বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়াসহ অনেকের। আইয়ুব বাচ্চু বলতেন, ‘নিলয় দাস হলেন বাংলাদেশের কার্লোস সান্টানা।’ বাংলাদেশে প্রথম ইন্সুট্রুমেন্টাল কনসার্ট করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন তিনি।

ব্যান্ড মিউজিকের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। অনেক বাধা নিষেধের মাঝেও তাই গান শোনা বন্ধ হয়নি। খুলনায় আজাদ লন্ড্রির যে পাড়ায় থাকতাম, সেখানে বাড়িতে বাড়িতে শোনা যেত সিনেমার গান। আধুনিকও। তবে ব্যান্ড মিউজিকটাই আমার বেশি পছন্দ ছিল। নিলয় দাস তার ব্যান্ড ‘ট্রিলজি’ ও নিজের একক অ্যালবামে কাজ না করলেও প্রচুর মিক্সড অ্যালবামে কাজ করেছেন।

আমার প্লেলিস্টে নিত্য বেজে চলে তার অসংখ্য গান – ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’, ‘এই শহর ডুবে যায়’, ‘বৃষ্টির কান্না দেখে’, ‘লাশকাটা ঘরে’, ‘অবহেলা’ ইত্যাদি। যেসব গানের কথা-সুর, নিলয় দাসের অসাধারণ গিটার প্লেয়িং এমনভাবে বুকে ঝড় তোলে যে, একটা বেদনার রেশ বহু মুহূর্ত বিরাজ করতে থাকে। হরহামেশা রাজত্ব চলে নিলয় দাসের গিটার বাদন।

‘যখনই নিবিড় করে’ তাঁর বিখ্যাত গান কিন্তু দুখের বিষয়, এই প্রজন্ম সেটাকে এলিটার গান (‘বন্য’ অ্যালবামে এলিটা কাভার করেছিল) বলে মনে করে! প্রয়াত প্রিয় বন্ধু হ্যাপি আখন্দকে নিয়ে গেয়েছিলেন ‘হ্যাপি.. তোকে মনে পড়লেই.. একটা গিটার তোলে ঝংকার.. পিয়ানোটা বেজে ওঠে.. তোর সেই নিপুণ হাতে.. ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ মনে পড়ে যায় মাঝরাতে..’। লিরিক লিখেছিলেন আসিফ ইকবাল। এতো স্মৃতিমেদুর বেদনাবিধুর লিরিক! তোলপাড় তোলে। ভোলা যায় না হ্যাপিকে। নিলয়কে।

বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ব্লুজ, নিও ক্লাসিক্যাল, ফ্ল্যামেঙ্কো, জ্যাজসহ আরও অনেক পাশ্চাত্য সঙ্গীতের শাখার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন। আপাদমস্তক মিউজিক অন্তঃপ্রাণ এই গিটার বাদক বড় অভিমানী ছিলেন। ২০০৬ সালে এই দিনে দুনিয়া ছাড়েন। নিরব প্রতিবাদে নিখোঁজ হন। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকে স্বল্প সময়ে যা কিছু তুলে দিয়ে গেছেন নিলয় দাস, তার আধেক ঋণও শোধ করার কোন উপায় নেই। থাকবেও না কোনকালে..

লেখাটির ইতি টানছি তার গাওয়া একটি গানের বাণী দিয়ে-

সাগর ডেকে বলে তার বুকের নোনা জলে

কত নদীর কত স্মৃতি সে আছে ধরে

নদীরা সাগরকে আজও মনে করে, এইতো অনেক

পৃথিবীতে কেবা কাকে মনে রাখে স্মৃতিতে আধেক?

পুনশ্চঃ অনেক পরে ‘এই গানটা’ নামে শেখ রানার লেখা লিরিকে (বাপ্পার কণ্ঠে) নিলয় দাসের কথা উঠে আসে। প্রজন্ম, পারলে শুনে দেখো। ভালো লাগবে নিশ্চয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।