এসএসসি-এইচএসসির ফলাফল: প্রথম পাতায় শুধু মেয়েদের ছবি ছাপা হয় কেন?

এসএসসি হোক কিংবা এইচএসসি। একালের পিএসসি বা জেএসসিতেও একই দৃশ্য। ফলাফল প্রকাশের পরদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য উদযাপনের ছবি বড় করে ছাপা হয়। একটা এখন বাংলাদেশের ট্রেন্ড হয়ে গেছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, পরীক্ষা কী শুধু মেয়েরাই দেয়? জিপিএ ফাইভ কি শুধু মেয়েরাই পায়? ছেলেরা কি সাফল্য পায় না? – এসব প্রশ্নটার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেই চলুন।

অনেকে আবার, এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, এখানে নাকি নারীকে পণ্য করা হচ্ছে। এই কথাটা একেবারে ভুল না যে নারীত্বের গ্ল্যামার ছবিগুলোতে একেবারেই নেই। তবে, মেয়েদের ছবি ছাপানোর ব্যাখ্যা আরো গভীর। এবার, সেই ব্যাখ্যা দেই চলুন।

গণমাধ্যম কী? গণমাধ্যম হল একটা দেশের আয়না। একটা গণমাধ্যমের, বিশেষ করে একটা সংবাদপত্রের চরিত্র এমন হতে হবে, যা দিয়ে সে নিজের দেশের মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। আর শিক্ষাখাতে সংবাদপত্রের অবদান নি:সন্দেহে অনেক বড়।

এবার আরেকটু একটু ভেঙে বলি।

ইউনেস্কোর সর্বশেষ হিসাব বলছে, বাংলাদেশের নারী শিক্ষার হার শতকরা ৬১.৫। আর পুরুষদের শিক্ষার হার ৬৪.৬। বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের নারী শিক্ষার হার কম। এই এগিয়ে নেওয়ার ছোট্ট একটু দায়িত্ব হিসেবে মেয়েদের ছবি ছাপানো হয়। ছবি ছাপিয়ে কি লাভ?

পত্রিকা কিংবা গণমাধ্যম তো আর কেবল শহরের লোকের জন্য নয়। গ্রাম-মফস্বল, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের হাতেও যায়। সেখানে পত্রিকার পাতা হাতে নিয়েই যখন এক ঝাঁক মেয়ের হাস্যজ্জ্বল ছবি দেখা যায়, তখন গ্রামের মেয়েরাও আরো পড়তে, আরো উৎসাহিত হতে পারে। আরো এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেতে পারে।

তার ওপর এবার এইচএসসিতে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের পাশের হার বেশি। সেদিক থেকে ছবিগুলো একরকম প্রতীকি অর্থও বহন করে।

১৯৯৮ সালে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়ে শিশুর ভর্তির হার ছিল ৭৮.৫ শতাংশ। ২০০৭ সালে এই হার বেড়ে প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌছেছে। প্রতি বছর ১.৮ শতাংশ হারে এই হার বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বর্তমানে ভর্তির হার শতকরা ৯১ ভাগ যার মধ্যে মেয়ে শিশুরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। যথাক্রমে ৯৪.৭ ও ৮৭.৮ শতাংশ হারে মেয়ে ও ছেলে শিশুরা এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।

জাতীয় মহিলা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ ও ২০১৩ সালের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলে পরীক্ষার্থীর চাইতে লক্ষাধিক বেশী ছিল। জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ২০১৩ সালে পুরুষ পরীক্ষার্থীর চাইতে লক্ষাধিক বেশী মেয়ে পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে।

এই বাড়ার ‘দায়’ কিছুটা হলেও গণমাধ্যমকে দিতেই হবে। তবে, যে পরিসংখ্যানের কথা বললাম সেটা গোটা দেশের গড় চিত্র। এখনো দেশের অনেক অংশ আছে যেখানে ৫০ শতাংশ মেয়ে শিশুও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা না করে শুধু পত্রিকার পাতার ‘ভুল’ ধরলে চলবে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।