এক অদ্ভুত দেজা ভ্যু চলছে!

ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ দল এখন পর্যন্ত যত সিরিজ-টুর্নামেন্ট খেলেছে তার মধ্যে সবচেয়ে অপ্রিয় হচ্ছে ২০০৩ এর বিশ্বকাপ। আর দ্বিজাতি সিরিজের কথা বললে ২০০১-০২ মৌসুমের নিউজিল্যান্ড সফরটা সবচেয়ে অপ্রিয়। কারণটা মাশরাফি বিন মর্তুজা!

প্রথমে সেই সফরের আগের সময়টা একটু বলি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মোটামুটি স্বল্প শিক্ষিত বাবা-মা যেমন ছোট ছেলে-মেয়ে মোবাইল টিপে কিছু বের করতে পারলেই মনে করে যে বড় হয়ে ছেলেমেয়ে বিজ্ঞানী হয়ে যাবে, আমাদের অবস্থা ঠিক সেরকম! তখনকার সব বয়সভিত্তিক দলের মধ্যে আমাদের মতো প্রতিভা অন্য কোন দলের নাই।

আশরাফুল মাত্রই সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হলো, নাফিস-আফতাবরা লাইনে আছে। কয়েক বছরের মধ্যে এরা বড় হলেই আমরা আর ছোট দল থাকবো না। এসময় এলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ঢাকার মাঠে ডিওন ইব্রাহীম, গ্রান্ট ফ্লাওয়ারদের ষ্ট্যাম্প উপড়ে ফেললেন! নিম্নমধ্যবিত্ত আমাদের ক্রিকেট মন তখন বড় কিছুর স্বপ্ন দেখে। আশরাফুল হবে আমাদের নতুন টেন্ডুলকার, মাশরাফির গতির তুলনা হবে লি, শোয়েব, বন্ডদের সাথে!

ঠিক এসময়েই নিউ জিল্যান্ড সফর। এশিয়ার বাইরে প্রথম সফর। বন্ডের সাথে পাল্লা দেবার মতো গতি আমাদের মাশরাফি দেখাবে- সেটাই তখন প্রত্যাশা! টেস্টের আগে জানলাম মাশরাফির নাকি হালকা হাঁটুর ব্যাথা। তখন ফিজিও ছিল কিনা মনে নাই। তবে না খেলার কথাই রিকমেন্ডেড ছিল, এটা মনে আছে। কিন্তু কোচ ট্রেভর চ্যাপেলের একগুঁয়েমিতেই মূলত মাশরাফি খেললেন।

খেললেন তো খেললেন টেস্টের প্রথমদিনে (থুক্কু তৃতীয় দিনে, এই গল্পে পরে আসছি) অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট তাঁকে একাই বোলিং করালেন ২৩ ওভার! আমার এখনো মনে আছে, শেষদিকে মাশরাফি প্রায় খোঁড়াচ্ছিলেন। বারেবার ডাক্তার এসে মাশরাফির পা সোজা করে দেয়।

টিভিতে ভিজিবলি বোঝা যাচ্ছিলো যে মাশরাফির বলের গতি ঘণ্টায় ১০ কিমি কমে গেছে। মাশরাফির হাঁটুর ভয়াবহ ইনজুরির সূচনা হয়েছিলো। ওই একদিনের ২৩ ওভার। ওই সিরিজটায় যদি মাশরাফিকে বিশ্রাম দেয়া হতো তাহলে হয়তো মাশরাফির নামের পাশে আজকে ৭০-৮০টা টেস্ট থাকতো। হায়, এই দুঃখ কোনদিন যাওয়ার না!

এখন মূল দেজা ভ্যু-এর গল্পে আসি। উপর লিখেছিলাম, মাশরাফি বোলিং করেছিলেন টেস্টের ৩য় দিনে। হ্যাঁ, কারণ আজ থেকে ১৮ বছর আগে সদ্যই টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া বাংলাদেশ দল প্রথমবারের মতো নিউ জিল্যান্ড সফরে যায়। প্রথম টেস্টের প্রথম দু’দিনই বৃষ্টিতে নষ্ট হয়। একটা বলও মাঠে গড়ায়নি।

আমাদের মনে তখন আশার সঞ্চারণ ঘটলো। বৃষ্টির সুবাদে দুইটা দিন গেছে। এখন তিনদিন কোনমতে কাটাতে পারলে অফিশিয়ালি নিউ জিল্যান্ডের মাটিতে ড্র করা যাবে!! খুব পরিচিত স্ক্রিপ্ট লাগছে?

বাংলাদেশ টসে জিতলে নিউ জিল্যান্ড ব্যাটিংয়ে নামলো। শুরুটাও স্বপ্নের মতোই ছিল। প্রথম ওভারে মাশরাফির বলে ভিনসেন্ট আউট! মঞ্জু-ম্যাশের ওপেনিং স্পেলে সেই উইকেটকে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পেরেছিলো! এক ঘণ্টার মধ্যে নিউ জিল্যান্ডের রান ছিল ৫১/৪! বাংলাদেশের জন্য স্বপ্নের মতো ব্যাপারে। এরপর নিউ জিল্যান্ড সামলে নিয়ে ৩৬৫/৯ এ ইনিংস ডিক্লেয়ার দেয়। আমরা চতুর্থ দিনে প্রথমবারের মতো ব্যাটিংয়ে নেমে ২০৫ রানে অল আউট হয়ে, ফলো অনে পড়ে আবার ব্যাটিংয়ে নামি। চতুর্থ দিন শেষে আমাদের ৯০ রানে ৪ উইকেট! খুব পরিচিত স্ক্রিপ্ট লাগছে আবারও? দেজা ভ্যু! এরপর আর কী? পঞ্চম দিন সকালে এক ঘণ্টার মধ্যে অল আউট হয়ে ইনিংসে হার!

এই টেস্টের গল্প সেই ২০০১ সালের! এখন ২০১৯। এখনো আমরা ভাবি সাদমান-সৌম্য-লিটন-মিরাজেরা একটু বড় হোক- বড় দলের সাথে তাঁদের মাটিতে ফাইট দেয়া তো কোন ব্যাপারই হবে না। এখনো প্রথম দুইদিন বৃষ্টিতে ভিজে যায়, তারপরে আমরা কোনমতে ড্র করতে পারলে খুশি হয়ে যাবো সেই দোয়া করি। কিসের কী? চতুর্থ দিনে এখনো দ্বিতীয় ইনিংসে আমাদের তিন উইকেট পরে। আর পঞ্চম দিনে সকালে আবার প্যাকেট হয়ে গিয়ে ইনিংসেই হারি!

১৮ বছরে আমাদের সমর্থকদের আশার প্যারামিটারও কিছু বাড়ে নাই, দলের অবস্থা এক-দুইজনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ব্রিলিয়ান্স বাদ দিলে কোন উন্নতি হয় নাই। তখন পেসাররা সকালের কন্ডিশন ব্যবহার করে ৫০ রানে ৪ উইকেট দেলতে পারতো। এখন অবশ্য তাও পারে না। পারতে চাইলেও আমরা স্লিপে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আসা ক্যাচ নেবার জন্য অভ্যস্ত না।

অভিজ্ঞতা বুঝি না। আগের নিউ জিল্যান্ড সিরিজে এখানে বল করার অভিজ্ঞতা কিছুটা হলেও পেয়েছিলো শুভাশিস। এবার সে স্কোয়াডেই নেই। এই কন্ডিশনে তাঁর বোলিং করবার অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা যেতো। সে তো আর অবসর নেয়নি। শহীদ, আল আমিনদের কথা তো বাদই দেই। টেস্টের মিডল অর্ডার নিয়ে কথা বললে শেষ হবে না। ঘরোয়া ক্রিকেটের মূল্যায়ন করা হয় না।

এই দেজা ভ্যু আরও কতকাল দেখতে হবে কে জানে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।