মুশফিক-সাকিব-তামিমদের ক্ষেত্রে আমাদের কোন ব্যাকআপ নেই: নাজমুল আবেদীন ফাহিম

জাতীয় দলে এখন যারা খেলছেন, তাঁদের অধিকাংশই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের কোনো না কোনো পর্যায়ে তাঁকে কোচ হিসেবে পেয়েছেন। সাকিব, তামিম, মুশফিক – সবাই তাঁর ছাত্র। দীর্ঘকাল গেম ডেভেলপমেন্টে কাজ করা সেই নাজমুল আবেদীন ফাহিম যখন তাই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রসঙ্গে কোনো কথা বলেন, তখন সেটাকে সিরিয়াসলি নিতেই হয়।

মুশফিকের ইনিংসটা দেখেছেন। কেমন লাগলো?

– মুশফিক এই ধরনের সিচুয়েশনে আগে অনেকবার খেলেছে। তবে এই ইনিংসে একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, সে নিজের উইকেটটি বিলিয়ে দিতে চায়নি। সে সময় নিয়েছে, আর যখন সময় হয়েছে তখন দ্রুত রানের জন্য যাবে। এটাই হওয়া উচিত। মিডেল অর্ডার ব্যাটসম্যান  হিসেবে এমন একটা কলাপ্স হতে পারে, ধরে নিয়েই খেলতে হবে এবং নতুন  করে ইনিংস গড়তে হবে। এই ইনিংসে সে এটা করে দেখিয়েছে। সেটা খুবই দক্ষতার সাথে করে দেখিয়েছে, যে কোন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। আশা করি সে এখান থেকে শিক্ষাটা নেবে এবং তাঁর খেলার মধ্যে আমরা এর ছায়াটা দেখতে পাব। যদি বাংলাদেশের ব্যাটিং এ শুরুতে ধ্বস নামে, তাহলে  আমাদের একজন থাকবে যে কিনা এই রকম অবস্থা থেকেও ইনিংস গড়ার সামর্থ্য রাখে।

এখানে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। হয় কি, এমন কঠিন সময়ে একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলেও সেটা মেনে চলার মত সাহস সবার থাকে না, মানসিক শক্তি থাকে না। পরিকল্পনা থাকার পরও সেটা থেকে যে কোন সময় সরে যাই, রাশ শট খেলি এবং আমরা শেষ পর্যন্ত নিজের উইকেট হারাই। এই ইনিংসে আমরা সেরকম কিছু দেখি নি। ওর সব শট সিলেকশন ছিল পারফেক্ট। সবচেয়ে বড় করা, সে যেই ধৈর্যটা নিয়ে খেলল, সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

শট সিলেকশন কেমন মনে হল?

– আমরা তাঁর শটে কোন ভুল দেখি নি, কারণ সে অফ সাইডের বল অফ সাইডে খেলেছে, লেগ সাইডের বল লেগ সাইডে খেলেছে, যা তুলনামূলকভাবে সহজ পন্থা। আগে আমরা দেখতাম, একটা আগে থেকেই নির্ধারিত শট খেলত, মিড উইকেটের দিকে। বল যেখানেই থাকুক না কেন, ও সেই মিড উইকেটের দিকেই খেলার চেষ্টা করত। এভাবে সে অনেকবার নিজের উইকেট হারিয়েছে। কিন্তু এই ইনিংসে এক্সট্রা কাভার, কাভার দিয়ে খেলতে দেখেছি। স্লগিস শট খেলেছে। বলা যায়, তাঁর শট খেলার পরিধি এখন অনেক বেশি এবং সে এটা জানে। যার কারণে বোলারদের জন্য তাঁকে বল করা কঠিন। বোলারদের অপশন এখন অনেক কমে গেছে। বোলারদের জন্য মুশফিক এখন হুমকিস্বরূপ।

মিঠুনের ইনিংসের ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি?

– মিঠুন যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। ও ধীর গতিতে খেলেনি। মুশফিক শুরুতে ধীরে খেলছিল, সে যদি ধীরে খেলত তাহলে শ্রীলঙ্কার চড়াও হওয়ার সুযোগ ছিল। আর মিথুন ওই ইনিংসটা খেলার কারণে মুশফিক সময়টা নিতে পেরেছে। তা না হলে মুশফিকের ওপর চাপ চলে আসত। আমি বলব, মিথুন দারুন একটি ইনিংস খেলেছে। আর এই এশিয়া কাপে শুরুর ম্যাচে আমাদের যেই মুমেন্টামটা দরকার ছিল, সেটা কিন্তু শুরু হয়েছে মিথুনকে দিয়ে। আমি খুব খুশি হয়েছি তাঁর ইনিংসে।

ওর কিন্তু বড় শট খেলার ক্ষমতা আছে, আমরা যেই ধরনের ক্রিকেট খেলতে যাচ্ছি, এখানে বড় শট খেলার সামর্থ্য থাকতে হবে। ২৫০-৬০ রান কিন্তু কখনই উইনিং স্কোর না। আমাদের ২৯০-৩০০ রান করতে হবে, তখন আমাদের এই ধরনের ব্যাটসম্যান লাগবে, যারা বড় শট খেলতে পারে। মিথুন যদি মিডেল অর্ডারে এমন দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে আমাদের জন্য ভাল হবে।

তামিমের অনুপস্থিতিতে ব্যাটিংয়ে কোনো প্রভাব পড়বে কি?

– তামিমের না থাকায় প্রভাব তো পড়বেই। আমরা এই পরিকল্পনা করি নি, তামিম না খেললে আমাদের কি হবে। আমরা জানি যে তামিম খেলবে, সাথে কোন একজন না খেললে কি হবে সেই পরিকল্পনা আছে। কিন্তু তামিম না খেললে কি হবে এধরনের প্রস্তুতি কিন্তু আমাদের নেই। তামিমের ফর্ম বিচারে এটা একটা বড় ক্ষতি। সে যে ধরনের ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে, সেই হিসেবে তামিম দারুণ একটা রোল প্লে করতে পারত। সে দলে থাকলে অধিনায়ককে সাহায্য করতে পারে, তাঁর নিজের উপস্থিতিও কিন্তু দলকে সাহায্য করে। সেদিক থেকে অবশ্যই এটা আমাদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হবে। তবে তাঁর জায়গায় যেই খেলুক না কেন, এটা তাঁর জন্য বড় সুযোগ হবে। আশা করব আমরা যেই সাহসিকতা ও ভাল ক্রিকেট গত ম্যাচে দেখিয়েছি, নতুন যে আসবে তাকেও এটা ইতিবাচক ক্রিকেট খেলার জন্য অনুপ্রেরণা দিবে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি হতে যাচ্ছে?

– আমি ৫০ ওভারের খেলায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওতটা চ্যালেঞ্জের কিছু দেখি না। টি-টুয়েন্টিতে হতে পারে, কিন্তু ৫০ ওভারের ম্যাচে ধরে খেলার ব্যাপার থাকে। আর আমাদের ৫০ ওভার খেলার মত ব্যাটিং সামর্থ্য আছে। আফগানিস্তানের দুই একজন বোলার আছে যাদের বিপক্ষে আমরা খুব আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে পারব না। যদি নাও খেলি, তারপরও বাকি বোলারদের কাছ থেকে আমরা যথেষ্ট রান আদায় করে নিতে পারব। আর যেহেতু টি-টুয়েন্টির মত তাড়াহুড়ার কোন ব্যাপার নেই এখানে, তাই আমি ওতটা ভীতসন্ত্রস্ত না। আমার ধারনা আমরা আফগানিস্তানের সাথে জিতব, জেতা উচিত।

বড় মঞ্চে বিপর্যয়ের পরও ঘুরে দাঁড়ানো – বিষয়টা আমাদের জন্য কতটা ইতিবাচক?

এটা দুটি বার্তা দিচ্ছে, একটা হল আমাদের টপ অর্ডারে আরেকটু ধারাবাহিক হওয়া উচিত। টপ অর্ডার যদি ভাল করে তাহলে আমাদের শেষের ফলাফলটা কতোটা ভাল হতে পারে, সেটা অনুমান করা যায়। আমাদের এভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য তারই প্রতিফলন। আমাদের মিডেল অর্ডারে যেই ব্যাটসম্যানরা আছেন, তাঁরা এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। আর তাঁরা তাদের সর্বোচ্চ নিংড়ে দিয়ে খেলছে। ওদের অভিজ্ঞতা এখানে একটা বড় কারণ। কিন্তু টপ অর্ডার যদি ভাল না করে, তাহলে ধারাবাহিকভাবে জেতা খুব সহজ ব্যাপার না। এভাবেই হয়তো অন অ্যান্ড অফ ম্যাচ জিততে হবে, যদি টপ অর্ডার ভাল না করে।

এতগুলো ইনজুরি ঝুঁকির জন্য আমাদের ব্যাক আপ কি রেডি?

যদি ব্যাকআপের কথা বলেন, মুশফিক-সাকিব-তামিমদের ক্ষেত্রে আমাদের কোন ব্যাকআপ নেই। ওদের বদলী ক্রিকেটার আমরা তৈরি করতে পারি নি এবং এত দ্রুত সম্ভবও না। একজন না থাকলে সেটা মেকআপ করা যায়। যদি দুই তিনজন হয় তাহলে সেটা কঠিন হবে। আমরা অবশ্যই চাইব না এমন কিছু হোক। তামিম ইতিমধ্যেই নেই। আশা করব বাকি যারা আছে তাঁরা খেলা চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু খুব কঠিন প্রতিযোগিতাপূর্ণ খেলা হয় এমন টুর্নামেন্টে।

শতভাগ ফিট না হলে মানিয়ে নেয়া খুবই কঠিন। একটা সময় ছিল আমরা শুধু ভাল খেলার জন্য খেলতাম, এখন তো আর সেই সময় নেই। আমরা এখন শেষ পর্যন্ত লড়াই করে জয়ের জন্য খেলি। সেজন্য যেই ইন্টেনসিটি নিয়ে খেলতে হয়, সেটা শরীরের ওপর অনেক চাপ দেয়। আমাদের হয়তো এখন সময় এসেছে, আমরা আমাদের প্লেয়ারদের কিভাবে খেলাব, বিশ্রাম দিব। এই জিনিস গুলো এখন সবাইকে ভাবতে হবে, বিশেষ করে প্লেয়ারদের। যখন আমি খেলছি না তখন আমি কি করছি। ওদেরকে একটা রুটিনের মধ্যে আসতেই হবে, যদি ক্যারিয়ার লম্বা করতে চায়। প্রতিটা সিরিজ, ম্যাচে যদি শতভাগ দিতে চায়, তাহলে সবাইকে খুব যত্নসহকারে পরিচর্যা করতে হবে।

বাংলাদেশের কি এখন সিনিয়রদের একটু বিশ্রাম দিয়ে খেলানো উচিৎ?

এটা তো নিশ্চয়ই বোর্ড বিবেচনা করবে। এদেরকে নিয়ে তো আমরা দুই-তিন কিংবা ছয় মাসের কথা ভাবছি না। এরা আরও চার-পাঁচ বছর খেলবে, কমপক্ষে।  সেই পুরোটা সময় যেন তাঁরা ভাল ক্রিকেট খেলতে পারে, সে জন্য যেটা করণীয় সেটা করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সিরিজে কাউকে বিশ্রাম দেয়া যায় কিনা, দিলে দলের কম্বিনেশনের কি হবে এইসব তো ভাবতে হবে। দীর্ঘসময় ধরে যদি তাদের আমরা চাই, তাহলে খুব যত্ন করে তাদের ব্যবহার করতে হবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।